আগস্টের বন্যার প্রথম ধাক্কায় বাড়িঘর ডুবেছিল ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মতিগঞ্জের বাসিন্দা লায়লা আক্তারের। ঘরে পানি ঢুকে পড়ায় স্বামী-সন্তানসহ আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রতিবেশীর বাড়িতে। পানি নেমে যাওয়ায় এক সপ্তাহ পর আবার বাড়ি ফিরেছেন। বিধ্বস্ত ঘর ঠিকঠাক করার সময়টুকুও পাননি। এরই মধ্যে ১১ বছর বয়সী কন্যাসন্তান নুসরাত জাহানকে নিয়ে ছুটতে হয়েছে হাসপাতালে।
লায়লা আক্তার বলেন, ‘ঘরে পানি ঢুকে পড়ায় এক প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেখানে বিশুদ্ধ পানি না পেয়ে ট্যাংকে জমে থাকা পানি পান করেছে মেয়ে। এরপর থেকে বমি ও ডায়রিয়া শুরু হয়েছে। অবস্থা খারাপ দেখে হাসপাতালে ভর্তি করেছি। এখন আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতি হলেও বিপদ কাটেনি।’
জ্বর এবং ডায়রিয়া নিয়ে একই হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে দুই বছর বয়সী মোহাম্মদ হোসেন। গত বৃহস্পতিবার সকাল তাকে ভর্তি করা হয়। শিশুর মা কামরুন নাহার বলেন, ‘বন্যার সময় এক ফোঁটা বিশুদ্ধ খাবার পানি ছিল না। টিউবওয়েল পানিতে ডুবে ছিল। পানি না খাইয়ে তো আর বাচ্চাকে রাখা যাবে না। যতটুকু সম্ভব ছিল পানি ফুটিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করেছি। তবুও শেষরক্ষা হয়নি। এখন ছেলেটি জ্বর-ডায়রিয়ায় কষ্ট পাচ্ছে।’
নুসরাত ও মোহাম্মদ হোসেনের মতো পানিবাহিত নানা রোগ নিয়ে ২৫০ শয্যার ফেনী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে আরও অনেকে। গতকাল শনিবার হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা গেছে, ধারণক্ষমতার চেয়ে আটগুণ বেশি ডায়রিয়ার রোগী ভর্তি রয়েছে। রোগীদের কারও ঠাঁই হয়েছে বারান্দায়, এমনকি সিঁড়িতেও আছে কেউ কেউ। শয্যাসংকটের কারণে ওয়ার্ডগুলোতে পা ফেলার জায়গা নেই।
গতকাল পর্যন্ত এই হাসপাতালে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত মোট রোগী ছিল ২৯৭ জন। যার মধ্যে শিশু ১১৪ ও অন্যান্য রোগী ছিল ১৮৩ জন। এমনকি হাসপাতালটির নার্সরাও আক্রান্ত হয়েছেন ডায়রিয়ায়। হাসপাতালটিতে ডায়রিয়ারসহ মোট রোগী ছিল ৪৭০ জন। আর বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি মানুষ। তবে ভর্তি রোগীদের স্বজনদের অভিযোগ, তারা শুধু নির্দিষ্ট কয়েক ধরনের ওষুধ সরকারিভাবে পাচ্ছেন। বেশিরভাগ ওষুধ ফার্মেসি থেকে কিনতে হচ্ছে।
হাসপাতালটির আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা আসিফ ইকবাল বলেন, বন্যা-পরবর্তী ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। বাচ্চারা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। খাওয়ার পানি ও খাবার থেকে মূলত এটা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডায়রিয়া রোগীদের জন্য আলাদা করে মেঝেতে শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. অর্ণব মল্লিক বলেন, ‘ভর্তি থাকা রোগীদের মধ্যে ৮০ শতাংশ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত। আমরা রোগীদের ফিরিয়ে দিচ্ছি না। অতিরিক্ত বিছানা বিছিয়ে হলেও ভর্তি নিচ্ছি। তাই একসঙ্গে এত রোগী সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক ও নার্সদের।’
এ বিষয়ে জেলার সিভিল সার্জন ডা. শিহাব উদ্দিন বলেন, বন্যার্তদের চিকিৎসায় সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি জেলা শহরে বেসরকারি কনসেপ্ট হাসপাতাল, মেডিল্যাব, মেডিনোভা, জেডইউ মডেল, আল আকসা, ফেনী ডায়াবেটিস এবং মিশন হাসপাতাল কাজ করছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে বন্যার্তদের চিকিৎসা দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে ৩০ জন চিকিৎসকের একটি বিশেষ দল ফেনী এসেছে।
ফেনীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যায় তছনছ পুরো জনপদ। ১৬ লাখ মানুষের এ জেলার অধিকাংশ এলাকা ডোবে বানের পানিতে। টানা কয়েক দিন বাড়ার পর কোথাও কোথাও পানি নামতে শুরু করায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থেকে মানুষ বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। তবে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে ফেনীতে দেখা দিচ্ছে পানিবাহিত নানা রোগবালাই। ডায়রিয়া, আমাশয়, পেটব্যথা, জ¦র ও চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে বানভাসিরা। আক্রান্তদের বেশিরভাগই শিশু। চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। হঠাৎ করে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংকট তৈরি হয়েছে।
জেলায় বন্যার্তদের চিকিৎসায় এবং বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১৪টি স্বাস্থ্য ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফেনীর জেলা প্রশাসক মুছাম্মৎ শাহীনা আক্তার। তিনি বলেন, জেলা শহরে সেনাবাহিনীর স্বাস্থ্য ক্যাম্প স্থাপনসহ ছয় উপজেলায় ছয়টি স্বাস্থ্য ক্যাম্প এবং বেসরকারি সাতটি হাসপাতালকে এ কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নদনদীর পানি কমায় কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও দুর্ভোগ যেন পিছু ছাড়ছে না কুমিল্লার বন্যার্তদের। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠছে ময়লা-আবর্জনা। ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধ। বন্যাকবলিত এ জেলার অনেক পাড়া-মহল্লায় এখনো পানি জমে আছে। এ পানি নর্দমায় মিশে কালো রঙ ধারণ করে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দেখা দিয়েছে চর্মরোগ ও ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত নানা রোগ।
দেশ রূপান্তরের আঞ্চলিক সংবাদদাতা জানান, বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে সাড়ে আট হাজার মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছে। এ ছাড়া স্মরণকালের ভয়াবহ এই বন্যায় এখন পর্যন্ত ২২ জনের প্রাণ গেছে।
কুমিল্লার সিভিল সার্জন কার্যালয় জানায়, প্রতিদিন নতুন নতুন রোগী আসছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে। জেলার ১৭টি উপজেলার মধ্যে বন্যাকবলিত ১৪টি উপজেলার মানুষের মধ্যে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। এসব উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন নাঙ্গলকোট ও মনোহরগঞ্জ উপজেলার মানুষ। এ উপজেলায় গতকাল পর্যন্ত ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ৩ হাজার ২৬০ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। এ ছাড়া উপজেলাটিতে এখন পর্যন্ত দুজনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি চারজনের মৃত্যু হয়েছে লাকসামে।
ভয়াবহ অবস্থা বুড়িচং উপজেলারও। বুড়িচংয়ে গতকাল পর্যন্ত ২ হাজার ১৩৩ জন পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এ উপজেলায় এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
বাড়ছে সাপে কাটা রোগী : কুমিল্লায় সাপের উপদ্রব দেখা দিয়েছে। বাড়ছে সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা। এখন পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৬৮ জন সাপের ছোবল খাওয়া রোগী ভর্তি হয়েছে। তাদের বেশিরভাগ সেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি গেলেও মুরাদনগরে সাপের কামড়ের পর দেরি করে হাসপাতালে আসায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। বন্যায় জেলা জুড়ে এটিই একমাত্র সাপের ছোবলে মৃত্যু।
এ বিষয়ে জেলার সিভিল সার্জন নাসিমা আক্তার বলেন, ‘পানিবাহিত রোগ বাড়ছে। আক্রান্তদের কালক্ষেপণ না করে হাসপাতালে আসার অনুরোধ জানাচ্ছি। জেলায় ২০৮টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। কোনো ওষুধেরই অপ্রতুলতা নেই। আমরা সব মানুষকে সমানভাবে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলতে বদ্ধপরিকর।’
মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দুর্ভোগ কমেনি : মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও মানুষের দুর্ভোগ কমছে না। বন্যায় জেলার অনেক সড়ক তলিয়ে যায়। এগুলোর মধ্যে যেসব সড়ক থেকে পানি সরে গেছে, সেখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন। এগুলোর কোনোটি ভেঙে গেছে, কোনোটিতে ছোট-বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দিয়ে যানবাহন ও মানুষ চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দ্রুত সময়ে সড়কগুলো মেরামত করে যান চলাচলের উপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এ ছাড়া কৃষি ও মৎস্য খাতেও ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) মৌলভীবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ আবদুল্লাহ জানান, জেলার ২১০ কিলোমিটার পাকা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেঙে গেছে ৯টি সেতু ও কালভার্ট। এসব সড়ক ও সেতু মেরামত এবং পুনর্নির্মাণে প্রায় ১৮০ কোটি টাকা প্রয়োজন।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কায়ছার হামিদ জানান, জেলায় ছয়টি কালভার্ট ও একটি ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির নিচে তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৭৮ কিলোমিটার সড়ক। সম্পূর্ণভাবে পানি নামার পর ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে বলেও জানান তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শামসুদ্দিন আহমেদ জানান, বন্যায় ৪৯ হাজার ৪৮২ হেক্টর জমির ধান ও অন্যান্য ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও ফসলের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা হয়নি। অধিকাংশ ঘরবাড়ি থেকে পানি সরে গেলেও ফসলি জমিতে এখনো পানি রয়েছে, যা ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শাহনেওয়াজ সিরাজী জানান, বন্যায় ১ হাজার ৬৫০টি পুকুর ও দীঘির ২১০ টন মাছ পানির স্রোতে ভেসে গেছে। প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকা। তবে ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেকেই এখনো তাদের ক্ষতির তথ্য দেয়নি।
প্রশাসন ও অন্য সংস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় তৎপর রয়েছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক ড. ঊর্মি বিনতে সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পাঠানোর কাজ প্রক্রিয়াধীন।’
বন্যায় মোট মৃত্যু ৫৯ : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সার্বিকভাবে দেশের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে লোকজন নিজ নিজ বাড়িঘরে ফিরছে। দুর্গত জেলাগুলোয় যোগাযোগব্যবস্থা অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত বন্যায় পর্যন্ত ৫৯ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়, বন্যাকবলিত ১১টি জেলার ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য ৫১৯টি মেডিকেল টিম চালু রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৪ কোটি ৫২ লাখ নগদ টাকা এবং ২০ হাজার ৬৫০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৩৫ লাখ টাকা শিশুখাদ্যের জন্য ও ৩৫ লাখ টাকা গো-খাদ্যের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এতে আরও জানানো হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংগ্রহ করা ১ লাখ ৪০ হাজার ৯০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, কাপড় ও পানি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের (ডিডিএম) মাধ্যমে বন্যাকবলিত এলাকায় পাঠানো হয়েছে। ডিডিএম ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের মধ্যে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক বন্যাদুর্গত এলাকায় ২ লাখ ৩৬ হাজার ৩২৮ প্যাকেট ত্রাণ ও ২০ হাজার ৪১০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। ৪২ হাজার ৮১৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে ও ২৩ হাজার ৫৭০ জনকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ১৫৩ জনকে উদ্ধার করে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনী পরিচালিত ২৪টি ক্যাম্প ও ১৮টি মেডিকেল টিম বন্যা উপদ্রুত এলাকায় চিকিৎসাসেবা প্রদান করছে।
প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন ফেনী, কুমিল্লা ও মৌলভীবাজার প্রতিনিধি