‘গত পাঁচ দিনে রান্না করা খাবার খাইছি হুদা (শুধু) দুই বেলা। মনে অয় (হয়) কত দিন ধরে ভাত খাই ন (খাইনি)। বন্যার পানিতে সব কাইরা নিছে। কোনো রকমে বাইচা আছি পোলা-মাইয়া (ছেলেমেয়ে) লইয়া। সরকারের তন (থেকে) কোনো সাহায্য হাইনো (পাইনি) গত পাঁচ দিনেও। মেম্বর-চেয়ারম্যানরাও আংগো (আমাদের) খবর লইনো (খোঁজ নেয়নি)। আংগো এলাকায় গরিব বেশি, তাই কষ্টে কাডে (কাটে) দিন।’ গতকাল সোমবার ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দিঘলী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের রমাপুর গ্রামের বাসিন্দা বন্যাদুর্গত মো. রুবেল মিয়া। বন্যার পানিতে বাড়ি ডুবে যাওয়ায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে স্থানীয় রমাপুর এইউএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন পেশায় দিনমজুর ভূমিহীন রুবেল।
রুবেল বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাতে হঠাৎ পানি উডে (্ওঠে) ঘরে। কোনো রকম বউ-পোলা-মাইয়া (স্ত্রী ও দুই ছেলে) লইয়া বৃষ্টিত ভিজি পাশের স্কুলে আশ্রয় লই। এরপর থেইকা চেড়া (চিঁড়া)-মুড়ি আবার খালি হেডে (খালি পেটে) কোনো রকমে বাইচা আছি।’
শুধু রুবেল মিয়াই নন, প্রবল বর্ষণ আর উজানে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বন্যার কবলে পড়া দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ১২ জেলার ঘরে ঘরে ও আশ্রয়কেন্দ্রে এখন এমন হাহাকার। পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধহারে-অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে হাজার হাজার বন্যাদুর্গত পরিবারকে। শুধু নিজেদের খাবারই নয়, গবাদিপশুর খাবার এবং গবাদিপশু রাখার জায়গা নিয়েও তারা পড়েছে সংকটে। খাদ্যহীন গৃহহীন এসব মানুষ রাত পোহালেই ত্রাণের আশায় পথ চেয়ে থাকে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছালেও যোগাযোগব্যবস্থার দুর্গমতার কারণে এখনো ত্রাণ পৌঁছায়নি বহু এলাকায়।
লক্ষ্মীপুরের রুবেল মিয়া জানান, মাঠে কোনো জমি নাই তার। দোচালা একটি মাটির ঘর ছিল। বন্যার পানির তোড়ে সেটিও ধসে পড়েছে। দিনমজুরের কাজ করে দিনে যা পেতেন তা দিয়ে কোনো রকমে চলত সংসার। এখন কাজও নেই, রুজিও নেই, পুরোপুরি বেকার। রুবেলের স্ত্রী ময়না বেগম বলেন, তারা যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন তার পাশের মান্দারী-দাসের হাট সিঅ্যান্ডবি সড়ক তিন-চার ফুট পানির নিচে। ত্রাণসামগ্রী যারা দিচ্ছেন, কেউ আসছে না তাদের কাছে। নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামতের জন্য সরকারি সাহায্য কামনা করেন তিনি।
রমাপুর এইউএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া আরও অনেকে হতাশা প্রকাশ করে জানান, পাশের চরশাহী, মান্দারী ও কুশাখালী ইউনিয়নে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন এবং স্বেচ্ছাসেবীরা ত্রাণ বিতরণ করলেও কেউ রমাপুর আশ্রয়কেন্দ্রে এগিয়ে আসেনি। সেখানে ৩০টি পরিবারের শতাধিক শিশু, নারী ও পুরুষ আশ্রয় নিয়েছে।
মানুষে দিলে খাই, না দিলে পেট মাটি দিয়ে পড়ে থাকি : ‘স্যার গো আমার নামটা তালিকায় দিয়েন, অংকুরকালে (শিশুকালে) স্বামী হারাইছি, তিন ছেলে ও দুই মেয়ে সংসার করে (বিয়ের পর) চলে গেছে। আমি একা থাকি, মানুষে দিলে খাই, না দিলে পেট মাটি দিয়ে পড়ে থাকি।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন কুমিল্লার তিতাস উপজেলার দাসকান্দি (নদীর পূর্ব পাড়) গ্রামের বন্যাদুর্গত ষাটোর্ধ্ব রেজিয়া বেগম। শুধু রেজিয়া বেগম নন, গ্রামটির আরও অনেকেই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সর্বস্বান্ত।
সরেজমিনে দেখা যায়, কুমিল্লার গোমতী নদীতীরবর্তী তিতাস উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। উপজেলার ভিটিকান্দি, কলাকান্দি ও নারান্দিয়া ইউনিয়নে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। বন্যার পানি যত কমছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। স্রোতে ভেঙে গেছে বিভিন্ন গ্রামে রাস্তা ও সড়ক। অনেক সড়ক এখনো পানির নিচে। কিছু বাড়িঘরেও পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে অনেক মানুষ।
ভিটিকান্দি ইউনিয়নের পোড়াকান্দি গ্রামের পঞ্চার্ধ্ব জুলেখা বেগম বলেন, ‘স্বামী মারা গেছেন তিন বছর। ছেলেমেয়েরা এত পানি দেখেনি কখনো, বাড়িঘরে এখনো বন্যার পানি থইথই। পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছি। তিন দিন ভাত চোখে দেখিনি। মানুষের দেওয়া চিঁড়া, মুড়ি, বিস্কুট খেয়ে বেঁচে আছি।’
ভিটিকান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাবুল আহম্মেদ বলেন, ‘বন্যায় আমার ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি বরাদ্দের ১০ কেজি করে দুই টন চাল বিতরণ করেছি; যা ক্ষতির তুলনায় অনেক কম।’
থানচিতে বাঁশকোড়ল খেয়ে জীবন পার ৬৪ পরিবারের : বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম এলাকা, বিশেষ করে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী পাড়াগুলোয় দেখা দিয়েছে খাদ্যাভাব। এর মধ্যে রয়েছে মেনহাকপাড়া, বুলুপাড়া, তাংখোয়াইপাড়া ও য়ংডংপাড়া। এই জনপদগুলোয় ম্রো জনগোষ্ঠীর ৬৪টি পরিবারের বসবাস। তাদের সবাই জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল। সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলো সমতল হওয়ায় জুম চাষ করে তারা। কিন্তু গত বছরের বন্যায় সব ফসল তলিয়ে যায়। তখনই দেখা দেয় ঘরে ঘরে খাদ্যাভাব। এখন আবার নতুন করে ভারী বৃষ্টিতে চরম বিপাকে পড়েছে পরিবারগুলো। এ পাহাড়-ও পাহাড় ঘুরে বাঁশকোড়ল খুঁজে তা সেদ্ধ করে খেয়ে কোনোরকমে বেঁচে আছে তারা।
বুলুপাড়ার বাসিন্দা লিও ম্রো বলেন, ‘তিন মাস ধরে ঘর চাল নেই। আমরা জঙ্গল থেকে বাঁশকোড়ল তুলে সেদ্ধ করে খাই। বন্যায় জুমের ধান নষ্ট হয়ে গেছে। জুম থেকে ধান তুলতে পারিনি। ঘরের চালও শেষ হয়ে গেছে।’
আদাপাড়ার বাসিন্দা ঙৈলিং ম্রো জানান, অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটলেও তারা সরকার থেকে কোনো সহায়তা পাননি।
জানা গেছে, সীমান্তবর্তী পাড়াগুলোয় যাওয়ার মাধ্যম নদীপথ। তবে বান্দরবান জেলায় কয়েক দিন ধরে ভারী বৃষ্টি হওয়ায় সাঙ্গু নদীর পানি বেড়েছে। এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমে নদীপথে পণ্য আনা-নেওয়ার খরচও বেশি। দুর্গমতার কারণে থানচি সদর থেকে চাল নিয়ে যেতে পারছে না তারা।
থানচি উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান খামলাই ম্রো বলেন, ‘মিয়ানমার সীমান্তবর্তী চারটি পাড়ায় ৫০-৬৪টি পরিবার বাস করে। তাদের অবস্থা খুবই করুণ। বাঁশকোড়ল খেয়ে জীবন ধারণ করছে তারা।’
প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি এম জে আলম, কুমিল্লার দাউদকান্দি প্রতিনিধি জাকির হোসেন হাজারী এবং বান্দরবান প্রতিনিধি সৈকত দাশ।