চাকরি করা হলো না সাজিদের গুলিতে চোখ নষ্ট নাইমুলের

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে গত ৪ আগস্ট ঢাকার মিরপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন ইকরামুল হক ওরফে সাজিদ। মাথার পেছনে গুলি লেগে ডান চোখ দিয়ে বের হয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে মৃত্যুর সঙ্গে ১০ দিন পাঞ্জা লড়ে গত ১৪ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

সাজিদ ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার বিলকুকরী এলাকার জিয়াউল হকের ছেলে। সাজিদের বাবা বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার। অবসরের পরে তিনি ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করেন। পরিবার নিয়ে ঢাকার কাফরুল এলাকায় বসবাস করতেন।

সাজিদের বাবা জিয়াউল হক জানান, কয়েক মাস পরেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রিটা কমপ্লিট হওয়ার কথা ছিল। তারপর চাকরি হলেই পরিবারের সব দায়িত্ব নেওয়ার ইচ্ছে পোষণ করেছিল সাজিদ। কিন্তু তার আর সেই ইচ্ছা পূরণ হলো না। গত ১৫ আগস্ট সকালে বিলকুকরী গ্রামে তাকে কবর দেওয়া হয়।

সাজিদের মামা আব্দুর রাজ্জাক জানান, সাজিদ ঢাকায় বেড়ে উঠলেও গ্রামের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। মাসখানেক আগে বাড়িতে এসেছিল সাজিদ। অল্প সময় থেকেই ঢাকায় চলে যায়। তারপর থেকে আন্দোলনে সক্রিয় থাকায় আর বাড়ি আসেনি। বাড়িতে এলো লাশ হয়ে।

টাঙ্গাইল ধনবাড়ী উপজেলার বিলকুকরী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের একটি কক্ষে বিলাপ করছেন তার মা লিপি বেগম। স্বজনরা তাকে সান্ত¡না দিচ্ছেন। কিন্তু কোনো সান্ত¡নাই তার কান্না থামাতে পারছে না। তিনি চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আমার সাজিদের নাম মিশা গেল গো..., আমি দুনিয়াতে কেমনে বাঁচমু গো...। আমারে আর কেউ মা বইলা ডাকব না গো...।’

এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গিয়ে পুলিশের ছোড়া টিয়ার গ্যাসের শেলের আঘাতে চোখের দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছেন বগুড়ার নাইমুল হক। এরই মধ্যে বগুড়া ও ঢাকায় তিনবার অপারেশন করার পরেও তিনি ডান চোখ দিয়ে কিছুই দেখতে পারছেন না। চিকিৎসকরা নাইমুলকে আবারও অপারেশনের পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু তাতে চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরবে কি না সে নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না তারা।

নাইমুল বগুড়ার আদমদীঘি রহিম উদ্দিন কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ও দুপচাঁচিয়া উপজেলার তালোড়া বেলঘড়িয়া এলাকার মনোয়ার হোসেনের ছেলে। আহত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত তার পাশে এসে দাঁড়ায়নি কেউ।

নাইমুল হক জানান, গত ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে তিনি বগুড়া শহরে গিয়েছিলেন। ওইদিন তারা শহরের দত্তবাড়ি এলাকায় বিক্ষোভ করছিলেন। দুপুর ১টার দিকে তারা শহরের জিরো পয়েন্টের দিকে এগোতে চাইলে সদর থানার সামনে অবস্থান নেওয়া পুলিশ সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। তখন একটি টিয়ার শেল তার ডান চোখে আঘাত করে। পরে সহপাঠীরা তাকে উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।

তিনি আরও জানান, ওই দিন তার চোখে প্রথম অপারেশন হয়। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি গত ২৭ জুলাই ঢাকার ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে যান। সেখানে দ্বিতীয়বার অপারেশন হয়। পরে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে সর্বশেষ গত ৮ আগস্ট আবারও ইসলামিয়া হাসপাতালে তার অপারেশন হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার আরও অপারেশন প্রয়োজন। তবে অপারেশন করলেই যে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন, সে ব্যাপারে নিশ্চিত নন তারা।

নাইমুল হকের বাবা মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলে দেশে বা বিদেশে উন্নত চিকিৎসা পেলে হয়তো চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। তার চিকিৎসার জন্য সরকারের সহায়তা কামনা করছি।’

বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, ‘বর্তমানে যারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তারা বিপদমুক্ত হলেও পুরোপুরি সেরে উঠতে সময় লাগবে। অনেকে আবার সুস্থ হলেও স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারবেন কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। নাইমুলের চোখের অবস্থা খুবই গুরুতর। তিনি আদৌ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন কি না তা এখনই বলা যাচ্ছে না।’