নাটোরে ড্রিলের ফলা রেখে রোগীর পা সেলাইয়ের অভিযোগ

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ০৭:০৭ পিএম

নাটোরের বড়াইগ্রামের বনপাড়ায় অবস্থিত জাহেদা ক্লিনিকে এক নারীর পায়ের অস্ত্রোপচারের সময় ব্যবহৃত ড্রিল মেশিনের একটি ভাঙা ফলা হাড়ের ভেতরে রেখেই সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

পরে ক্ষতস্থানে সংক্রমণ ও মাংস পচে যাওয়ায় তাঁর বাম পা কেটে ফেলার শঙ্কা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ঢাকার একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে প্রায় ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে দ্বিতীয় দফায় জটিল অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে তাঁকে।

ভুক্তভোগী আনোয়ারা বেগম (৫৫) গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবারিষা ইউনিয়নের লালচাঁন মোহাম্মদের স্ত্রী। গত ৩ জুন রাতে বনপাড়ার জাহেদা ক্লিনিকে তাঁর বাম পায়ের গোড়ালির ওপরে অস্ত্রোপচার করেন গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অর্থোপেডিক্স বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসক নিজেই অ্যানেস্থেশিয়া প্রয়োগ করেন। জাহেদা ক্লিনিকটি চিকিৎসক জাহিদুল ইসলামের ব্যক্তিমালিকানাধীন বলে জানা গেছে।

আনোয়ারা বেগম জানান, সফলভাবে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হলে এক মাসের মধ্যেই তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারতেন। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর থেকেই নানা জটিলতা দেখা দেয়। এতে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকার পাশাপাশি অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে হচ্ছে তাঁকে।

রোগীর স্বামী লালচাঁন মোহাম্মদ বলেন, গত ৩ জুন পা পিছলে পড়ে তাঁর স্ত্রীর বাম পায়ের গোড়ালির কাছে হাড় ভেঙে যায়। প্রথমে তাঁকে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম ব্যক্তিগতভাবে পরিচালিত জাহেদা ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। প্রায় ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে সেখানে অস্ত্রোপচার করা হয়।

তিনি অভিযোগ করেন, অস্ত্রোপচারের পর করা এক্স-রে প্রতিবেদনে ড্রিল মেশিনের ভাঙা ফলাটি স্পষ্ট দেখা গেলেও সেটি অপসারণ করা হয়নি। কয়েক দিনের মধ্যেই ক্ষতস্থান থেকে পুঁজ বের হতে শুরু করে। প্রায় ২৫ দিন গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিত ড্রেসিং করানো হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। পরে চিকিৎসকও আর চিকিৎসা দিতে আগ্রহ দেখাননি। বাধ্য হয়ে তাঁরা রোগীকে ঢাকায় নিয়ে যান।

পরিবারের দাবি, ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. নারায়ণ চন্দ্র রোগী ও এক্স-রে দেখে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি জানান, চিকিৎসায় দেরি হলে পা কেটে ফেলতে হতে পারে।

পরে ঢাকার ট্রমা সেন্টারের অর্থোপেডিক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. আয়ুব আলীর তত্ত্বাবধানে নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।

তিনি জানান, অস্ত্রোপচারের সময় ড্রিল মেশিনের ফলা ভেঙে হাড়ের ভেতরে আটকে ছিল। হাড় জোড়া দিতে ব্যবহৃত প্লেটের নাট-বল্টুও সঠিকভাবে স্থাপন করা হয়নি। সংক্রমণ ছড়িয়ে মাংস ও হাড় পর্যন্ত পচন ধরেছিল। পরে ক্ষতিগ্রস্ত মাংস অপসারণ করে শরীরের অন্য অংশের মাংস প্রতিস্থাপন এবং প্লাস্টিক সার্জারি করা হয়।

ডা. আয়ুব আলী বলেন, হাড়ের গভীরে আটকে থাকা ড্রিলের ফলাটি অপসারণ করলে পা কেটে ফেলতে হতে পারে। তাই আপাতত ওষুধের মাধ্যমে সেটির প্রভাব কমানোর চেষ্টা চলছে। প্রায় ২২ দিন চিকিৎসার পর রোগীকে বাড়ি পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রথম অস্ত্রোপচারটি সফল হয়নি। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ক্ষেত্রে এমন অবহেলা রোগীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। আরও কয়েক দিন দেরি হলে রোগীর পা কেটে ফেলতে হতে পারত। চিকিৎসকদের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম বলেন, অস্ত্রোপচারের সময় ড্রিল করার ক্ষেত্রে অনেক সময় ফলা ভেঙে হাড়ের ভেতরে আটকে যেতে পারে। আনোয়ারা বেগমের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে। তবে তাঁর দাবি, এ কারণে রোগীর পা কেটে ফেলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। 



 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত