বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে একদিনে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার ১৩ পুলিশ সদস্যকে নৃশংস ভাবে পিটিয়ে হত্যা ও থানা ভবনে হামলা ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ ৬ হাজার ব্যক্তিকে আসামী করে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গত ২৫ আগস্ট রাতে এনায়েতপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল মালেক বাদী হয়ে এ ঘটনার ২২ দিন পর এ মামলা দায়ের করেছেন। এনায়েতপুর থানা ভবনে হামলা ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় চার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ আগস্ট) সকালে সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মন্ডল এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মামলার বাদী এনায়েতপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল মালেক এ মামলায় চারজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ছয় হাজার জনের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেছেন।
সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মন্ডল আরও জানান, এনায়েতপুর থানায় হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগসহ ১৩ পুলিশকে হত্যা মামলায় এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আহমদ মোস্তফা খান বাচ্চু, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী, শাহজাদপুর উপজেলার খুকনী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও খুকনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মুল্লুক চাঁন, বেলকুচি উপজেলার ভাঙ্গবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম ভূঁইয়ার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া আরও অজ্ঞাত পাঁচ থেকে ছয় হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ মামলার আসামীদের দ্রুত গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রাত-দিন কাজ করছেন।
মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করা এক আসামিকে এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আহমদ মোস্তফা খান বাচ্চু ছেড়ে দিতে তৎকালীন ওসিকে চাপ প্রয়োগ করেন। তিনি তার ওই অবৈধ দাবি মেনে না নেওয়ায় পুলিশের ওপর তার ক্ষোভ ছিল। পরে ওই আসামির বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া হলে তিনি পুলিশের উপর আরও ক্ষুব্ধ হন। তারপরে বাচ্চুর নেতৃত্বে ৪৫০ থেকে ৫০০ জন অজ্ঞাত দুষ্কৃতিকারী এনায়েতপুর থানা ঘেরাও করে। তৎকালীন ওসি আব্দুর রাজ্জাকের অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ করেছিলেন। পরে আসামিরা এনায়েতপুর থানা পুলিশের ক্ষতি করার সুযোগ খুঁজতে থাকে। গত ৪ আগস্ট দুপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা এনায়েতপুর থানার সামনে বিক্ষোভ করে। এ সময় ওসি আব্দুর রাজ্জাক হ্যান্ড মাইক দিয়ে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন।
ওসি রাজ্জাক বলেন, এই থানা সাধারণ জনগণের। আপনারা থানার কোনো ক্ষয়ক্ষতি করবেন না। এ কথায় ছাত্র-জনতারা চলে যায়। পরে ১ নাম্বার আসামি আহমদ মোস্তফা খাঁন বাচ্চুর নেতৃত্বে এজাহার নামীয় আসামিসহ পাঁচ থেকে ছয় হাজার দুষ্কৃতিকারী দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে থানায় হামলা চালায়। আত্মরক্ষায় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। আসামিরা পুলিশের কোয়ার্টার ও ওসির বাসভবনে আগুন লাগিয়ে দেয়। আগুন দেখে পুলিশ সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আসামিরা থানা কম্পাউন্ডে উপ-পরিদর্শক (এসআই) তহছেনুজ্জামান, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) ওবায়দুর রহমান, কনস্টেবল আরিফুল আজম, রবিউল আলম শাহ, হাফিজুল ইসলাম, শাহিন, রিয়াজুল ইসলামকে পিটিয়ে ও ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। এক পর্যায়ে আসামিরা থানা ভবন ধ্বংস ও জীবিত পুলিশ সদস্যদের হত্যার উদ্দেশ্যে ভেতরে ঢুকে যায়। পুলিশের ও জনসাধারণের জমা দেওয়া বেসরকারি অস্ত্র ও গুলি লুট করে। পরে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে থানার ভেতর ও বাইরে থাকা অফিসার ও ফোর্সকে এলোপাথাড়ি গুলি করে। এ সময় থানার ওসি আব্দুর রাজ্জাক, এসআই আনিছুর রহমান, এসআই রহিজ উদ্দিন খান, এসআই প্রণবেশ কুমার বিশ্বাস, কনস্টেবল আব্দুল সালেক, কনস্টেবল হানিফ আলী থানার পাশে বাবু মিয়ার বাড়িতে আশ্রয় নেন। আসামিরা তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে সেখানে গিয়ে তাদের পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে। এ সয়ম নারী কনস্টেবল রেহেনা পারভীনকে মারধর করে টানা হেচড়া করে শ্লীলতাহানি করে। পরবর্তীতে বিকেলে সেনাবাহিনীর একটি দল থানা এলাকায় পৌঁছে নিহত পুলিশ সদস্যদের মরদেহ উদ্ধার করে হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
আসামিরা পাঁচটি পিস্তল ও আটটি ম্যাগাজিন, একটি চায়না পিস্তল ও দুইটি ম্যাগজিন, চারটি চায়না রাইফেলসহ বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করে নিয়ে যায়।
এ ছাড়া আসামিরা একটি ডাবল কেবিন ও একটি সিঙ্গেল কেবিন পিকআপ ভ্যান, পুলিশ সদস্যদের ১৫টি মোটরসাইকেল ও একটি ট্রাক, বিভিন্ন সময় আটক করা নতুন ও পুরাতন ১২টি মোটরসাইকেল ও থানার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি, আসবাবপত্র, কম্পিউটার, ওয়াকিটকি পুড়িয়ে দেয়। এতে এনায়েতপুর থানার চার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।