সাতক্ষীরা পাসপোর্ট অফিসে উপচেপড়া ভিড়

সাতক্ষীরা পাসপোর্ট অফিসের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মানুষ পাসপোর্ট করতে এসেছেন বিগত কয়েকদিনে। পাসপোর্ট করতে আসা মানুষের মধ্যে অধিকাংশই সনাতন ধর্মাবলম্বী। প্রতিদিন হাজারেরও বেশি মানুষ আসছেন পাসপোর্ট করতে।

বুধবার (২১ অগাস্ট) ভোর সাড়ে পাঁচটায় সাতক্ষীরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সামনের রাস্তায় দেখা যায় অস্বাভাবিক রকমের ভিড়। বয়স্ক নারী, পুরুষ, থেকে শুরু করে নানাবয়সী মানুষের ঠেলাঠেলি। 

সরকার পতনের পর জেলাজুড়ে সৃষ্ট নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির পর থেকে এই অবস্থা পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে জানালেন মানবাধিকার নেতা এডভোকেট মুনির উদ্দিন।

যেখানে সাতক্ষীরা পাসপোর্ট অফিসের ৫টা বাই স্টেশনের ধারণ ক্ষমতা প্রতিদিন ৬০জন করে মোট ৩০০ জনের। আর যদি রাত পর্যন্ত কাজ করা হয় তাহলে ৪০০ থেকে ৫০০ জন মানুষের সেবা প্রদান করা সম্ভব। এরপর মেশিনে বিভিন্ন যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেয়। ধারণ ক্ষমতার বাইরে অধিক সংখ্যক গ্রাহক পাসপোর্ট করতে আসায় হিমশিম খাচ্ছে পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ।

স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আবেদনকারী পাসপোর্টের জন্য সকাল থেকে ভিড় করতে শুরু করেন। নতুন পাসপোর্ট কিংবা নবায়নে নতুন করে ডাটা এন্ট্রি করা হচ্ছে। ই-পাসপোর্টের জন্য চোখের আইরিশসহ ছবি তোলা হচ্ছে নতুন করে। এতে করে নতুন করে ছবি তোলা, আইরিশ নেয়া এবং স্বাক্ষর করার কাজ করতে হচ্ছে অপারেটরদের। প্রতিটি কাজে গড়ে পাঁচ সাত মিনিট সময় লাগছে। এর মধ্যে সার্ভার ডাউনসহ নানা ধরণের প্রযুক্তিগত বিড়ম্বনাও বড় ধরণের সংকট তৈরি করছে।

প্রতিদিন পাসপোর্ট অফিসের সামনে গেলেই এই অস্বাভাবিক ভিড় দৃশ্যমান হচ্ছে। ভোরবেলা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন প্রায় এক হাজারের অধিক পাসপোর্ট করতে আসা গ্রাহক। কাক ডাকা ভোর থেকেই এসব গ্রাহকদের লম্বা লাইন শুরু হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাইনও লম্বা হতে থাকে। প্রচন্ড ভিড়ে একটা সময়ে অফিসের বারান্দা থেকে রাস্তায় লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয় গ্রাহকদের। এদিকে কেন এতো হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পাসপোর্ট করতে এসেছেন তার মূল কারণ বলতে নারাজ তারা।

লাইনে দাঁড়ানো অপর্ণা রানী বলেন, ’চাপা ভয়ে আগে ভাগে পাসপোর্ট করে রাখতেছি যাতে কোনো সমস্যা হলে অন্তত ভারতে যেতে পারি। কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন কিনা জানতে চাইলে বলেন, না আমরা এখনো পর্যন্ত কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়নি। তিনি আরও বলেন, সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি পাসপোর্ট করার জন্য।’

পাসপোর্ট করতে আসা গ্রাহক সন্দীপ বলেন, ‘সামনে পূজা আর দেশের এই অবস্থায় পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট করতে এসেছি। কিন্তু পাসপোর্ট করতে পারব কিনা বলতে পারছি না। লাইন শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছি।’

দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তনুপা রাণী। তিনি বলেন, সোমবার (১৯ আগস্ট) একবার এসে ফিরে গিয়েছি। মঙ্গলবার (২০ আগস্ট) এসে দেখি দীর্ঘ লাইন। লাইন শেষ করে জমা দিতে পারব কিনা জানিনা। বাচ্চা কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি কান্নাকাটি করছে তবুও দাঁড়িয়ে আছি কিছু করার নেই।

 কি কারণে ভারতে যেতে চান জানতে চাইলে বলেন, ‘এমনি আমরা সব সময় ইন্ডিয়াতে যাই। ওখানে আত্মীয়স্বজন আছে। বাসার সবারই পাসপোর্ট আছে শুধু আমারটা নবায়ন করতে হবে। এমনি সবাই মিলে বেড়াতে যাব আর কি। অনেকে এসেছেন কেউ ডাক্তার দেখাতে যাবে কেউ বেড়াতে যাবে। আমরা প্রায় সময় চাই বেড়াতে।’

সাতক্ষীরা শ্যামনগর থেকে আসা প্রণয় জানান, সকালে এসে লাইন ধরেছেন। তার আগে আরও অনেকেই লাইন ধরেন। ভোর থেকে মানুষ লাইনে দাঁড়ায় বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুপুর গড়িয়ে গেছে। এখনো আবেদন জমা দিতে পারিনি। কখন পারব কিনা কে জানে! এই ধরণের শত শত মানুষই প্রতিদিন সকাল থেকে লাইনে ধরে পাসপোর্টের আবেদন জমা দেন।

তবে ভোগান্তি কমাতে দূর-দূরান্ত থেকে পাসপোর্ট করতে আসা গ্রাহকদের সেবা দিতে খোদ সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান নিজে খোঁজ খবর নেন। এ সময় অসুস্থ, বয়স্ক নারী-পুরুষ ও শিশুদের তিনি অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা দেন দায়িত্বে থাকা সবাইকে।

সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, ‘সাতক্ষীরা পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন ৫টা বাই স্টেশনের মাধ্যমে ৩০০ জনকে সেবা প্রদান করা যায়। আর যদি রাত পর্যন্ত কাজ করা হয় তাহলে ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষের সেবা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বিগত কয়েকদিনে পাসপোর্ট করতে আসা গ্রাহকের সংখ্যা এক হাজারের অধিক। তাতে আবার জনবল সঙ্কট থাকায় একজন কর্মকর্তাকে দুই তিনজনের কাজ করতে হয়। তারপরও কতৃপক্ষ সাধ্যমত সেবা দিয়ে যাচ্ছে। যাতে কেউ পাসপোর্ট করতে এসে ভোগান্তির শিকার না হয়। সহপরিচালক ও উপ-সহকারী পরিচালকসহ ৭জন লোকবল কম নিয়ে আমরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে পাসপোর্ট করতে আসা মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।’

এসময় তিনি আরও বলেন, ‘কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনৈতিক সুবিধা নেয়ার সুযোগ নেই। এরপরও সৃষ্টি করা হয়েছে বাড়তি নজরদারি। পুরো পাসপোর্ট অফিসের সিসি ক্যামেরা সার্বোক্ষণিক সচল রাখা হয়েছে। গ্রাহকদের কষ্ট কমাতে বাড়িতে বসে ব্যক্তিগত সরকারি হোয়াটস্অ্যাপ নাম্বারের মাধ্যমেও প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে থাকি। এছাড়া আবেদনকারীদের ভোগান্তি কমাতে ই-কিউ (ইলেকট্রনিক কিউ) টোকেন সিলিপ দেওয়া হয়ে থাকে।’

এ সময় এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘কোনো সেবা প্রত্যাশী যাতে হয়রানির শিকার না হয় বা দালালের খপ্পরে না পড়ে তার সর্বোচ্চ নজর রাখছি। পাসপোর্ট অফিসকে আমি সর্বোচ্চ সেবার মানদণ্ডে নিয়ে যেতে চাই। যে কোনো সেবা প্রত্যাশী তার রুমে এসে সেবা নিতে পারবেন।

তিনি দালালদের প্রসঙ্গে সতর্ক করে বলেন, ‘তিনি যতদিন থাকবেন দলালমুক্ত সাতক্ষীরা পাসপোর্ট অফিস উপহার দেবেন। সেজন্য তিনি সাংবাদিকসহ সকল শ্রেণীপেশার মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন।’

এদিকে, সাতক্ষীরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে পদ রয়েছে ১৮টি। যার মধ্যে শুন্য রয়েছে ৭টি পদ। মাত্র ১১জন জনবল দিয়ে ৫টি বাই স্টেশনের মাধ্যমে গ্রাহককে সেবা দিচ্ছেন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। জনবলের চরম সঙ্কট নিয়েও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪২ কোটি ৬০ লাখ ৭৬ হাজার রাজস্ব আদায় করেছে সাতক্ষীরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস।