ব্যাংক লুটের মহোৎসবে পরিচালকদের নাম বরাবরই এসেছে, তবে তা অনেকটা আড়ালে চাপা পড়েছিল। এস আলমের পরিকল্পিত ব্যাংক লুটের পর এখন অন্য ব্যাংক পরিচালকদের আমানতের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। জনগণের গচ্ছিত আমানত গনিমতের মালের মতো ভাগবাটোয়ারা করে নিয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালকরা ঋণের নামে ২ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছেন, যা ব্যাংক খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১৫ শতাংশ। বারবার ঋণ পুনঃতফসিল কিংবা পুনর্গঠনের নামে এসব টাকা ফেরত দিচ্ছেন না তারা।
যাদের ব্যাংক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, তারাই খেয়ানত করছেন জনগণের আমানত। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা ঋণ হিসেবে বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো, যার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণই ব্যাংক মালিক ও পরিচালকরা যোগসাজশের মাধ্যমে নিয়ে গেছেন। কিন্তু যখন ঋণ পরিশোধের সময় হয়, তখন নানা ছলচাতুরীর আশ্রয় নেন। এত দিন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকও এসব অনিয়মে সহযোগিতা করেছে। ফলে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। আবার প্রকৃত খেলাপি ঋণও দেখানো যাচ্ছে না আদালতের স্থগিতাদেশ ও ঋণ অবলোপনের কারণে। সব মিলিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ চার লাখ কোটি টাকারও বেশি বলে ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার মনে হয় এটা বেশিরভাগই একটা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলোয় হয়েছে। এটাকে একটা ব্যাংকিংয়ের অপশাসনের সূচক হিসেবে দেখা যায়। এত বড় একটা অ্যামাউন্ট, এখন প্রশ্ন হলো এত বড় অপশাসন সম্ভব হলো কীভাবে। যাদের এই জিনিসটা দেখার কথা, তারা কী করছে। আমানতকারীদের আমানত রক্ষা করা অভিভাবকের দায়িত্ব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও আর্থিক খাতে অনিয়মের ঘটনা ঘটে। কিন্তু সেসব দেশে আইনের আওতায় আনা হয়, ধরা হয়, বিচার হয়, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এই ধরনের ঘটনার বিচারের নজির নেই। যে আইন আছে, সেটার সঠিক প্রয়োগ না হওয়ার কারণে লুটপাট বেশি হচ্ছে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংক খাতে পরিচালকদের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে নিজ ব্যাংক থেকে পরিচালকদের নেওয়া ঋণ প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। বাকিগুলো অন্যান্য ব্যাংক থেকে তারা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। এসব ঋণে খেলাপির পরিমাণ জানা যায়নি। তবে এক বছর আগে পরিচালকদের ঋণের খেলাপির পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৫৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি, যা মোট ঋণের ১১ দশমিক ১ শতাংশ।
অবশ্য পরিচালকদের নিজ ব্যাংকের ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঋণ নিয়েছেন তারা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের পরিচালকদের নিজ নিজ পরিশোধিত মূলধনের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে। অর্থাৎ কোনো পরিচালক তার মোট শেয়ারের ৫০ শতাংশের বেশি ঋণ নিজ ব্যাংক থেকে নিতে পারবেন না। এতে করে অনেক ব্যাংক পরিচালকের শেয়ারের পরিমাণ কম হওয়ায় তারা নিজ ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিতে পারেন না। এরপর থেকেই পরিচালকরা নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কমিয়ে দেন। তখন এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া শুরু করেন। এতে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের ঋণ পেতে বেগ পেতে হয়।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের প্রায় সব ব্যাংক পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও আটটি ব্যাংকের পরিচালকরা বেশি নিয়েছেন। বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকরা পারস্পরিক যোগসাজশে নিজেরা প্রচুর পরিমাণে ঋণ নিয়েছেন। কিছু ব্যাংক আরও একধাপ এগিয়ে। এসব ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা পরিচালকদের আত্মীয়দের হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। ব্যাংকগুলো হলো ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক।
তবে সালমান এফ রহমান, কিংবা এস আলমের মতো প্রভাবশালী ব্যাংক মালিকরা বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি সরকারি ব্যাংকগুলো থেকেও বিপুল পরিমাণের ঋণ নিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক দুই গভর্নর ফজলে কবীর ও আব্দুর রউফ তালুকদার প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করেছেন। সরকারি ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান, পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকরাও অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে প্রভাবশালী ব্যাংক মালিকদের বেআইনি সুবিধা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৩ সালের শেষের দিকে ৮টি ব্যাংকের পরিচালকরা অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছেন, বিপরীতে তারা সেসব ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। এর বাইরে চারটি ব্যাংক পরিচালকদের আত্মীয়দের প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। অর্থাৎ এই পরিচালক ও তাদের আত্মীয়রা ব্যাংকগুলো থেকে পারস্পরিক যোগসাজশে ঋণ নিয়েছেন ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এসব ঋণের অধিকাংশই গত পাঁচ বছরে দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন নিয়মে ব্যাংক পরিচালকরা নিজেদের ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন না। এই বাধা পাশ কাটাতে তারা নামে-বেনামে যোগসাজশের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। ঋণের অর্থ কোথায় ব্যবহার হচ্ছে, এরও কোনো হদিস নেই। এভাবে অনৈতিকভাবে ঋণ নেওয়া সুশাসনের জন্য বড় অন্তরায়, যা আমানতকারীদের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর পদক্ষেপ না নিলে পরিচালকরা আগামী দিনে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবেন, যা ব্যাংক খাতের জন্য অশনিসংকেত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যাংক পরিচালক অন্য কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ওই খেলাপি পরিচালককে নোটিস দেবে। নোটিস দেওয়ার দুই মাসের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করলে খেলাপি ব্যক্তি তার ব্যাংকে পরিচালকের পদ হারাবেন। তবে পরিচালকদের ঋণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্পর্ক, যোগসাজশ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে কোনো ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী হয় না অধিকাংশ ব্যাংক। আবার কোনো কোনো ব্যাংক আগ্রহ দেখালেও সংশ্লিষ্ট পরিচালক আদালতে যান। অন্যদিকে বেশিরভাগই প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাইনুদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেটা নিয়ম আছে, একজন পরিচালক তার মূলধনের ৫০ শতাংশের বেশি ঋণ নিতে পারবেন না। এটা স্পষ্ট ঋণগুলো নিয়ম লঙ্ঘন করে দেওয়া হয়েছে। এর দায়-দায়িত্ব বোর্ডের। বোর্ড অনিয়ম করে তাদের যে লোন পাওয়ার কথা ছিল, তার থেকে বেশি লোন দিয়েছে। এ ছাড়া এক ব্যাংকের পরিচালক আরেকজনের সঙ্গে যোগসাজশ করে যে ঋণ নেন, এটা গ্রস ভায়োলেশন। এখন নতুন সরকারের উচিত হবে এসব বিষয় খুব কঠোরভাবে দেখা। তাহলে এই অংশটা কমে আসবে। আর না হলে এ ধরনের অনিয়ম চলতেই থাকবে।