ইসলামি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ছাড়াল ৫ লাখ কোটি

মানুষের সবচেয়ে বেশি আগ্রহের জায়গা শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত ইসলামি ব্যাংকগুলো। গত সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে লুটপাটের নজর ছিল ইসলামি ব্যাংকগুলোতে। তাই বেশ কয়েক বছর গ্রাহকদের আস্থাহীনতাও তৈরি হয়েছে এখানে। ইসলামি ব্যাংকগুলোর ব্যবসা দেখে কিছু প্রচলিত ধারার ব্যাংকও তাদের নীতি পরিবর্তন করে ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক পরিচালনা শুরু করে।

গত কয়েক বছরে ব্যাংকগুলোতে দেখা দেয় তারল্য সংকট। তবে ২০২৩ সালের শেষে ও চলতি বছরের শুরুতে ইসলামি ব্যাংকগুলোতে আমানতের পতন দেখা দিলেও বাড়তে শুরু করে মার্চ থেকে কিছুটা বাড়তে থাকে আমানত। গেল মে মাসে প্রায় সব সূচকেই ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান দেখা গেছে ইসলামি ব্যাংকগুলোতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরের মে মাসে ইসলামি ব্যাংক, শাখা ও উইন্ডোগুলোর আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২৮ হাজার ৮০২ কোটি টাকা, যা গত এপ্রিল মাসে ছিল ৪ লাখ ২৪ হাজার ৬০১ কোটি টাকা। সে হিসেবে আমান বেড়েছে ৪ হাজার ২০১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে ৩ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ইসলামি ব্যাংকিং শাখাগুলোতে আমানত বেড়েছে ৪২ কোটি, উইন্ডোগুলোতে বেড়েছে ৩৩০ কোটি টাকা।

শুধু আমানতই নয়, বেড়েছে বিনিয়োগও। গেল মে মাসে ইসলামি ব্যাংকিংয়ে বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪ হাজার ১১৩ কোটি টাকা। তার আগের মাসে বিনিয়োগ ছিল ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৯৮ কোটি টাকা। সে হিসেবে বিনিয়োগ বেড়েছে ৬ হাজার ১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বেড়েছে ৫ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ মে মাসে ইসলামি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা, যা এপ্রিলে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা ছিল। এ ছাড়া ইসলামি ব্যাংকিং শাখাগুলোতে বেড়েছে ১৪৩ কোটি, ইসলামি উইন্ডোতে বিনিয়োগ বেড়েছে ২৮৫ কোটি টাকা। তার আগের মাসে অর্থাৎ মার্চ থেকে এপ্রিলেও সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা বেশি বিনিয়োগ ছিল ইসলামি ব্যাংকিংয়ে।

বিভিন্ন খাতে এত বিনিয়োগ করেও টাকা ফেরত আনতে না পারায় ইসলামি ধারার সব ব্যাংকই এখন তারল্য সংকটে ধুঁকছে। বিগত সরকারের শেষদিকে প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণও নিতে হয়েছে বেশ কয়েকটি ব্যাংককে। ঠিক সময় ফেরত এলে এ টাকা ঋণ নিতে হতো না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইসলামি ব্যাংকিং চ্যানেলে বেড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সর্বশেষ মে মাসে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ১০ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা এপ্রিল মাসে ছিল ৮ হাজার ৯৮৬ কোটি। অর্থাৎ এক মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে এসেছে ১০ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। বাকি প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার মতো এসেছে ব্যাংকগুলোর ইসলামি ব্যাংকিং শাখা ও উইন্ডোগুলোতে।

এক মাসের ব্যবধানে ইসলামি ব্যাংকিংয়ে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৪৪১ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিলে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে রপ্তানি আয় এসেছিল ৭ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা, তার পরের মাসে অর্থাৎ মে মাসে এসেছে ৮ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে এসেছে ৭ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা, প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ইসলামি ব্যাংকিং শাখাগুলোতে এসেছে ৫৬২ কোটি, ইসলামি উইন্ডোগুলোতে এসেছে ১৭৯ কোটি টাকা।

শুধু রপ্তানি আয় নয়, বেড়েছে আমদানি পরিশোধও। মে মাসে ইসলামি ব্যাংকিংয়ে আমদানি পরিশোধ করেছে ১৩ হাজার ৬২২ কোটি টাকা, যা তার আগের মাসে ছিল ১৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে বেড়েছে ২৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমদানি পরিশোধ বেড়েছে ১২১ কোটি, প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ইসলামি ব্যাংকিং শাখাগুলোতে ৪৯৮ কোটি টাকা। তবে ২২৩ কোটি আমদানি পরিশোধ কমেছে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডোগুলোতে।

সম্প্রতি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংক খাত সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকার। বেসরকারি খাতের বৃহৎ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশসহ ব্যাংকখেকো এস আলমের দখলে

থাকা বেশ কয়েকটি ব্যাংক উদ্ধারের পরিকল্পনা গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরই মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। এই ব্যাংকে পাঁচজনকে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ করা হয়েছে। তাদের মধ্য থেকে নতুন পর্ষদের চেয়ারম্যান করা হয়েছে সোনালী ও রূপালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদকে। এছাড়াও পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও নজরুল ইসলাম মজুমদারের দখলে থাকা শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক এক্সিম ব্যাংকেরও। এর মধ্য দিয়ে ইসলামি ব্যাংকগুলো আরও শক্তিশালী হবে আশা সংশ্লিষ্টদের।