ভারী বৃষ্টিপাত এবং মুহুরী ও ফেনী নদীর পানিতে আশপাশের অন্যান্য এলাকার মতো প্লাবিত হয়েছে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। গত তিনদিন ধরে প্রায় ৫ ফুট পানিতে তলিয়ে রয়েছে উপজেলার নবাবপুর, আমিরাবাদ ও মতিগঞ্জ ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা। বসতবাড়িতে পানিবন্দি হয়ে আছে শত শত পরিবার। পানিতে তলিয়ে যাওয়াতে চুলোয় আগুন জ্বালাতে না পেরে শুকনো খাবার খেয়ে জীবন পার করছে তারা। সংকট তৈরি হয়েছে বিশুদ্ধ পানির। তিনদিন বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় ভুতুড়ে অবস্থা বিরাজ করছে দুর্গত এলাকায়। প্রশাসনের তৎপরতা নেই বললেই চলে। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সাহায্য সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে দুর্গত এলাকার জনসাধারণ।
সরেজমিনে উপজেলার মতিগঞ্জ ইউনিয়নের দৌলতকান্দি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পুরো এলাকা পানিতে ডুবে রয়েছে। কথা হয় ওই গ্রামের বাদশা মিয়া বাড়ির সত্তরোর্ধ তাজুল ইসলাম ও তার ছেলে কাউসার মিয়ার সঙ্গে। তারা জানায়, গত তিন ধরে বাড়িতে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। চুলোয় আগুন জালাতে পারেননি তাই শুকনো খাবার খেয়ে বেঁচে আছেন। পরিবারের নারী সদস্যদের আশ্রয়কেন্দ্রে রেখে এসেছেন। চুরি-ডাকাতির ভয়ে পানিবন্দি অবস্থায় বসতঘরেই অবস্থান করছেন।
বন্যার মধ্যেই শুক্রবার কয়েকটি বাড়িতে চুরি হয়েছে বলে জানিয়ে তারা বলেন, ৩ দিনেও প্রশাসনের কেউ খবর নেয়নি। বিশুদ্ধ পানির সংকটে রয়েছেন। গত ৪০ বছরের মধ্যে সোনাগাজীতে কখনো এমন দুর্যোগের মুখোমুখি হয়নি মানুষ।
আমিরাবাদ ইউনিয়নের সফরপুর গ্রামের হামিদ উল্যা ভুঞা বাড়ির শরিফুল ইসলাম বলেন, পরিবারের সবাই পানিবন্দি হয়ে বাড়িতে অবস্থান করছে। চারদিকে থৈ থৈ পানি, ডুবে গেছে রান্নাঘর, চুলোতে আগুন জ্বালাতে পারেনি। তাই বাধ্য হয়ে চিড়া-মুড়িসহ শুকনো খাবার জীবন রক্ষার অবলম্বন হয়ে উঠেছে।
একই ধরনের বক্তব্য দেন মানুমিয়া বাজার এলাকার অহিদুর রহমান বাড়ির জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, আর কয়েকদিন পানিবন্দি অবস্থায় থাকলে বিশুদ্ধ পানির অভাবে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগে মানুষ আক্রান্ত হবে। এলাকার একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবক ও বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলে দুর্গত মানুষদের অস্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছে। সরবরাহ করছে খাদ্যসামগ্রী। প্রশাসনের সহযোগিতা না পেলে এসব কার্যক্রম চালিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে যাবে।
নবাবপুর ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামের আনোয়ারুল আজিম লিটন বলেন, স্বেচ্ছাসেবক ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সরবরাহ করা শুকনো খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এলাকার মানুষ। এলাকা পানিতে তলিয়ে থাকায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না, হাটবাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদার কারণে দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। তিনদিন ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় রাতে ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায় স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে সবাই উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় রয়েছে।
এদিকে ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য নজির স্থাপন করেছে সোনাগাজীর মতিগঞ্জ ইউনিয়নের দুর্গত জনসাধারণ। গত তিনদিন আগে এলাকা পানিতে তলিয়ে গেলে স্থানীয়রা মতিগঞ্জ ইউনিয়নের মতিগঞ্জ বাজারে অবস্থিত মতিগঞ্জ কমিউনিটি সেন্টারকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। ওই আশ্রয়কেন্দ্র ঠাঁই হয়েছে প্রায় ২ হাজার শিশু ও নারী-পুরুষ। এদের মধ্যে রয়েছে অন্তত ৩ শতাধিক হিন্দু সম্প্রদায়ের জনসাধারণ।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক এমরান চৌধুরী জানায়, প্রথম দিন আশ্রয় নেওয়া মানুষদের জন্য দুইবেলা খাবার সরবরাহ করেছেন কমিউনিটি সেন্টারের মালিক জয়নাল আবদীন। মুসলমান ও হিন্দুরা একসঙ্গে খাবার খেয়েছে। পরে সবার মাঝে শুকনো খাবার সরবরাহ করা হয়। গতকাল থেকে মুসলমান ও হিন্দুরা মিলেমিশে কমিউনিটি সেন্টারে রান্না করে খাচ্ছে।