স্বাক্ষর জাল করে প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য

নাটোর শহরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মহারাজা জে.এন স্কুল এন্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির সাথে যোগসাজসে অবৈধভাবে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ এবং তথ্য জালিয়াতি করে এমপিও কার্যক্রমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাটোরে ও রাজশাহী শহরে জায়গা, গাড়ি,বিঘা বিঘা জমি,গরুর ফার্ম, বেশ কয়েকটি পুকুরের ব্যবসা, শোরুমের ব্যবসায়ী পার্টনার সহ সব করেছে তারা কয়েক বছরেই। নিজেকে অধ্যক্ষ হিসেবে পরিচয় দিলেও এই প্রধান শিক্ষকের নিয়োগ প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ রয়েছে।

জানা যায়, ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির কলেজ শাখার যাত্রা শুরু করে। শহরের প্রাণ কেন্দ্রে হওয়ায় শুরু থেকেই শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল সন্তোষজনক। পাঠদানের অনুমতি, একাডেমিক স্বীকৃতি পর এমপিওর জন্য আশায় থাকে শিক্ষকেরা। প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালে এমপিও ঘোষণার পর প্রতিষ্ঠানের সভাপতি কাউন্সিলর জাহিদুর রহমান জাহিদ এবং প্রধান শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম বিভিন্ন অজুহাতে ও কৌশলে এমপিও করানোর বাবদ ১৮ জন শিক্ষক-কর্মচারীদের নিকট থেকে কোটি টাকার বাণিজ্য করে ।

ব্যানবেইজের তথ্যমতে শুরু থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দুজন প্রভাষক গণিতের মো. আব্দুল মান্নান এবং ইংরেজি প্রভাষক ওমর ফারুক কর্মরত থাকলেও কলেজ এমপিও ঘোষণা পর তাদের বিভিন্ন হুমকি ধামকি দিয়ে কলেজ থেকে বিতাড়িত করে দেওয়া হয়। ওই দুই প্রভাষকের পরিবর্তে অর্ধকোটি টাকার বিনিময়ে গণিত প্রভাষক পদে মো. আশরাফুল ইসলামকে ও ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক পদে সুনাম চন্দ্রকে  ব্যাকডেটে দেখিয়ে ২০১৫ সালে নিয়োগ দেওয়া হয়।

পুনরায় আবার রেজুলেশন করে তৎকালীন ডিজি প্রতিনিধি ও এন এস সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ দিলিপ কুমার ভদ্র মহোদয়ের কাছে  স্বাক্ষর করাতে গেলে তিনি নিয়মের বাইরে কোথায় স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানায়। রাজনীতি চাপ ও মোটা অংকের টাকা প্রস্তাব দিয়েও নিয়োগকালীন ডিজি প্রতিনিধি স্বাক্ষর না করলে তার স্বাক্ষর জাল করে নিজেরাই সকল নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এবং এমপিও ভুক্ত করান।

এ বিষয়ে তৎকালীন ডিজি প্রতিনিধি ও এন এস সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ দিলিপ কুমার ভদ্র বলেন, ‘মহারাজার কলেজ শাখাটি এমপিওভূক্ত ঘোষণা হওয়ার পর বর্তমান প্রধান শিক্ষক আশরাফ সাহেব আমার বাসায় এসে তার নিজের মনগড়া তৈরি করা রেজুলেশন, নিয়োগ ফলাফল সীটে স্বাক্ষর করতে বললে ২০১৫ সালের সাথে মিল না থাকায় তাতে আমি স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানাই। রাজনৈতিক নেতার ফোন এবং টাকার প্রস্তাব দিলেও এই অবৈধ কাজে সম্মতি না দিয়ে এনটিআরসিএ এর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের পরামর্শ দেই। পরে শুনলাম আমার স্বাক্ষর জাল করে সকল নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। 

ব্যানবেইসের তথ্যসহ ২০১৮ সালে সরকারিভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অডিটেও আগের ২ জন শিক্ষকদের তথ্য প্রদান করা হয়েছে। জালিয়াতি করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এমপিওভুক্ত করতে ওই দুজন প্রভাষক বাদেও বাকী ১৬ জন প্রভাষক ও কর্মচারীদের নিকট থেকে বিভিন্ন অজুহাতে মোটা অংকের টাকা আদায় করে।

একাধিক শিক্ষক বলেন, বিভিন্ন কৌশলে আমাদের সবার কাছ থেকে ৫ থেকে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জোর করে আদায় করেছে। এমনকি প্রাপ্ত বকেয়া টাকা তুলতে জনপ্রতি লক্ষাধিক করে টাকা নিয়েছে প্রধান শিক্ষক।

২০২১ সালের সর্বশেষ এমপিও নীতি মালা অনুসারে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় (৬ষ্ঠ থেকে দ্বাদশ) পর্যন্ত ৪জন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ হওয়ার কথা কিন্তু নিয়মনীতি উপেক্ষা করে তথ্য জালিয়াতি করে ৯ জনকে নিয়োগ দিয়ে এমপিও ভুক্ত করেছেন। ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী প্রাপ্ত ৩জন পূরণ থাকা সত্তেও  আবারো মোটা অংকের টাকা দিয়ে এ মাসের ১ তারিখে আরও একজনকে নিয়োগ দিয়েছেন। 

এই সকল অবৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে অন্তত প্রায় এক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তারা। নিয়োগকৃত সবাই নিকট আত্মীয়। নিয়োগকৃত এই পদ গুলোতে একাধিক ব্যক্তির নিকট থেকে টাকা নেওয়ার অকাট্য তথ্য ভিত্তিক প্রমাণ রয়েছে। জাহিদ সভাপতি হওয়ার পর থেকে অবৈধ টাকা আয় করার আতুরঘরে পরিণত করেছে এই প্রতিষ্ঠানটিকে। সরকারী বিভিন্ন অনুদানের টাকা আত্নসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে, দলীয় প্রভাব খাটিয়ে শতবছরের প্রায় ২০টি পুরাতন গাছ বিক্রি করে টাকা লুটপাট করার অভিযোগও রয়েছে এই সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে।

স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ব্যাকডেটে নিয়োগ এবং তথ্য জালিয়াতি করে অতিরিক্ত কর্মচারী নিয়োগ বিষয় জানতে চাইলে অভিযুক্ত বর্তমান প্রধান শিক্ষক মো. আশরাফুল ইসলাম স্বীকার করে বলেন, ‘আমি সভাপতির চাপে এসব করেছি। বেতন করানোসহ আর্থিক বিষয়ে সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদোত্তর দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন।

সভাপতি জাহিদুর রহমান জাহিদ কোটা আন্দোলনের পর থেকে পলাতক রয়েছে এবং তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

২০১৫ সালে নিয়োগকালীন সময়কার প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মজিদ এ বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, সরকারী বিধি মোতাবেক আমি সেই সময় এন এস কলেজে গিয়ে ডিজি মহোদয় ও অন্যান্য সদস্যদের সাথে নিয়ে নিয়োগবোর্ড সম্পন্ন করেছিলাম। পরে ব্যাকডেটে কোনো নিয়োগের সাথে আমার সম্পৃক্ততা নেই এবং আমি কোথায় কোনো স্বাক্ষর করিনি।

এ বিষয়ে নাটোরের জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) এবং অত্র প্রতিষ্ঠানের গভর্ণিং বডির সভাপতি মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়ে একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে তদন্ত করে দোষী প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’