শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে এ বছরের এইচএসসি ও সমমানের স্থগিত পরীক্ষাগুলো বাতিল ঘোষণা করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এখন করোনাকালের পরীক্ষার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জেএসসি-এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে (ম্যাপিং) ফল প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। গতকাল বুধবার শিক্ষা বোর্ডগুলোর পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের সভায় এ বিষয়ে আলোচনা করে প্রাথমিকভাবে একটি রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে বলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে ছাত্র ও অভিভাবকদের মধ্যে। অনেকের মতে, পরীক্ষা না নিয়ে শিক্ষার্থীদের মেধার অবমূল্যায়ন করার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা অযৌক্তিক। এ ধরনের প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। গত জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সারা দেশে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হলে কয়েক দফায় স্থগিত করা হয় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। স্থগিত পরীক্ষাগুলো ১১ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষাগুলো বাতিলের দাবিতে একদল পরীক্ষার্থী কয়েক দিন ধরে আন্দোলন করে আসছিলেন।
পরীক্ষা না দেওয়ার কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অনেক পরীক্ষার্থীও আহত হয়েছেন। পড়ালেখায়ও ক্ষতি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তারা পরীক্ষায় বসার মতো অবস্থায় নেই। তাদের দাবি, ইতিমধ্যে যে কটি বিষয়ের পরীক্ষা হয়েছে, তার ভিত্তিতে এবং স্থগিত বিষয়ের পরীক্ষা এসএসসির সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে ম্যাপিং করে এইচএসসির ফল প্রকাশ করা হোক।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার পরীক্ষার্থীদের একটি অংশ সচিবালয়ে ঢুকে বিক্ষোভ দেখালে অবশিষ্ট পরীক্ষাগুলো বাতিল করে সরকার।
তবে মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন রাজধানীর নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা। গতকাল নটর ডেম কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘এইচএসসি পরীক্ষা-২০২৪ নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সবপক্ষের সঙ্গে আলোচনা না করে একপক্ষীয়ভাবে যে অসুদূরপ্রসারী প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে, তা নটর ডেম কলেজের ছাত্রসমাজ প্রত্যাখ্যান করছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল মেধার বিজয় সুনিশ্চিত করার জন্য। পরীক্ষা না নিয়ে পরিশ্রমী শিক্ষার্থীদের মেধার যে অবমূল্যায়ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা অযৌক্তিক।’
এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল করার সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারাও। গত মঙ্গলবার রাতে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘এই পরীক্ষা বাতিল করার বিষয়কে আমরা কখনোই সমর্থন করি না। কারণ পরীক্ষা ছাড়া একটা শিক্ষার্থীকে কখনোই মূল্যায়ন করার সুযোগ নেই। পরীক্ষা ছাড়া মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যারা প্রকৃত মেধাবী, যারা সারা বছর পড়াশোনা করেছে, তাদের মূলত অনুৎসাহিত করা হলো। সুতরাং, আমরা চাইব আর কখনোই যেন চাপে পড়েই হোক বা যেকোনো কারণেই হোক, এ ধরনের সিদ্ধান্তের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’
পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক নয় বলে মনে করছেন আরেক সমন্বয়ক সারজিস আলম। তিনি বলেন, ‘পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক নয়। বিভিন্ন গোষ্ঠী রূপ বদলিয়ে অযৌক্তিক দাবি নিয়ে রাস্তায় আন্দোলনে নামছে। তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। তাদের আন্দোলনের পথ সঠিক নয়।’
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে সমাবেশ ও শিক্ষা উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন পরীক্ষার্থীদের একটি অংশ। এতে বলা হয়, ‘আমরা অবাক হয়ে লক্ষ করলাম যে শিক্ষা বোর্ড কোনো ধরনের যুক্তিসিদ্ধ কারণ ব্যতিরেকেই হঠাৎ করে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করেছে; একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ রকম তাৎক্ষণিক পপুলিস্ট এবং দায়িত্বহীন সিদ্ধান্ত আমরা প্রত্যাশা করি না। আমরা স্বৈরাচারের গুলির সামনে দাঁড়াতে ভয় পাইনি, পরীক্ষার হলে বসতেও ভয় পাব না। শহীদের রক্তের বিনিময়ে দেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে, শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করেই দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে হবে।’
পরীক্ষার ফল মূল্যায়নের প্রক্রিয়া : করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে ২০২০ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা না হওয়ায় সবাই পাস করেন। তখন এসএসসি, জেএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের গড় মূল্যায়ন করে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছিল। পরের বছর কয়েকটি বিষয়ের পরীক্ষা নিয়ে বাকি বিষয়ের ফল একইভাবে তৈরি করা হয়েছিল। এবারও সেই অভিজ্ঞতায় ফল প্রকাশের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
একজন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ভিন্ন পদ্ধতিতে ফলাফলের ধারণা দিয়ে বলেন, বাংলা-ইংরেজিসহ ইতিমধ্যে যে সাতটি বিষয়ের পরীক্ষা হয়েছে, সেগুলোর ফল হবে উত্তরপত্র মূল্যায়নের ভিত্তিতে। আর যে বিষয়গুলোর পরীক্ষা হচ্ছে না, সেগুলোর ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে ওই সব শিক্ষার্থীর এসএসসি ও জেএসসির বা সমমানের সংশ্লিষ্ট বিষয় বা ভিন্ন উপায়ে ফল প্রকাশের জন্য নির্ধারিত বিষয়ের ফল বিবেচনা করা হবে। এখানেও যদি দেখা যায় কোনো বিষয়ে এসএসসিতে ফল খারাপ, সে ক্ষেত্রে জেএসসির ফল বিবেচনা করা হতে পারে।
ফলাফল মূল্যায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে গতকাল শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই, কালকে (মঙ্গলবার) অনভিপ্রেত যে ঘটনা ঘটেছে, তারপর চিন্তা করার সুযোগ পাইনি। এটার তো এক্সপার্ট আছে, আমি আগে থেকেই কিছু বলব না, শিক্ষা বোর্ডগুলো আসলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। আমি একা এই সিদ্ধান্ত নিতে পারব না। অর্ধেক পরীক্ষা হয়ে গেছে, এগুলো সব মিলে কী করবেন, সেটা এখনো আমি জানি না। আমার সরাসরি সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও না, এটা এক্সপার্ট দেখবেন।’
বাতিল পরীক্ষাগুলো আবার নেওয়ার দাবি উঠেছে। এখন পরীক্ষা নেওয়া হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেটা তো ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান দেওয়ার কথা, তিনি যে ঘোষণা দিয়েছেন, সেটাই বলবৎ থাকবে।’
গতকাল সব শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে সভা শেষে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার বলেন, ‘যে পরীক্ষাগুলো হয়েছে, সেগুলোর নম্বর তো আছে। যেগুলো হয়নি, সেগুলোর জন্য সাবজেক্ট ম্যাপিং করার জন্য বলা হয়েছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও সিস্টেম অ্যানালিস্টদের প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পর ফল প্রকাশ করা হবে।’