দেশের পূর্বাঞ্চলের ফেনী জেলায় প্রায় প্রতি বছর কম-বেশি বন্যা হয়ে থাকে। কিন্তু এবারের মতো বন্যার এমন আগ্রাসী রূপ কয়েক দশকে দেখেনি এই অঞ্চলের মানুষ। শুধু ফেনী নয়, একই সময়ে কুমিল্লা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে সৃষ্ট বন্যার তীব্রতা অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় ভয়াবহ।
ওই অঞ্চলের এই বন্যাকে আকস্মিক বন্যা হিসেবে চিহ্নিত করে বেশ কয়েকটি কারণ জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ের এ বন্যার অন্যতম কারণ উজানের ঢল, অতি বৃষ্টিপাত, সমুদ্রে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উচ্চতার জোয়ার ও পানিনিষ্কাশনের পথে প্রতিবন্ধকতা। তবে বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার মূল কারণ ছিল পানিনিষ্কাশন পথে প্রতিবন্ধকতা। নদী-খাল ও জলাধারগুলো দখলমুক্ত করতে না পারলে আগামী দিনে এর চেয়ে ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টি শুরু হয় ১৬ আগস্ট থেকে। আর ১৮ আগস্টে সাগরে সৃষ্টি হওয়া লঘুচাপ স্থলভাগে প্রবেশ করে। এরপর টানা প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটায়। একই সময় ভারতের ত্রিপুরায় গোমতী নদীর ওপর ডুম্বুর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধের গেট খুলে ঢল নামে। উজানের এই ঢল ও প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের সাতটি অভিন্ন নদীর ১৪ পয়েন্টে বিপদসীমার ওপরে প্রবাহিত হয়েছে। গোমতীসহ ভেঙেছে বহু বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, খাগড়াছড়ি, হবিগঞ্জ, চাঁদপুর, কক্সবাজার, সিলেট, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্যায় তলিয়ে গেছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, চলমান বন্যায় এখন পর্যন্ত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১১ জেলায় ১২ লাখ ২৭ হাজার ৫৫৪টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত লোকসংখ্যা ৫৮ লাখ ২২ হাজার ৭৩৪।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানান, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আগস্ট মাসে বৃষ্টি একই সময়ের আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এ মাসে বৃষ্টি হওয়ার কথা ৯৯৮ মিলিমিটার। কিন্তু কয়েক দিনে বৃষ্টি হয়েছে ১ হাজার ৪৩৪ মিলিমিটার। অন্যদিকে উজানের ভারত থেকে পানি ভাটির দিকে নেমেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি মুহুরী নদীতে বিপদসীমার প্রায় ৪ মিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। গোমতী নদীতেও ২ মিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে, যা প্রবল বন্যার কারণ।’ উদয় রায়হান বলেন, একদিকে জোয়ারের পানি, অন্যদিকে নদীগুলো নাব্য হারিয়েছে। ফলে বন্যার পানি সরে যেতে বেশি সময় লাগছে। তাই বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই আকস্মিক বন্যা বাড়ছে : দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে বছরজুড়ে কোনো না কোনো দুর্যোগ লেগেই থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যার প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে বন্যা বেড়ে যাওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যেমন রয়েছে। বিশ্বের তাপমাত্রা ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ার কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় বৃষ্টিপাতের ধরনে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ফলে এ অঞ্চলে অতিরিক্ত গরমের পাশাপাশি ভারী বৃষ্টি এবং ঝড়ের প্রকোপ অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকবে।
গত বছর গ্রান্থাম রিসার্চ ইনস্টিটিউট অন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড দ্য এনভায়রনমেন্ট এবং সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ ইকোনমিকস প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বন্যা পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও খারাপ হবে। দেশটির জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি বন্যার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে গুরুতর মানবিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সংকটের আশঙ্কা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
আবহাওয়া, জলবায়ু ও সমুদ্রবিজ্ঞানী ড. মোহন কুমার দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা দেখছি সার্বিকভাবে পুরো জুলাইয়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম। যেটা স্বাভাবিক, যে ধারাবাহিকতায় থাকার কথা ছিল, সেটা হয়নি। আগস্ট মাসে যে বৃষ্টিটা হওয়ার কথা, সেটা কিন্তু এবার দু-তিন দিনের মধ্যে হয়েছে।’
তিনি বলেন, ১৮ থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত ফেনী ও পরশুরাম, কুমিল্লা, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বাগফা, বিলোনিয়া, অমরপুর স্টেশনের বৃষ্টির রেকর্ড ছিল দিনে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ মিলিমিটারের বেশি। এই বৃষ্টি ছিল বিরামহীন। কোথাও কোথাও একটানা ৬০ থেকে ৭২ ঘণ্টা বৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের একটা বিশাল অংশজুড়ে চলমান বৃষ্টি এ বন্যার অন্যতম কারণ।
বন্যার উচ্চ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ আকস্মিক বন্যার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে উল্লেখ করে ড. মোহন কুমার বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় আমরা রয়েছি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে পরিবেশ ধ্বংস করে অপরিকল্পিত অবকাঠামো হচ্ছে। গাছপালা কেটে ফেলা হচ্ছে, ভূমির ব্যবহার পরিবর্তন ও নদী-খাল ভরাট করা হচ্ছে। নদীর নাব্যতা কমে যাচ্ছে। যার প্রভাব পড়েছে আমাদের পরিবেশের ওপর। যখন পরিবেশের স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়, তখন অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা দেখা দেয়।’
বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়নকেন্দ্রের (ক্যাপস) পরিচালক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে পানির অন্যায্যতার মধ্যে রয়েছি যুগের পর যুগ ধরে। মওলানা ভাসানীর সময় থেকে এখন পর্যন্ত ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্যতা বাংলাদেশ বুঝে পায়নি। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পানি নিয়ে যে নীতি, সেটাতে আমরা সব সময় নতজানু অবস্থায় আছি। কারণ তারা একের পর এক বাঁধ তৈরি করে পানি নিয়ন্ত্রণ করে রাখছে। পানি আইন ১৯৯৭-এর বরখেলাপ করছে।’
তিনি বলেন, দেশে বন্যার জন্য পানির অব্যবস্থাপনা দায়ী। তা ছাড়া বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বেশি বৃষ্টি এবং হিমালয়ের বরফ গলা পানি এসবের কারণে ঘন ঘন এবং দীর্ঘস্থায়ী বন্যাগুলো হচ্ছে।
ড. কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘একদিকে যেমন উজানের পানি ব্যবস্থাপনা নেই, সেই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়েও পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থাও কমে এসেছে। যুগের পর যুগ ধরে আমাদের নদী-খালগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। আমাদের নদী কমিশন ৪৭ হাজার দখলদারের তালিকা তৈরি করেছে। নদী ও খালগুলো উদ্ধার করে নদীকে তার পথ ফিরিয়ে দিতে হবে।’
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘প্রতিটি উপজেলায় যেসব খাল, জলাধার দখল হয়ে গেছে, সেগুলোও উদ্ধারের কাজে হাত দিতে হবে। ভবিষ্যতেও উজানের পানি বা অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা হতে পারে। আমরা যদি এই সংকটগুলো চিহ্নিত না করতে পারি, তবে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি ভবিষ্যতেও তৈরি হতে পারে।’