ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ১০১ নম্বর ওয়ার্ডের ৭ নম্বর বেডে শুয়ে আছেন রুবেল হোসেন (২০)। তার বুকের সামনের ও পেছনে লম্বা অবস্থায় ছেঁড়া। পুলিশের গুলি তার বুক এফোঁড়-ওফোঁড় হয়েছিল। প্রাণে বেঁচে গেলেও অনেক ভাবনা কুরে খাচ্ছে তাকে। কীভাবে সংসার চলবে, কীভাবে ভাইবোনদের লেখাপড়ার খরচ চালাবেন। কবেই বা সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরবেন। ফের কাজে যোগ দিতে পারবেন কি না। এখনো চিকিৎসা চলছে। ইতিমধ্যে অনেক খরচ হয়ে গেছে। অনেক টাকা ধার করতে হয়েছে। ওই টাকা পরিশোধ হবে কী করে। স্বজনরা জানান, গুলি ফুসফুস ও কলিজায়ও আঘাত করেছে। ডাক্তার বলছেন তার অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা ভালো হলেও আশঙ্কামুক্ত নয়।
রুবেল একটি ওয়ার্কশপে কাজ করতেন। গত ২০ জুলাই বিকেলে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে রাজধানীর মতিঝিলের গোলাপবাগ এলাকায় আন্দোলনে যোগ দেন। ওই দিন বিকেলে গোলাপবাগে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা। এ সময় হঠাৎ গুলিবিদ্ধ হন রুবেল। রুবেলের পিঠে গুলি লাগে। যা তার বুক চিরে বের হয়ে যায়। উদ্ধার করে প্রথমে মুগদা হাসপাতাল এবং পরে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে এলে অস্ত্রোপচার করা হয়। এক মাস ধরে চিকিৎসাধীন আছেন রুবেল। গুলিবিদ্ধ রুবেলের সহযোগিতায় তার মা ডালিয়া আক্তার ও বোন সনিয়া আক্তার সব সময় হাসপাতালে থাকেন। বোন সনিয়া একটি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে লেখাপড়া করেন। ছোট ভাই রাকিব পার্সেল ডেলিভারির কাজ করেন। বাবা মারা যাওয়ার পর চারজনের সংসার চালাতেন রুবেল। এ ছাড়া তার বড় দুই ভাই রয়েছেন, যারা বিয়ে করে আলাদা সংসার করছেন। তারা এই পরিবারের কাছে আসেন না। ভাইয়ের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর শুনে একবার এসে দেখে গেছেন, আর কোনো খবর নেই।
ছেলের এমন অবস্থা নিয়ে মা ডালিয়া আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বামী মারা গেছেন প্রায় ১০ বছর হয়েছে। বড় দুই ছেলে বিয়ে করে আলাদা সংসার করছে। আমার এই ছেলে (রুবেল) ওয়ার্কশপে কাজ করে আমাদের চারজনের সংসার চালায়। এখন গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালের বেডে পড়ে আছে। জানি না কীভাবে সংসার চলবে, ওর ছোট ভাইবোনরা কীভাবে লেখাপড়া করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রুবেলের পেছনে এখন পর্যন্ত ৭৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ধার করা। এখন চিকিৎসা ফ্রি করা হয়েছে, ওষুধ কিনতে হচ্ছে। প্রতিদিন ৪ হাজার টাকার একটি ‘কভিবেন ১২০০ এমএল’ সাদা রঙের স্যালাইন দিতে হয়। ছেলের চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছে না। এক মাসে শুকিয়ে গেছে। সব মিলেয়ে চিন্তার কোনো শেষ নেই বাবা।’
মা ডালিয়া আক্তার বলেন, ‘রুবেল ভবিষ্যতে একটি ওয়ার্কশপের দোকান দিতে চেয়েছিল। তার চিন্তা ছিল পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভালোভাবে থাকবে। বড় দুই ভাই বিয়ে করে আলাদা সংসার করছে। তখন থেকেই রুবেল বলছিল, “মা, তোমাদের ছেড়ে আমি যাব না।” সেই ছেলে আজ হাসপাতালের বেডে বসে কান্না করছে।’