বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমরা তো এক-এগারোর কথা ভুলে যাইনি। এক-এগারোর সময় কারা চেষ্টা করেছিল বিরাজনীতিকীকরণের। এমনকি ওই সময়ে আমাদের দলকে পুরোপুরি বাতিল, নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হয়েছিল। এ কথাগুলো তো আমরা ভুলতে পারি না। এটা আমার গণতন্ত্রের জন্য, আমার রাজনীতির জন্য, আমার দেশের কল্যাণের জন্য এ কথাগুলো আমার মনে রাখতে হবে। আবার ওই চেহারাগুলোই যদি সামনে দেখি, তখন তো যথেষ্ট সন্দেহের উদ্রেক হয়, প্রশ্ন এসে যায়।’ গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আয়োজিত দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ফখরুল এসব কথা জানান। গত মঙ্গলবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দ্রুত সংলাপে বসা উচিত বলে মনে করেন বিএনপি মহাসচিব। একই সঙ্গে তিনি নেতাকর্মীদের ঢালাওভাবে মামলা না করার আহ্বান জানান। দেশের পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কারণে ১ সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান সীমিত করে ত্রাণ কার্যক্রম জোরালো করার কথাও জানিয়েছেন বিএনপির এই নেতা।
অন্তর্বর্তী সরকারকে রাষ্ট্র মেরামতের জন্য ‘যৌক্তিক’ সময়ের কোনো ধারণা আছে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এ জন্যই আলোচনা দরকার। যৌক্তিক সময়ের ধারণা নির্ভর করবে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে। আমরা কী চাই, ওনারা (অন্তর্বর্তী সরকার) কী চান, জনগণ কী চায়, একটা আলাপ-আলোচনা তো হতে হবে। সে জন্য বলেছি, বর্তমান সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর অতিদ্রুত আলোচনা হওয়া দরকার। খুব জোর দিয়ে বলেছি, আজকেও বলছি। নইলে ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হয়।’
বর্তমান সরকারের মধ্যেও বিরাজনীতিকীকরণের কোনো লক্ষণ দেখছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, আমি এমন লক্ষণ দেখছি না। আমি সতর্ক করছি। আমার একটা সতর্কের কথা আছে। কিছু চেহারা আছে তো? এ চেহারাগুলোকে দেখলে আমরা ভয় পাই। তবে যাদের কোনো দিন দেখা যায়নি। হঠাৎ করে মিডিয়ায় ফ্রন্ট পেজে এসে তাদের বক্তব্য, থিওরি প্রচার করছেন। আমি কারও নাম বলতে চাই না। এটা সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য ভালো বিষয় নয়।’
বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘আমরা তো এক-এগারোর কথা ভুলে যাইনি। সে সময় বিরাজনীতিকীকরণের প্রচেষ্টা হয়েছিল। যাদের জনসমর্থন নেই, জনগণ মনে করে না যে এরা সরকার চালাতে পারবে, তারা এ ধরনের বিভিন্ন চিন্তাভাবনা করে। আমি কোনো দলের নাম বলছি না। সবচেয়ে বড় জিনিস হচ্ছে, আমাদের লড়াইটা গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য। সেটার জন্যই তো নির্বাচন। এটা তো আমাদের রাইট। আমরা নির্বাচনের জন্যই এত দিন লড়াই, সংগ্রাম করেছি।’
জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পর এই দলগুলো মিলেই আমরা আন্দোলন করেছি। এই দলগুলোর অনেকে আন্দোলনে অনেক নির্যাতন ভোগ করছেন। এমনকি তাদের অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন এই আন্দোলনে তাদের বাদ দিয়ে আমি তো অন্য রাজনৈতিক চিন্তা এই মুহূর্তে করব না। হ্যাঁ, অন্তর্বর্তী সরকার এসেছে আন্দোলন-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। অবশ্যই এই সরকারকে যৌক্তিক সময় দিতে হবে। তার জন্য সব ধরনের সহযোগিতা আমরা করে যাচ্ছি, করব যত দিন আমরা মনে করি সরকার রাইট ট্র্যাকে থাকবে।’
সরকার জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার আদেশটি প্রত্যাহারের বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে না, সে যে দলই হোক। আমাদের সংবিধানে যেকোনো ব্যক্তির অধিকার রয়েছে সংগঠন করার। কিন্তু স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পক্ষে থাকতে হবে। মানুষের অধিকার আছে একটা সংগঠন তৈরি করার, রাজনীতি করার।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ঢালাওভাবে মামলা যাতে না হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলব, আপনারা প্রাথমিকভাবে তদন্ত করুন। এ বিষয়ে দলের নেতাকর্মীদেরও আহ্বান জানাব, এমন কোনো মামলা করবেন না, যাতে সারবস্তু থাকবে না।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘দেশে বন্যা পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএনপি। ভারতের বাঁধ খুলে দেওয়ায় এই বন্যা দুর্ভোগের সৃষ্টি করেছে। বিএনপি কেন্দ্রীয় ত্রাণ সেলও গঠন করে ১ কোটি টাকা নেতাকর্মীদের দিয়েছে ত্রাণ কিনে সহায়তা করতে।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সীমিতভাবে কর্মসূচি পালিত হবে। ১ সেপ্টেম্বর কেবল শেরেবাংলা নগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ, দলীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। এ ছাড়া একটি দোয়া ও মিলাদ মাহফিল হবে দেশের মানুষ ও ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হতাহতদের জন্য। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যাতে দ্রুত দেশে ফিরে আসতে পারেন সে জন্য। কোনো দুর্বৃত্তপনা বা অপরাধ বরদাশত করা হবে না জানিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে দল ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে বলেও জানান মির্জা ফখরুল।
সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।