এক গুলিতে তছনছ আছিমার সংসার

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা আছিমা আক্তার। এক যুগ আগে এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে স্বামীর সংসার ছাড়েন। ভিটেমাটি না থাকায় ছেলেমেয়ে নিয়ে গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় হেলপারের কাজ নেন তিনি। ছেলেমেয়ে বড় হতে থাকে। মেয়ের বিয়ে দিয়ে ছেলে মুরছালিনকে নিয়ে বাইপাস সড়কের পেয়ারাবাগান এলাকায় থাকেন আছিমা।

তার স্বপ্ন ছিল মুরছালিন বড় হয়ে ব্যবসা করবে। তাকে বিয়ে দিয়ে ঘরে একটা সুন্দর বউ আনবেন। ছেলে ১০-১২ বছর বয়স থেকেই মাকে কাজে যেতে বারণ করত। বলত, ‘তোমাক (তোমাকে) আর কাম করা লাগব না, হামি (আমি) বড় হইচ্চি (হয়েছি)।’ মাকে কাজ থেকে মুক্তি দিতে নিজে সংসারের হালও ধরেছিল। বন্ধুরা যখন খেলাধুলায় আনন্দময় সময় পার করত, সে সময় বাবাছাড়া সংসারের হাল ধরার সংগ্রাম শুরু করে মুরছালিন। কখনো পানির গ্লাস নিয়ে টেবিলে টেবিলে ছুটত, কখনো হোটেলের টেবিলগুলো ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করত।

মা-ছেলের আয় সামান্য হলেও বেশ ভালোই চলছিল তাদের সংসার। জীবনযুদ্ধে হার না-মানা আছিমার ভাষ্য, শূন্যের ওপর দাঁড়িয়েও তারা সুখী ছিলেন। তার সব স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মুরছালিন। ৫ আগস্ট ঘাতকের একটি বুলেট তার সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে।

গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর শ্যামলীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের (পঙ্গু হাসপাতাল) অস্ত্রোপচার কক্ষের সামনে স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা ছেলেকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আছিমা। হলুদ টি-শার্ট পরা টগবগে কিশোর ছলছল চোখে মায়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছিল। মা ছেলের মাথা-মুখে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে এক পা ছাড়া বাকি জীবন কীভাবে কাটাবে, সে কথা ভেবে বিলাপ করছিলেন আছিমা।

ছেলের পায়ে অস্ত্রোপচার শেষে আছিমা আক্তার জানান, ৫ আগস্ট সোমবার দুপুরেই তার কারখানা ছুটি হয়ে যায়। বাসায় গিয়ে তিনি সাংসারিক কাজকর্ম করছিলেন। বিকেল ৪টার দিকে ফোনে তাকে জানানো হয় ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। গুলিবিদ্ধ মুরছালিনকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে এবং পরে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন।

আছিমা বলেন, ‘এখানকার ডাক্তাররা তার আত্মীয়দের জানিয়েছেন ছেলেকে বাঁচাতে হলে পা কেটে ফেলতে হবে। আমি প্রথমে রাজি ছিলাম না। পরে তারা জানালেন পা না কাটলে পচন ধরবে।’ ৭ আগস্ট তার পা কেটে ফেলা হয় বলে জানান আছিমা।

অস্ত্রোপচারকক্ষে নেওয়ার আগে মুরছালিন জানায়, ৫ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে হোটেল থেকে এক দোকানে যাচ্ছিল সে। অনেক দূরে মারামারি হচ্ছিল। গোলমাল থেকে এতদূরে গুলি এসে লাগবে ভাবতে পারেনি সে। রাস্তা পার হওয়ার আগেই হঠাৎ তার পায়ে গুলি লাগে। সে বসে পড়ে। পরে সহকর্মীরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। দুঃসহ স্মৃতির কথা স্মরণ করতে করতে চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াতে থাকে মুরছালিনের। কাঁদছিলেন মা আছিমাও।

মাত্র একটি গুলি মা-ছেলের সংসার এবং তাদের সব স্বপ্ন তছনছ করে দিয়েছে। নিজের জমিজমা নেই, ঘরবাড়িও নেই। মুরছালিন ছোট থেকে নানাবাড়ি থাকত। এ বছরের শুরুতে গাজীপুর চৌরাস্তার বাইপাস সড়কের একটি হোটেলে পানি দেওয়ার কাজ শুরু করে ১৫ বছর বয়সী এই কিশোর। মাসে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা আয় দিয়ে মায়ের জীবনসংগ্রামে সহায়তার স্বপ্ন দেখা মুরছালিনের বাকি জীবন নিয়ে এখন চিন্তিত আছিমা।

আছিমা আক্তার বলেন, ‘আমি যত দিন বেঁচে আছি, আমার ছেলের কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু আমি মারা গেলে তার কী হবে? বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। ফাঁকে ফাঁকে বলছিলেন, কেন আমার ছেলেকে গুলি করা হলো। মুরছালিন কারও সঙ্গেই খারাপ আচরণ করত না। কারও কোনো ক্ষতি করেনি।’

দেশ রূপান্তরকে আছিমা বলেন, ‘আমার বাড়ি-ঘর, জায়গাজমি কিছুই নেই। ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর স্বামী আর ছেলেমেয়েদের তেমন খোঁজ নেয় না। ছেলেকে নিয়ে কীভাবে চলব, সে চিন্তায় ঘুমাতে পারি না। আমি চাকরি করলে আমার ছেলেকে কে দেখবে? আর চাকরি না করলে খাব কী?’

তিনি বলেন, ‘আমি রাজনীতি বুঝি না, রাজনীতি করি না। কে গদিতে বসল আর কে নামল তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। আমি আমার ছেলের সুস্থ জীবন চাই। সে যাতে চলতে-ফিরতে পারে।’

মুরছালিনের মতো গুলিবিদ্ধ আরও অনেকের হাত-পা কেটে ফেলা হচ্ছে। ডাক্তাররা জানিয়েছেন, গতকাল বুধবার ইমরান হোসেন নামের এক যুবকের পা কেটে ফেলা হয়েছে। মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বরের কাছে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন।

হাসপাতালের গেটে একটি বেসরকারি সংস্থা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করছিল। তাদের হিসাবে, এই হাসপাতালে আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ অন্তত ১৫ জনের হাত-পা কেটে ফেলতে হয়েছে। ঘাতকের গুলিতে হাত-পা ভেঙে যাওয়া ১৩৯ জনের তালিকা করেছে তারা।