বাড়ছে খুন, জিম্মি জনজীবন

আপডেট : ১২ জুন ২০২৬, ০৯:১৯ এএম

নোয়াখালীতে ক্রমাগত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। জেলাজুড়ে হত্যাকা-, মাদকের ভয়ানক বিস্তার, সংঘবদ্ধ হামলা, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কিশোর গ্যাংয়ের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে জনজীবন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর অলিগলি, টং দোকান বা নির্মাণাধীন ভবনের মতো স্পর্শকাতর স্থানে অপরাধীদের আনাগোনা বাড়লেও পুলিশের দৃশ্যমান টহল একেবারেই সীমিত। গত এক বছরে ১২টি হত্যাকা- এবং গত এক মাসে একের পর এক খুনের ঘটনা জেলার নিরাপত্তাহীনতাকে চরম রূপ দিয়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চুরি, ডাকাতি ও রাতের জুয়ার আড্ডা, যা নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন অবরুদ্ধ বাসিন্দারা।

গত ৩০ মে রাতে ফরহাদের সঙ্গে পাশের বাড়ির কিশোরদের দ্বন্দ্বে শুরু হয় দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। এ সময় ফরহাদকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারান তার চাচা কামাল। একই রাতে বেগমগঞ্জ উপজেলার শরিফপুরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে প্রাণ হারান জোবায়ের হোসেন রাকিব নামে এক যুবক। হত্যাকা-ের প্রতিবাদে রাকিবের সমর্থকরা অভিযুক্তদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায়। গত ৪ এপ্রিল সদর উপজেলার দাদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের মারধরে সেলিম নামে এক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়। এ ছাড়া জেলায় প্রতিদিনই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে কিশোর অপরাধীদের একাধিক গ্রুপ। জেলা শহরের প্রধান সড়কে প্রকাশ্যেই মহড়া দিচ্ছে বিভিন্ন চক্রের সদস্যরা। এনটিএস, বিটিআর, কেটিজি, এসআরজি-টু জিরো, এনবিজি-সেভেনটি, এম-সিক্সটিনাইন, ডিএমজি, বোম ই ফোরএস,থ্রিএইটজিরোজিরো-সহ জেলাজুড়ে প্রায় দুই শতাধিক কিশোর গ্যাং গ্রুপ রয়েছে। যার প্রমাণ মিলছে বিভিন্ন ভবন ও সড়কের পাশে থাকা দেয়ালের গায়ে। এসব গ্রুপের সদস্যরা কখনো অস্ত্র হাতে অন্যকে ধাওয়া করছে, কখনো আবার দিচ্ছে অস্ত্রের মহড়া। 

অভিযোগ রয়েছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। যার কারণে বিভিন্ন সময়ে পুলিশের হাতে আটক হলেও সহজেই আইনের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে তারা। এদের ভয়ে মুখ খুলতে চান না অনেকেই। গত ৮ জুন বেগমগঞ্জ উপজেলায় তিনটি বিদেশি পিস্তল, গুলি ও ম্যাগাজিন, রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটর সাইকেলসহ গ্রেপ্তার হয় আব্দুল রহিম নামে এক কিশোর। এর পরের দিনই ৯ জুন একই উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নে সিএনজিযোগে ৪-৫ জনের সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্য দিবালোকে এলোপাতাড়ি গুলি করে ফারুক হোসেন নামে এক যুবককে। ১০ জুন সেনবাগ উপজেলায় মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় ফাহিম নামে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে কবিরহাটে প্রকাশ্যে গণপিটুনিতে এক ব্যক্তির মৃত্যু এবং সদর উপজেলায় জমিসংক্রান্ত বিরোধে এক বৃদ্ধের মৃত্যুর ঘটনাও আলোচনায় আসে। নোয়াখালীর হাতিয়ায় ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর সুখচর ইউনিয়নের জাগলার চর দখল নিয়ে কোপা সামছু ওরফে শামসুদ্দিন  ও আলাউদ্দিন বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ গোলাগুলির ঘটনায় একই দিনে পাঁচজন নিহত ও ১০ জন আহত হয়।

নোয়াখালীতে রাত বাড়লেই বাড়ে উদ্বেগ, জনমনে আতঙ্ক। বিশেষ করে বেগমগঞ্জ ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু টং দোকান, চিপাগলি ও বাজারকেন্দ্রিক এলাকায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আনাগোনা বাড়ে। এ ছাড়া নোয়াখালী জেলা শহরের হরিনারায়ণপুর বাজার, মুসলিম কলোনি, লক্ষ্মীনারায়ণপুর, রাজারামপুর, রাজারামপুর, মাইজদীবাজার, রেলস্টেশনগুলোসহ সুনির্দিষ্ট কিছু স্থানে মাদক বিক্রির অভিযোগ থাকলেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নোয়াখালী পৌরসভার হোয়াইট হলের সামনের বাসিন্দা ফয়সাল অভিযোগ করেন, আমার বাড়ির নিচতলার খালি জায়গায় প্রতিদিন রাতে মাদকসেবীরা এসে মাদকের আসর বসায়। আমি অসুস্থ মানুষ। তাদের নিষেধ করলে তারা অস্ত্র নিয়ে এসে আমাকে ও পরিবারকে হুমকি দেয়। কিশোরগ্যাং ও মাদকসেবীদের ভয়ে ২৪ ঘণ্টা গেটে তালা লাগিয়ে রাখলেও তাদের অত্যাচার থেকে রেহাই পাচ্ছি না। ১০টার পর অনেক এলাকায় পুলিশ দেখা যায় না। কোনো ঘটনা ঘটলে পরে পুলিশ আসে, কিন্তু প্রতিরোধমূলক উপস্থিতি খুবই কম। এভাবে প্রায় প্রতিটি পাড়ামহল্লায় বেড়েছে কিশোর গ্যাং।

স্থানীয়দের মতে, হত্যাকা-, রাজনৈতিক সহিংসতা, জমিসংক্রান্ত বিরোধ ও স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে। এ অবস্থায় গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, বিট পুলিশিং জোরদার এবং কমিউনিটি পুলিশিং কার্যকর করা জরুরি। রাতভর দৃশ্যমান পুলিশ টহল বৃদ্ধি অপরাধপ্রবণ এলাকায় সিসিটিভি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, হত্যাকা- ও সহিংসতার মামলাগুলোর দ্রুত তদন্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘাতপ্রবণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি, জেলা পুলিশের নিয়মিত জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম অপরাধ প্রবণতা কমাতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে নোয়াখালী জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন জানান, নোয়াখালীতে বিভিন্ন উপজেলায় চুরি ছিনতাই এর ঘটনা সংঘটিত হলেও স্থানীয় বা ভিক্টিমরা থানায় অভিযোগ করেন না। পুলিশের প্রতিদিন রাতে টহল কাজ করছে। এ ছাড়া কিশোর গ্যাং প্রতিরোধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত