লিটন-মিরাজে অবিশ্বাস্য ফিরে আসার দিন

টেস্ট ক্রিকেটের ১৪৭ বছরের ইতিহাসে এমন দিন কেউ দেখেনি। ইডেন, ব্রিজটাউন কিংবা মুলতান; খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে অবিশ্বাস্য সব ম্যাচ জয়ের দৃশ্য দেখা গেছে এই ভেন্যুগুলোতে, যা ঠাঁই পেয়েছে ক্রিকেটের রূপকথায়। রাওয়ালপিন্ডি টেস্টের ফল এখনো আসেনি, তারপরও পাকিস্তানের বিপক্ষে লিটন কুমার দাস আর মেহেদী হাসান মিরাজের সপ্তম উইকেটে যোগ করা ১৬৫ রানের জুটিটা নিঃসন্দেহে ক্রিকেটের রূপকথায় নিজস্ব জায়গা করে নেবে। ৫০ রানের নিচে কোনো দলের ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলার পর সপ্তম উইকেটে এত রান অতীতে কখনো হয়নি। তাই তো ২৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ যখন খাদের কিনারায়, চোখ রাঙাচ্ছে ফলোঅন, তখন লিটন আর মিরাজের ব্যাটে ভর করেই বাংলাদেশ পৌঁছে যায় ২৬২ রানের সংগ্রহে। মাত্র ১২ রানের লিড পায় পাকিস্তান। শেষ বেলায় কুড়ি মিনিটের বোলিংয়ে পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংসে দুই উইকেট তুলে নিয়ে দারুণ অবস্থানে বাংলাদেশ।

রাওয়ালপিন্ডির সকালটাকে দুঃস্বপ্ন বললেও কম বলা হবে। চোখের নিমেষে স্কোরকার্ডটা যেন পরিণত হলো ধ্বংসস্তূপে। ষষ্ঠ ওভারের শেষ বলে আউট হলেন জাকির হোসেন, অষ্টম ওভারের প্রথম বলে সাদমান ইসলাম। একই ওভারে দুই বল পর আউট হয়ে গেলেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। তার ঠিক ৩ বল পর আউট মমিনুল হক। তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল বাংলাদেশের টপ অর্ডার, ২০ রানে নেই ৪ উইকেট। এরপর উইকেটে সাকিব আল হাসান আর মুশফিকুর রহিম; সমর্থকদের মনে আসা এবার অন্তত ধস ঠেকাবেন অভিজ্ঞ দুই ক্রিকেটার মিলে। তাতেও গুড়েবালি, মির হামজার অসাধারণ ডেলিভারিতে স্লিপে ক্যাচ দিতে বাধ্য হলেন আগের ইনিংসেই ১৯১ রান করা মুশফিক, এবারে মাত্র ৩ রানেই বিদায়। সাকিবের ব্যাটিং সামর্থ্য হালফিলে প্রশ্নবিদ্ধ, সেই প্রশ্ন উসকে দিয়েই খুররম শাহজাদের চতুর্থ শিকার বনে অলরাউন্ডারের বিদায়। সোজা বলে লেগবিফোর উইকেট হয়েছেন, রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি সাকিব। তৃতীয় দিনে ১০ ওভার খেলা হওয়ার আগেই বাংলাদেশের ৬ উইকেট নেই, স্কোরবোর্ডে রান মাত্র ২৬। পাকিস্তানের প্রথম ইনিংসের ২৭৪ রান তখন মনে হচ্ছে হিমালয়।

তেনজিং এবং হিলারির মতোই হিমালয় জয়ের যাত্রায় জোড় বাঁধলেন মিরাজ ও লিটন। শুরু থেকে লিটন ছিলেন সাবধানী, মিরাজ স্বভাবসুলভ। আলগা বল পেলে বাউন্ডারি মেরেছেন, জেঁকে বসা চাপটা আস্তে আস্তে সরিয়েছেন। অবশ্য ভাগ্যও কিছুটা সহায় হয়েছে তাদের, মাত্র ৭ ওভার বল করেই মাংসপেশিতে টান পড়ায় ড্রেসিংরুমে ফিরে যান পেসার মোহাম্মদ আলি। ফলে পুরোটা ইনিংস একজন বোলার কম নিয়েই খেলতে হয়েছে পাকিস্তানকে, যার ফলে চাপটা বাড়ে অন্যদের ওপর। আসে ক্লান্তি। ধীরে ধীরে এঁটে আসা ফাঁসটাও আলগা হয় আর মিরাজ-লিটন জুটি একটু একটু করে বাংলাদেশকে নিয়ে আসেন বিপদসীমার বাইরে।

আগের টেস্টে ৭৭ রানের ইনিংস খেলেছিলেন মিরাজ। একই ম্যাচে বোলিংয়ে ৫ উইকেট নেওয়ার পর ব্যাটিংয়েও সেঞ্চুরি করার বিরল কীর্তিটা যখন মনে হচ্ছিল সময়ের ব্যাপার, তখনই খুররম শেহজাদের বলে সোজা ড্রাইভ খেলতে গিয়ে তার হাতেই তুলে দিয়েছেন বল। গতির সামান্য হেরফেরে বোকা বনে যাওয়া মিরাজ আউট হলেন ৭৮ রান করে। টেস্টে সবশেষ ৩ ইনিংসেই আটে নেমে মিরাজের হাফসেঞ্চুরি। তাকে ‘স্পেশালিস্ট নাম্বার এইট ব্যাটসম্যান’ বলছিলেন ধারাভাষ্যকাররা, তুলনা করছিলেন সমানতালেই চলা লর্ডস টেস্টে গাস অ্যাটকিনসনের আটে নেমে করা সেঞ্চুরির সঙ্গে। তবে শেষ পর্যন্ত তিন অঙ্কে আর যাওয়া হয়নি মিরাজের। তবে যেভাবে খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তোলায় একবার মুশফিক ও আরেকবার লিটনকে সঙ্গ দিয়ে দুটো দেড়শ রানের জুটির অংশীদার হলেন এই সফরে, সেটা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে এখন কেবল বোলার নয় প্রকৃত অর্থেই অলরাউন্ডার হয়ে উঠেছেন মিরাজ। শুধু রান সংখ্যা নয়, ব্যাটিংয়ের ধরন, ইনিংস গড়ার সামর্থ্য সবকিছুতেই পরিণতবোধের সুস্পষ্ট ছাপ।

লিটনকে নিয়ে বরাবরের আক্ষেপ, তার ইনিংসগুলো বিজ্ঞাপনের মতো। ঝকঝকে, দৃষ্টিনন্দন কিন্তু স্থায়িত্ব বড্ড কম। কাল লিটন খেলেছেন পূর্ণদৈর্ঘ্যরে সিনেমার মতোই। ২২৮ বল খেলেছেন, বলা যায় সকালের সেশনের আধঘণ্টার মাথায় নেমেছিলেন আর খেলা শেষের আধঘণ্টা আগে আউট হয়েছেন। মিরাজের সঙ্গে জুটিটা ভেঙে যাওয়ার পর হাসান মাহমুদকে একপ্রান্তে নিয়ে লড়াইটা চালিয়ে যাওয়া লিটন শুধু নিজের সেঞ্চুরিই তুলে নেননি, অষ্টম উইকেটেও ৬৯ রানের জুটিও গড়েছেন যে রানটা বাংলাদেশকে পৌঁছে দিয়েছে পাকিস্তানের প্রথম ইনিংসের সংগ্রহের খুব কাছে। অন্যপ্রান্তে হাসানও ৫১ বলে ১৩* রানের ইনিংস খেলে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

সালমান আগার বলে উড়িয়ে মারতে গিয়ে সাইম আইয়ুবের ক্যাচের শিকার হয়ে লিটন যখন ড্রেসিং রুমে ফিরছেন, তখন সতীর্থ সবাই দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানিয়েছেন। ১৩ বাউন্ডারি আর ৪ ছক্কায় সাজানো লিটনের এই ইনিংসে ভর করেই বাংলাদেশ খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয়ের সম্ভাবনাও দেখছে রাওয়ালপিন্ডিতে, সৃষ্টি হয়েছে পাকিস্তানকে তাদের মাটিতে হারিয়ে টেস্ট সিরিজ ২-০তে জেতার এক বিরল অর্জনের সুযোগ।

লিটনের বিদায়ের পর অবশ্য আর এগোয়নি বাংলাদেশের ইনিংস, নাহিদ রানা এসে ২ বল খেলে শূন্য রানেই আউট হয়ে গেছেন। তাতে বাংলাদেশ অলআউট ২৬২ রানে, পাকিস্তান পায় ১২ রানের লিড। শেষ বিকেলে ব্যাট করতে নামা পাকিস্তান ৯ রান তুলতেই হারিয়েছে ২ উইকেট। আবদুল্লাহ শফিকের দুর্দশা চলমান, প্রথম ইনিংসে শূন্য রানে আউট হওয়ার পর এবার মাত্র ৩ রানে হাসান মাহমুদের শিকার হয়েছেন লিটনের হাতে ক্যাচ দিয়ে। নাইটওয়াচম্যান হিসেবে নেমেছিলেন খুররম মনজুর, যে ভূমিকায় বাংলাদেশের বিপক্ষে নেমে ডাবল সেঞ্চুরির কৃতিত্ব আছে পাকিস্তানের বর্তমান টেস্ট কোচ জেসন গিলেস্পির। তবে ৬ উইকেট নেওয়া খুররমের জন্য তেমন কোনো কীর্তির সুযোগ রাখেনি বাংলাদেশ, অসাধারণ এক ডেলিভারিতে তার অফস্টাম্পের বেল উড়িয়ে দিয়েছেন হাসান। ৬ উইকেট নেওয়া দিনের শেষটায় ০ রানে বোল্ড হয়ে বিদায় খুররমের, সেই সঙ্গে দিনের খেলারও সমাপ্তি।