ছয় মাস আগে পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়ে নারায়ণগঞ্জের সুর বানুর। বয়সের কোটা ৬০ পেরিয়ে যাওয়া এই নারীর অস্ত্রোপচার করাতে ভয়। ফলে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ খেয়ে সুস্থ থাকার চেষ্টা করছেন। যদিও চিকিৎসকরা এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, অস্ত্রোপচার ছাড়া সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কম তার। গত শনিবার রাতে পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হয় সুর বানুর। ফলে তাকে ওই রাতেই নারায়ণগঞ্জ জেলা হাসপাতালে ভর্তি করান বড় মেয়ে রুনা আক্তার। ওই হাসপাতালের চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচারের জন্য সুর বানুকে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু ঢাকায় এনেও চিকিৎসকদের কর্মবিরতির কারণে সুর বানুর অস্ত্রোপচার করাতে ব্যর্থ হন স্বজনরা।
গতকাল রবিবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেট দিয়ে বের হয়ে আসতে দেখা যায় সুর বানু ও তার মেয়ে রুনা আক্তারকে। হুইলচেয়ার না পেয়ে বয়স ও অসুস্থতায় নুয়ে পড়া সুর বানুর হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। মেয়ে রুনা আক্তার চেষ্টা করছিলেন হাত ধরে কষ্ট করে মাকে জরুরি বিভাগের সিঁড়ি দিয়ে বের করে নিয়ে আসার। জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে মা-মেয়ের সঙ্গে কথা বলেন দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদক।
রুনা আক্তার বলেন, ‘আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো না। চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় নিয়ে আসতে বলেন। গ্রামের একজন বলছিলেন ঢাকার মুগদা হাসপাতালে নিয়ে এলে তিনি কম টাকায় চিকিৎসা করিয়ে দেবেন। তার কথামতো মুগদা হাসপাতালে নিয়ে যাই, কিন্তু তারা আমার মাকে ভর্তি নেয়নি। ডাক্তাররা নাকি কীসের জন্য আন্দোলন করতেছে, ফলে কোনো রোগীর চিকিৎসা করবেন না তারা। কতজনকে যে অনুরোধ করলাম, তারা কেউ আমাদের ভর্তি নিল না। একজন বললেন, ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাও, এরপর এখানে আসলাম।’
রুনা আক্তার আরও বলেন, ‘এখানে এসে আউটডোরে টিকিট কাটতে যাই, কিন্তু কাউন্টারে কোনো মানুষ নেই। এখানেও নাকি ডাক্তাররা আন্দোলন করতেছে। ভাবলাম জরুরি বিভাগে গেলে মনে হয় ডাক্তার পাব, তাই এখানে আসলাম। কিন্তু সব বন্ধ, কোথাও ডাক্তার নেই। সবাই তাড়িয়ে দেয়, কথাও বলা যায় না। ডাক্তাররা আন্দোলন করবে করুক, তাই বলে আমরা চিকিৎসা পাব না। হাসপাতাল যদি ফিরাই দেয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব?’
সুর বানু বলেন, ‘খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা। কিছু খেতে পারি না। রাত থেকে পানি ছাড়া কিছুই মুখে দিতে পারি নাই। খাইলেই পেটে ব্যথা শুরু হয়, বমি করতে করতে জীবন বের হয়ে যায়। দুইটা হাসপাতালে গেলাম কেউ ভর্তি করেনি। গরিব মানুষ, কাউকে চিনিও না।’
শুধু সুর বানু ও তার মেয়েই নন, ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে গতকাল এ রকম বিড়ম্বনায় পড়েন শত শত রোগী। তারা কেউ সেবা না পেয়ে বাসায় ফিরে যান, আবার কেউবা অন্য হাসপাতালে সেবা নেওয়ার চেষ্টা করেন। দুপুর ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায় ঢামেকে।
সন্তানসম্ভবা স্ত্রী সুহেনা বেগমকে নিয়ে এসেছিলেন সুমন মিয়া। হাসপাতালে বহু ঘুরেও তিনি স্ত্রীকে ভর্তি করাতে পারেননি। জরুরি বিভাগের সামনে কথা হয় সুমন মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে প্রসববেদনা ওঠে, তাই হাসপাতালে নিয়ে আসি। এখানে এসে দেখি চিকিৎসক নেই, চিকিৎসা কীভাবে পাব, কোথায় যাব জানি না।’
মোহাম্মদ আলী চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থেকে গতকাল ভর্তি হন ঢামেক হাসপাতালে। তার শারীরিক অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হওয়ায় চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। তার ভাই শাকিল বলেন, ‘খাদ্যনালিতে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা আমার ভাইয়ের। নানা দেন-দরবার শেষে গতকাল বেলা আড়াইটায় তার অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে জানানো হয় আজ কোনো অপারেশন হবে না।’
জরুরি বিভাগের ৭ নম্বর অবজারভেশন কক্ষে আসেন শ্বাসকষ্ট নিয়ে রাজধানীর মহাখালী টিবিগেট এলাকার বাসিন্দা মাসুম। তার বড় ভাই শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সকাল থেকে ভাইয়ের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এক চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বারে নিয়ে গেলে তাকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসি। কিন্তু এখানে এসে শুনি কোনো রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না, জরুরি বিভাগের সেবাও বন্ধ। হঠাৎ করে চিকিৎসকরা এমন কর্মসূচি দিলেন অথচ আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করলেন না।’
চট্টগ্রামে বিপাকে মুমূর্ষু রোগীরা : নগরের মাদারবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আবুল হোসেন (৫৬) গতকাল শনিবার রাতে স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে দ্রুত তাকে ভর্তি করা হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে। গতকাল বিকেল ৪টার দিকে আবুলের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত ওই বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসদের কক্ষে যান তার ছেলে আবদুস সাত্তার। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেন কোনো চিকিৎসক নেই। দরজায় তালা ঝুলছে। এ অবস্থায় কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না তিনি। অবশেষে প্রাণ বাঁচাতে বাবাকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে বেসরকারি একটি হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি। এ সময় তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ডাক্তারদের আগে তো মানুষ বাঁচাতে হবে। তারপর না তারা দাবি-দাওয়া আদায় করবেন।’
রোগীদের দুর্ভোগ শুধু হৃদরোগ বিভাগে নয়, গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে চমেক হাসপাতালের মেডিসিন, গাইনি, অর্থোপেডিক, কিডনিসহ বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে চিকিৎসকদের দেখা মেলেনি। ওয়ার্ডগুলোয় চিকিৎসক না থাকায় বিপাকে পড়েন শত শত রোগী। চিকিৎসা না পেয়ে কয়েকজন রোগী মারা গেছেন বলেও হাসপাতালের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে। তবে এর সত্যতা নিশ্চিত করতে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার তসলিম উদ্দিনের মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এর আগে বিকেল ৪টার দিকে জরুরি বিভাগে হাজির হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মো. রাসেল আহমেদসহ আরও কয়েকজন। একপর্যায়ে তারা তালা ভেঙে রোগীদের ভেতরে ঢোকান। এরপর ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ থেকে সরে আসেন চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা। এ প্রসঙ্গে জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. মোমিন উল্লাহ ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের জরুরি বিভাগের চিকিৎসাসেবা এক ঘণ্টার মতো বন্ধ ছিল। পরে রোগীদের অসহায়ত্ব দেখে কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আবারও সেবা দেওয়া শুরু করে দিই।’
বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে চমেক হাসপাতালে ঘুরে দেখা যায়, জরুরি বিভাগে কিছু চিকিৎসক রোগীদের সেবা দিলেও অন্যান্য ওয়ার্ডে চিকিৎসকদের কক্ষের দরজায় তালা ঝুলছে। সেবা না পেয়ে রোগী ও স্বজনরা উত্তেজিত হয়ে যান। পেটের পীড়া নিয়ে গত শুক্রবার সকালে মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হন ফটিকছড়ি উপজেলার বাসিন্দা আদনান আলী (৫০)। তার মেয়ে দেলোয়ারা বেগম জানান, গতকাল রবিবার দুপুর ১২টা থেকে পেটের ব্যথায় কাতরাচ্ছেন তার বাবা। বমি করছেন। হাঁটতে পারছেন না। তিনি বারবার ছুটে যান ডিউটি ডাক্তারের রুমে। কিন্তু তাদের কারও দেখা না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক রাজীব পালিত সাংবাদিকদের বলেন, নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রসহ জরুরি বিভাগে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। জরুরি বিভাগে চিকিৎসা চলছে। কিন্তু অন্য ওয়ার্ডে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়নি।
প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে চট্টগ্রাম ব্যুরো।