কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলো। বন্যায় বিপর্যস্ত ১২ জেলা, পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। এসব জেলার অনেক এলাকা এখনো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। তবে এরই মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে। দেশের নদ-নদীগুলোর পানি কমতে শুরু করেছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদীর পানি কমছে। গতকাল শনিবার বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এ তথ্য জানিয়েছে।
বন্যাকবলিত জেলাগুলোর মধ্যে আট জেলায় পানি কমার খবর পাওয়া গেছে। যদিও এ এলাকাগুলোর বেশিরভাগ প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি গতকালও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। অবশ্য পানি কমতে শুরু করলেও নতুন করে কিছু জনপদ বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। কুমিল্লায় গোমতী নদীর ভাঙা বাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে বুড়িচং উপজেলার অন্তত ৩৫টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে।
দেশে স্মরণকালের ভয়াবহ এই বন্যায় ১২ জেলার ৭৭ উপজেলার ৫০ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় আরও তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে চার দিনে ১৮ জনের মৃত্যু হলো। বন্যাদুর্গত জেলাগুলো হলো ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজার।
এদিকে পানি কমতে শুরু করায় বন্যাদুর্গতের মধ্যে আতঙ্ক কিছুটা কমলেও দুর্ভোগ তাদের পিছু ছাড়েনি। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুর্ভোগের পরিমাণ আরও বেড়েছে। দুর্গত এলাকায় বানভাসিদের মধ্যে চলছে ত্রাণের জন্য হাহাকার। বানের জলে বসতবাড়ি-সড়ক, ডুবেছে সবই। গ্রামে-গ্রামে দেখা দিয়েছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। রান্নাঘর ও শৌচাগার ডুবে যাওয়ায় চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে বন্যার্ত এলাকার নারী-শিশুসহ পরিবারের বয়স্ক সদস্যরা। পানিবন্দি বহু পরিবার অর্ধাহারে-অনাহারে দিন পার করছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে সরকারি-বেসরকারিভাবে শুকনো খাবার ও কিছু ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হলেও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ত্রাণ নিয়ে কেউ যাচ্ছেন না। রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে ও ভেঙে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে পানিবন্দিদের উদ্ধারে সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখের বেশি মানুষ : চলমান বন্যায় গতকাল পর্যন্ত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ। গতকাল সন্ধ্যায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়। এতে বলা হয়, ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজার জেলার ৭৭ উপজেলা বন্যায় প্লাবিত এবং ৫৮৭টি ইউনিয়ন বা পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া বন্যায় ১১ জেলায় ৯ লাখ ৭৯ হাজার ৯০১ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫০ লাখ ৯৩ হাজার ৫৩০ জন। বন্যায় চট্টগ্রামে ৫ জন, কুমিল্লায় ৪, নোয়াখালীতে ৩, কক্সবাজারে ৩ এবং ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও লক্ষ্মীপুরে একজন করে মারা গেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, পানিবন্দি বা ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য ৩ হাজার ৫১৩টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় ৩ লাখ ১ হাজার ৯৯৩ জন মানুষ এবং ২১ হাজার ৬৯৫টি গবাদি পশুকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসাসেবার জন্য ৭৬৯টি মেডিকেল টিম চালু রয়েছে বলেও জানায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
কমছে নদ-নদীর পানি : বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের গতকালের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় পূর্বাঞ্চলীয় কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ফেনীর ভারতীয় ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এবং ত্রিপুরা প্রদেশের অভ্যন্তরীণ অববাহিকায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি। ফলে উজানের নদ-নদীর পানি কমে যাচ্ছে। মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ফেনী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি গত শুক্রবার থেকে উন্নতি হচ্ছে।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর বরাত দিয়ে আরও বলা হয়, পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও এর কাছাকাছি উজানে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। এ সময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু, খোয়াই, ধলাই নদীগুলোর কাছের নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। ২৪ ঘণ্টায় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। এ সময় এ অঞ্চলের ফেনী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের মুহুরী, ফেনী, গোমতী, হালদা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
পূর্বাভাসে বলা হয়, গতকাল ছয় নদীর নয়টি স্টেশনে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সেগুলো হলো অমরশীদ (কুশিয়ারা নদী) ১৪ সেন্টিমিটার, শেওলা (কুশিয়ারা) ১, শেরপুর-সিলেট (কুশিয়ারা) ৯, মারকুলী (কুশিয়ারা) ৪, মৌলভীবাজার (মনু) ৯১, বাল্লা (খোয়াই) ৪৪ ও কুমিল্লা (গোমতী) ৯৬। এ ছাড়া রামগড় (ফেনী) ও পরশুরাম (মুহুরী) যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে। বিপদসীমার নিচে নেমে এসেছে হবিগঞ্জ (খোয়াই), মনু রেলওয়ে ব্রিজ (মনু), দেবীদ্বার (গোমতী), নারায়ণহাট (হালদা) ও পাঁচপুকুরিয়া (হালদা) স্টেশনের পানি।
এখনো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ফেনী : বন্যায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ফেনী জেলার। পানিতে ভাসছে জেলা শহর। জেলা শহরের সঙ্গে ছয় উপজেলাই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় জেলার কয়েকটি গ্রামের মানুষের অবস্থার খবর পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ফেনী সদর, পরশুরাম, সোনাগাজী, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলা। মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভাঙা জায়গা দিয়ে প্রবল বেগে পানি ঢুকে ডুবছে জনপদ। জেলার ২০ লাখের বেশি মানুষ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এই জেলায় প্রায় ১ লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী ও পরশুরাম এই তিন উপজেলার পুরোটাই বন্যাকবলিত। সদর ও দাগনভূঞা উপজেলার ৮০ শতাংশ এলাকার মানুষ পানিবন্দি। সোনাগাজী উপজেলার সব ইউনিয়নে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ দুর্ভোগে আছে।
পানিবন্দি মানুষ জানান, তারা খাবার ও সুপেয় পানির তীব্র সংকটে আছেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী অংশে কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও বুকসমান পানি। এ কারণে যানচলাচল করতে পারছে না।
জেলায় মোবাইল ফোনের ৯২ শতাংশ টাওয়ারই অচল হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকা এবং টাওয়ার এলাকা ডুবে যাওয়ায় নেটওয়ার্ক সচল করা যাচ্ছে না।
সোনাগাজী উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল তিন ধরে প্রায় পাঁচ ফুট পানিতে তলিয়ে রয়েছে। বাড়িতে পানিবন্দি হয়ে আছে শত শত পরিবার। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চুলোয় আগুন জালাতে না পেরে শুকনো খাবার খেয়ে কোনোমতে বেছে আছেন দুর্গতরা। সংকট দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির। মতিগঞ্জ ইউনিয়নের দৌলতকান্দি গ্রামের বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব তাজুল ইসলাম বলেন, তিন ধরে বাড়িতে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। শুকনো খাবার খেয়ে বেঁচে আছেন। পরিবারের নারী ও বয়স্ক সদস্যদের আশ্রয়কেন্দ্রে রেখে এসেছেন। চুরি-ডাকাতির ভয়ে বাড়িতে অবস্থান করছেন। গত তিন দিনেও প্রশাসনের কেউ তাদের খবর নেয়নি বলেও জানান তাজুল ইসলাম।
আমিরাবাদ ইউনিয়নের সফরপুর গ্রামের শরিফুল ইসলাম বলেন, পরিবারের সবাই পানিবন্দি হয়ে বাড়িতে অবস্থান করছেন। চারদিকে থই থই পানি, ডুবে গেছে রান্নাঘর, চুলোতে আগুন জ¦ালাতে পারেননি, তাই বাধ্য হয়ে চিড়া, মুড়িসহ শুকনো বিভিন্ন খাবার খেয়ে দিন পার করছেন।
নবাবপুর ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামের আনোয়ারুল আজিম লিটন বলেন, হাটবাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদার কারণে দাম বেড়েছে কয়েক গুণ।
ডুবছে বুড়িচংয়ের গ্রামের পর গ্রাম : কুমিল্লায় গোমতী নদীর পানি ১৩৪ সেন্টিমিটার বেড়ে গিয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে বাঁধ ভেঙে ১০০টির বেশি গ্রাম বন্যায় প্লাবিত হয়। যদিও শুক্রবার ও গতকাল তেমন বৃষ্টি হয়নি। গতকাল বেলা ১১টার তথ্য অনুযায়ী আগের ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৩৬ সেন্টিমিটার পানি কমেছে গোমতীতে। তবে বাঁধের ভাঙা জায়গা দিয়ে প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। গতকাল নতুন করে রাজাপুর ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রাম, লড়িবাগ, বারেশ্বর এবং শংকুচাইলসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা এএফ হাসান আরিফ গতকাল সকালে জেলার চৌদ্দগ্রামের বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি হতাশাগ্রস্ত না হয়ে সবাইকে ধৈর্য ধারণ করে পরিস্থিতি মোকাবিলার আহ্বান জানান।
চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি : চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গত দুদিন বৃষ্টি না থাকায় হালদা নদীতে পাহাড়ি ঢলের পানির পরিমাণ কমতে শুরু করেছে। তবে বন্যাদুর্গত এলাকার সুপেয় পানীয় জলের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। রান্নাঘরের চুলায় বানের পানি ঢুকে পড়ায় অনেক পরিবার ঘরে রান্না করতে পারছে না।
জেলার ফটিকছড়িতে বন্যার পানির স্রোতে ভেসে গিয়ে মো. এমরান (২২) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকাল ১০টার দিকে নারায়ণহাট ইউপির ১ নম্বর ওয়ার্ডের মইজ্ঞেপুকুর নামক এলাকায় তার লাশ পাওয়া যায়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার একই এলাকার সন্দ্বীপনগর গ্রামের ইছহাক ডাক্তার বাড়ির পূর্বপাশে নগরবাজার সড়ক থেকে নিখোঁজ হন ওই যুবক। এ ছাড়াও দাঁতমারা ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মো. সাহাদাত হোসেন সামী নামে একজন এখনো নিখোঁজ আছেন।
খুলে দেওয়া হচ্ছে কাপ্তাই বাঁধের স্পিলওয়ে : রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হয়েছে। বৃষ্টি কমে আসায় এবং কাচালং নদীর পানি নেমে যাওয়ায় বাঘাইছড়িতে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। এই উপজেলায় ৩১টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছিল। গতকাল বাঘাইছড়ির বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা।
এদিকে টানা বৃষ্টিপাতের ফলে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর বিপদসীমায় পৌঁছে যাওয়ায় কাপ্তাই বাঁধের স্পিলওয়েগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গতকাল বিকেলে কাপ্তাই পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্র এই তথ্য জানায়। এতে বলা হয়, গতকাল শনিবার রাত ১০টায় স্পিলওয়ের ১৬টি গেটের ৬ ইঞ্চি করে খুলে দেওয়া হবে। এতে প্রতি সেকেন্ডে ৯ হাজার কিউসেক ফিট পানি নিষ্কাশিত হবে।
খাগড়াছড়ির বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি : খাগড়াছড়ি জেলা সদরের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। চেঙ্গী নদীতে বিপদসীমার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তরা বাড়িতে ফিরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তবে দীঘিনালার মেরুং ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের নিচু এলাকা এবং রামগড়ের কিছু এলাকায় এখনো পানি রয়ে গেছে।
সড়ক থেকে পানি নেমে যাওয়ায় খাগড়াছড়ির সঙ্গে রাঙ্গামাটির লংগদু ও বাঘাইছড়ির সড়ক যোগাযোগ পুনরায় চালু হয়েছে। সড়ক থেকে পানি নেমে যাওয়ায় সাজেকে আটকে পড়া আড়াইশ পর্যটককে গাড়িতে নিয়ে এসেছে সেনাবাহিনী। এ ছাড়া পাহাড় ধসের কারণে প্রায় ৭ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর খাগড়াছড়ি-ফেনী সড়কে আবারও যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ সহায়তায় কাজ করছে সেনাবাহিনী, বিজিবি, প্রশাসনসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন।
হবিগঞ্জেও পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি : হবিগঞ্জে গতকাল খোয়াই নদীর বাল্লা পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৪৪ সেমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও শায়েস্তাগঞ্জ ও মাছুলিয়া পয়েন্টে নিচে নেমে আসে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, প্রতি ঘণ্টায় ২ সেন্টিমিটার করে পানি কমছে। জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ কার্যালয় জানায়, জেলার একটি উপজেলা ও ৭টি ইউনিয়ন নতুন করে বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এ নিয়ে জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে ৬টি উপজেলার ২৯টি ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হলো। পানিবন্দি রয়েছে ১৬ হাজার ৪৪০টি পরিবার। এদিকে সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ এখনো পুনঃস্থাপিত হয়নি।
রিচি ইউনিয়নের সুলতান মাহমুদপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া লোকজন জানান, তারা কোনো সরকারি ত্রাণ পাননি। স্বেচ্ছাসেবীদের দেওয়া চিড়া, মুড়ি খেয়ে বেঁচে আছেন।
মৌলভীবাজারে পানি কমলেও দুর্ভোগ বাড়ছে : মৌলভীবাজারের বিভিন্ন এলাকায় কমতে শুরু করেছে বন্যার পানি। দুদিন বন্ধ থাকার পর দূরপাল্লার যান চলাচলও শুরু রয়েছে। তবে কমেনি পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ। কুলাউড়া উপজেলার টিলাগাঁওয়ে পাল্লাকান্দি গ্রামের সখিনা আক্তার বলেন, ‘পানি কমতে শুরু করলেও ঘর ভেঙে গেছে। ঘরের চুলা না থাকায় শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে। অনেকের শুকনা খাবারেরও অভাব দেখা দিচ্ছে।’
গতকাল দুপুরে টিলাগাঁও ইউনিয়নে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে মেডিকেল ক্যাম্প ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সেনাবাহিনীর ১৭ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও সিলেট এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল চৌধুরী মোহাম্মদ আজিজুল হক হাজারী।
আখাউড়ায় বন্যার পানি কমায় জনমনে স্বস্তি : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় বন্যা পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। গত দুদিন বৃষ্টি না হওয়ায় এবং ভারত থেকে আসা পানির স্রোত কম থাকায় বন্যার পানি নেমে যেতে শুরু করেছে। কোথায়ও কোথাও জমির আইল ভেসে উঠেছে। অধিকাংশ বাসাবাড়ি, ঘর থেকে পানি নেমে গেছে। তবে নিচু এলাকার কৃষিজমি ও বাড়ির পানি পুরোপুরি নামেনি। আখাউড়া স্থলবন্দর ও শুল্ক বিভাগের অফিস চত্বরের পানিও অনেকটা নেমে গেছে। ইমিগ্রেশন অফিসেও পানি নেই।
লক্ষ্মীপুরে পানিতে ভাসছে সোয়া লাখ পরিবার : বন্যায় ডুবেছে লক্ষ্মীপুরের ৫ উপজেলা। জেলার অন্তত ১ লাখ ২৪ হাজার ১০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এসব উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা কমলনগর উপজেলার চরকাদিরা, রামগতি, চরআলগী, চরবাদাম, চররমিজ, চরপোড়া গাছা, চরসিকান্দার, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার উত্তর হামছাদী, দক্ষিণ হামছাদী, দালাল বাজার, চররহিতা, চন্দ্রগঞ্জ, হাজিরপাড়া, উত্তর জয়পুর, মান্দারী, লাহারকান্দি, দিঘলী ইউনিয়ন এবং পৌর শহরের ১, ৩, ১৪, ১৫, নম্বর ওয়ার্ড।
নিজস্ব প্রতিবেদক এবং সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি।