তিন দফা বন্যাসহ দেশ জুড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে সুনামগঞ্জের হাওরে পর্যটকের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে লোকসানের মুখে পড়েছেন পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরা।
জেলার তাহিপুর উপজেলার টাঙ্গুয়া হাওরকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের পর্যটনবাণিজ্য গড়ে উঠেছিল। এ সময় হাওরে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় থাকত। কিন্তু দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তার অভাব দেখা দেওয়ায় পর্যটকরা খুব একটা আসছেন না।
স্থানীয়রা জানান, টাঙ্গুয়া হাওরে ৮-১০ বছর আগে যখন পর্যটকরা আসতেন, তখন তারা ছোট নৌকায় করে ঘুরে বেড়াতেন। পর্যটকের সংখ্যাও ছিল কম। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সুনামগঞ্জের হাওর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বিলাসবহুল হাউজবোট। এই বোট বা নৌকাগুলো আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন। এটাচ ওয়াশ রুম থেকে উন্নতমানের আবাসিক হোটেলের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে বোটগুলোয়। সাধারণত এই বোটে দুই রাত তিন দিনের প্যাকেজে জনপ্রতি চার হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ে।
বর্তমানে এই ব্যবসায় অনেকটাই ধস নেমেছে। দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে পর্যটকরা তেমন একটা ঘুরতে আসছেন না। ফলে যাত্রী না পেয়ে সুরমা নদীর পাড়ে নোঙর করে রাখা হয়েছে অনেকগুলো হাউজবোট। একেকটি হাউজবোটের পেছনে ৫০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা মালিকরা বিনিয়োগ করে থাকেন। পর্যটক না আসায় বোট ব্যবসায়ীরা চরম হতাশার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যতদূর চোখ যায় শুধু অথই পানি। নীল আকাশের নিচে এমন দৃশ্য নিজ চোখে দেখতে ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে আসেন হাওরে। বিশেষ করে তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওর, নীলাদ্রীলেক, লাকমাছড়ার বারিক্কাটিলা, যাদুকাটা নদী, শিমুল বাগান, নীল ঝরনাসহ নানা পর্যটন স্পটগুলোতে পর্যটক দেখা যায় বেশি। কিন্তু এবার পর্যটকদের ভিড় নেই বললেই চলে। আর এতে লাখ লাখ টাকা খরচ করে হাউজবোট তৈরি করা তরুণ উদ্যোক্তারা পড়েছেন চরম লোকসানের মুখে।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের হাউজবোটের উদ্যোক্তা অমিত রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০২২ সালে পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে মনসামঙ্গল ও চ-ীমঙ্গল নামে দুটি হাউজবোট নির্মাণ করেছিলাম। সেখান থেকে প্রথম মৌসুমে আয়ও করেছিলাম ১৭ লাখ টাকার মতো। এ কারণে চলতি বছরের শুরুতেই দ্য আর্ক নামে নতুন আরেকটি হাউজবোট নির্মাণ করি। কিন্তু বন্যা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে আশানুরূপ পর্যটক না আসায় লোকসান গুনতে হচ্ছে।’
আরেক উদ্যোক্তা তানভীর আহমেদ জানান, সুনামগঞ্জের পর্যটনকেন্দ্রগুলো এ সময় চাঙা থাকার কথা। কিন্তু চলমান এই পরিস্থিতির কারণে পর্যটকরা তাদের হাউজবোটের বুকিং বাতিল করেছেন। এতে তারা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সুনামগঞ্জের পর্যটন হলো হাওরকেন্দ্রিক। ফলে পানি কমে গেলে আর ব্যবসা করা সম্ভব হয় না। মে মাসের শেষের দিকে হাওরে পানি আসে। আর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে পানি নামতে শুরু করে। মূলত এ সময়টাই হলো হাওরে ব্যবসা করার সময়। কিন্তু এবার দেশ জুড়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে হাউজবোট ব্যবসায়ীরা চরম লোকসানে পড়েছেন।
সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি খায়রুল হুদা চপল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই মৌসুমে পর্যটনে যে পরিমাণে ধস নেমেছে, সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এখানকার ব্যবসায়ীদের অনেক সময় লাগবে। তিন দফা বন্যা ও চলমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে পর্যটন খাতে এই জেলার ব্যবসায়ীদের আনুমানিক ৫০ কোটি টাকার লোকসান হবে।’