নির্বাচন আয়োজনের সময় নিয়ে বড় দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। বিএনপি নির্বাচনের রোডম্যাপ চাইলেও জামায়াত এ নিয়ে তাড়াহুড়া করতে চায় না। জামায়াত নেতারা বলছেন, তারা চান অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার শুরু করুক এবং নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নিক। তারা অতিদ্রুত নির্বাচন চায় না। তবে দেরি হোক সেটাও তারা চায় না।
এমন প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কার কাজ শুরু করা, সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনসহ নানা বিষয়ে আলোচনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আজ শনিবার থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসবেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সংলাপে বসবে জানিয়ে দলটির নেতারা বলছেন, রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কার শুরু এবং নির্বাচন আয়োজনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তারা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলাপ করবেন। তবে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার দাবি তারা যেমন তুলবেন না, তেমনি নির্বাচন আয়োজনে সরকার দেরি করুক তাও চান না তারা।
এ বিষয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুল্লাহ মো. তাহের গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার বিগত ১৫ বছরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ করে ধ্বংস করে ফেলেছে। এ কারণে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এসব প্রতিষ্ঠান রক্ষায় প্রয়োজনীয় সংস্কার দাবি তোলা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী মনে করে অন্তর্বর্তী সরকার এসব সংস্কার কাজ শুরু করবে। পাশাপাশি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেবে। কারণ সব সংস্কার কাজ তো সরকার শেষ করতে পারবে না। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার কাজ শুরু করবে, আর নির্বাচিত সরকার তার পরিসমাপ্তি টানবে।’
গত ৮ আগস্ট অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তারা কী কী সংস্কার কাজ করবে এবং তা সম্পন্ন করতে কতদিন লাগবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে কোনো দিকনির্দেশনা দেয়নি। শুধু তাই নয়, এসব সংস্কার কাজ শেষ করে কবে নাগাদ নির্বাচন দেবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট করেনি সরকার। এমন পরিস্থিতিতে গত ২৪ আগস্ট থেকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচন প্রশ্নে অতি দ্রুত সংলাপের দাবি জানান। পাশাপাশি অন্তর্র্বর্তী সরকার যে সংস্কারের কথা বলছে, সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অল্প কিছু মানুষের সংস্কারে’ তিনি বিশ্বাস করেন না। এরপর জাতির উদ্দেশে ভাষণে ড. ইউনূস তার সরকারের যে কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেন, সেখানে নির্বাচন আয়োজন নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না। তাতে হতাশা প্রকাশ করে ফখরুল বলেছিলেন, তাদের প্রত্যাশা ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচন নিয়ে একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করবেন।
বিএনপির পক্ষ থেকে ভোট নিয়ে আলোচনার দাবি তোলার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ে বসার সিদ্ধান্ত নেন প্রধান উপদেষ্টা। আজ শনিবার বিকেল ৩টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই মতবিনিময় শুরু হবে বলে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে। রাত ৮টা পর্যন্ত টানা পাঁচ ঘণ্টা মতবিনিময়ের কথা রয়েছে প্রধান উপদেষ্টার দৈনন্দিন সূচিতে। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, ‘আমরা সব রাজনৈতিক দলকেই মতবিনিময়ে চাইছি। মতবিনিময়ে আগ্রহীরা সবাই আসবে।’
এর আগে গত বৃহস্পতিবার সংস্কার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করে অন্তর্র্বর্তী সরকার। উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের পর পরিবেশ ও বন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার প্রক্রিয়া চালু রাখব, তাদের কাছ থেকে সংস্কার প্রস্তাব যা আসবে সেগুলো গ্রহণ করব। সে ব্যাপারে একটা পদ্ধতির বিষয়ে কথা হয়েছে।’
বর্তমানে দেশে ৪৫টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রয়েছে। এর বাইরে আলোচিত জামায়াতে ইসলামীসহ অনেক দলই নিবন্ধনের বাইরে থেকেই রাজনীতির মাঠে সক্রিয় রয়েছে। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন দিন পর ৮ আগস্ট অন্তর্র্বর্তী সরকারের দায়িত্ব বুঝে নেয় মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন উপদেষ্টা পরিষদ। আওয়ামী লীগকে বাদ রেখে অন্যান্য দল ও সেনাবাহিনী আলোচনা করে এই সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়।
এদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল অতি দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচনের জন্য তোড়জোড় করছে; আমরা এই মুহূর্তে নির্বাচনকে প্রাধান্য দিচ্ছি না। জাতীয় ক্রাইসিস (সংকট) চলছে, রক্তের দাগ, ক্ষতবিক্ষত হওয়া শহীদ পরিবারগুলো, বিভিন্ন জেলা বন্যার কবলে পড়েছে। এটাকে আমরা এই মুহূর্তের রাজনীতি হিসেবে নিয়েছি। এটাকে কেউ যদি রাজনীতি বলে তাহলে রাজনীতি, আবার কেউ যদি বলে মানবিক দায়িত্ব তাহলে মানবিক দায়িত্ব। এ বিষয়গুলো সমাধান না করে নির্বাচনের কথা তোলা যৌক্তিক মনে করি না।’
নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে মতানৈক্যের বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনের সময় নিয়ে আমাদের মধ্যে মতানৈক্য হতে পারে। সেটার সমাধানও হতে পারে আলোচনার মাধ্যমে। তবে তার আগে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে যেসব সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল সেগুলো আগে শুরু করা দরকার। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর যত খুন, গুমের ঘটনা ঘটেছে তার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নিহত পরিবারগুলোকে সহায়তা, আহতদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা দরকার আমাদের।’
তিনি বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত ও আহত পরিবারগুলোর পাশে আমরা দাঁড়িয়েছি। পাশাপাশি বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে আমাদের অনেক নেতাকর্মী নিহত ও আহত হয়েছেন। তাদের পাশে আমরা দাঁড়াচ্ছি। সাংগঠনিক কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছি। এগুলো অব্যাহত রাখব আমরা।’
জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন তারা নির্যাতিত ছিলেন। আওয়ামী লীগ আমলে অনেক নেতাকর্মীকে হারিয়েছেন তারা। এ ছাড়া ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পিলখানায় হত্যাকান্ড চালায়। ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। এ ছাড়া মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সরকার গণহত্যা চালিয়েছিল। সর্বশেষ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং শাপলা চত্বরের হত্যাকান্ড নিয়ে গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে জামায়াতের নেতারা বৈঠক করেছেন। এ দুই ঘটনার ব্যাপারে জাতিসংঘের তদন্ত চেয়েছেন তারা।
গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুল্লাহ মো. তাহের সাংবাদিকদের বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগের বিচার করতে জাতিসংঘের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। ‘ক্রাইম অ্যাগেন্টস হিউম্যানিটি’ নামের একটি ট্রাইব্যুনাল করে সঠিকভাবে যেন বিচার করা যেতে পারে, সে বিষয়ে সহযোগিতা করতে জাতিসংঘকে অনুরোধ করেছেন তারা।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের উপদেষ্টার অনুরোধে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটসের একটি ফ্যাক্ট চেকিং টিম বাংলাদেশে সফর করছে। তারা বাংলাদেশে বেশ কয়েক দিন ধরে অবস্থান করছে। বিভিন্ন দলের সঙ্গে, গ্রুপের সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়েছে।’