এস আলম, বেক্সিমকো গ্রুপ ছাড়াও দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা ব্যাংকঋণের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। শীর্ষ ব্যবসায়ীদের বড় অংশই ব্যাংক থেকে বেআইনিভাবে ঋণ নিচ্ছেন। আবার সেই পরিশোধ না করে ক্ষমতাবলে বারবার পুনঃতফসিল কিংবা আদালতে স্থগিতাদেশ নিয়ে নিয়মিত থাকছেন। তবে প্রভাবশালীদের পাশাপাশি ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করার ক্ষেত্রে অখ্যাত কোম্পানিগুলোও পিছিয়ে নেই। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের খেলাপির শীর্ষ তালিকায় থাকা এসব কোম্পানি ৫ হাজার কোটি টাকা ফেরত দিচ্ছে না, যা ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৩৪ শতাংশ।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে মেসার্স টি অ্যান্ড ব্রাদার্স গ্রুপ, রূপসী গ্রুপ, তাইপেই বাংলা ফেব্রিকস, ফেয়ার ট্রেড ফেব্রিকস, লীনা গ্রুপ, শরীফ জুট, সুপ্রিম জুট অ্যান্ড নিটেক্সের মতো অখ্যাত ২০ কোম্পানি সোনালী ব্যাংকের ৫ হাজার ৮০ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হয়ে আছে। চলতি বছরে মে মাস পর্যন্ত এসব খেলাপি ঋণের ৫০ শতাংশ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ব্যাংকটির। তবে ৫ শতাংশও আদায় হয়নি।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে রয়েছে মেসার্স টিঅ্যান্ড ব্রাদার্স গ্রুপ। এ ব্যবসায়ী গ্রুপটির পরিচিতি না থাকলেও সোনালী ব্যাংকে কোম্পানিটির শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ৪৯০ কোটি ২৬ লাখ টাকা। চলতি বছরের মে মাসের মধ্যে এ গ্রুপটির কাছ থেকে ২৪৫ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও কোনো টাকা পায়নি সোনালী ব্যাংক।
ময়মনসিংহের ভালুকায় অবস্থিত তাইপেই বাংলা ফেব্রিকস লিমিটেড মূলত একটি শতভাগ রপ্তানিমুখী ডায়িং ও ওয়াশিং শিল্প। কোম্পানিটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসে তাইপেই বাংলা ফেব্রিকস। কোম্পানিটির উৎপাদিত পণ্য বিশে^র বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। তবে সাত বছর ধরে উৎপাদনে থাকলেও তুলনামূলক অখ্যাত এই কোম্পানিটিও সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করছে না। যদিও কোম্পানিটির উৎপাদন চালু রয়েছে। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের কাছে কোম্পানিটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪৭ কোটি। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত কোম্পানিটির কাছ থেকে ১৭৪ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও কোনো টাকা আদায় করতে পারেনি সোনালী ব্যাংক।
যোগাযোগ করা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। ডিএমডির মোবাইল চালু থাকলেও কল রিসিভ করেনি।
মেসার্স ফেয়ার ট্রেড ফেব্রিকস লিমিটেড রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্প। এ কোম্পানিটি সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত দেয়নি। বর্তমানে ব্যাংকটিতে ফেয়ার ট্রেড ফেব্রিকসের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩১৫ কোটি। চলতি বছরের মে মাসে ১৫৭ কোটি টাকা উদ্ধারের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও কোনো টাকা আদায় করতে পারেনি ব্যাংক।
তৈরি পোশাকশিল্প, রিয়েল এস্টেট ছাড়াও রেস্টুরেন্ট ব্যবসা রয়েছে বলে ওয়েবসাইটে দাবি করেছে তথাকথিত রহমান গ্রুপ। এ গ্রুপের অধীনে থাকা কোম্পানিগুলো হচ্ছে রাহটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, রহমান ওভারসিজ, লবস্টার রেস্টুরেন্ট, রাহটেক ডেভেলপার্স, যার সবগুলোই অখ্যাত। নামসর্বস্ব এ গ্রুপটির কাছে সোনালী ব্যাংকের ঋণের ৩১৪ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে পড়েছে, যা আদায় হচ্ছে না।
অস্তিত্বহীন মেসার্স লীনা গ্রুপের কাছে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ২১৫ কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংকে তৈরি পোশাক কোম্পানি বিশ্বাস গার্মেন্টস ১৫৫ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হয়ে আছে। দেশের পুঁজিবাজারে দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানি অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, এপেক্স উউভিং অ্যান্ড ফিনিশিং ও মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক লিমিটেডেরও বিপুল পরিমাণের খেলাপি ঋণ রয়েছে ব্যাংকটির কাছে। এর মধ্যে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রি ৩০০ কোটি, এপেক্স উইভিং ১৫৬ কোটি এবং মেঘনা কনডেন্সড মিল্কের ১৩০ কোটি টাকারও বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে।
সোনালী ব্যাংকে শীর্ষ খেলাপির দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বিতর্কিত মেসার্স হল-মার্ক গ্রুপ। যার খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪৮২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত আদায় হয়েছে মাত্র ২৩ লাখ টাকা। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আদায় হওয়ার কথা ছিল ২৪১ কোটি টাকা। তার পরের অবস্থানে রয়েছে রূপসী গ্রুপ। কোম্পানিটির কাছে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪৬৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের যার একটি টাকাও আদায় করতে পারেনি সোনালী ব্যাংক। এ ছাড়া মডার্ন স্টিল মিল লিমিটেডের খেলাপি ৪৪৭ কোটি টাকা। এসব কোম্পানি থেকে চলতি বছরে কোনো টাকা আদায় করতে পারেনি ব্যাংকটি।
২০২৩ সাল শেষে ১ লাখ ৫০ হাজার ৭৩২ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ করেছে সোনালী ব্যাংক। এর মধ্যে এক লাখ ৮০৯ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়।
ব্যাংকটির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করে সোনালী ব্যাংক। কিন্তু ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়, ঋণের বিপরীতে প্রভিশন এবং কর পরিশোধের পর ব্যাংকটির লোকসানে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপির দিক থেকে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে সোনালী ব্যাংক। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা বা ১৪ শতাংশ বেড়ে ১৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা মোট ঋণের ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জা মো. আজিজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, খেলাপি ঋণ নিয়ে আগেও অনেক কথাবার্তা হয়েছে। ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে যেসব আইন আছে, তা যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। ব্যাংকগুলো যে পরিমাণের খেলাপি দেখায়, বাস্তবে তা অনেক বেশি। খেলাপিরা বারবার ঋণ পরিশোধের সময় পান, পুনঃতফসিলের সুযোগ পান। মামলা করে ঝুলিয়ে রাখেন। বেশি সমস্যা হলে হাইকোর্টে গিয়ে রিট করেন। এভাবেই বছরের পর বছর ঋণ পরিশোধ না করে পার পেয়ে যাচ্ছে তারা। এসব দীর্ঘসূত্রতার কারণে খেলাপি হওয়া আমাদের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে, যে কারণে মন্দ ঋণ বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে যদি আইন সংশোধনের প্রয়োজন হয় সংশোধন করার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।