ভারী বৃষ্টিপাত ও ভারতের ছাড়া উজানের পানিতে বন্যায় ডুবেছে বাংলাদেশের ১১টি জেলা। এতে ৫৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১০ লাখ মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বন্যার কারণে। জাতিসংঘ বলছে, আকস্মিক এ বন্যায় ওই অঞ্চলের মাছের খামার, হাঁস, মুরগি, গরু ও ছাগলের খামার ধ্বংস হয়েছে। এতে ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ৮৪০ কোটি টাকার বেশি। সম্প্রতি জাতিসংঘের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, বন্যার পানিতে ডুবে প্রায় তিন লাখ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। তবে এতে কী পরিমাণের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো প্রকাশ করেনি।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স কো-অর্ডিনেশন সেন্টারের (এনডিআরসিসি) দেওয়া তথ্য অনুসারে, আকস্মিক এ বন্যায় বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে বাস্তুচ্যুত ৫ লাখ ২ হাজার ৫০১ জন ৩ হাজার ৪০৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
স্মরণকালের ভয়াবহ এ বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলো হলো নোয়াখালী, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চট্টগ্রাম ও মৌলভীবাজার। গত কয়েক দিনের পানিতে এসব জেলার গ্রামীণ রাস্তাঘাট, কৃষিক্ষেত্র এবং মাছের পুকুর তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়ে গেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির হিসাব তুলে ধরে জাতিসংঘের এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে বন্যায় ২ লাখ ৯৬ হাজার ৮৫২ হেক্টর ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মৎস্য সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হলো ১২ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার এবং প্রাণিসম্পদের ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি ৪০ লাখ ডলারের। অর্থাৎ ১৫ কোটি ৬০ লাখ ডলারের মৎস ও প্রাণিসম্পদ নষ্ট হয়েছে। প্রতি ডলার ১১৮ টাকা হিসেবে বাংলাদেশি মুদ্রায় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৪০ কোটি টাকার বেশি। এতে বলা হয়েছে, বন্যার কারণে আক্রান্ত অঞ্চলগুলোতে ৭ হাজার বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সেখানে ১৫ লাখ ৫০ হাজার প্রাথমিক শিক্ষার্থীর পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নারীরা পড়েছেন বড় সমস্যায়। তারা স্যানিটারি ন্যাপকিন, বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছেন না। একই সময়ে এসব এলাকায় পানিবাহিত রোগের উপক্রমও বেড়েছে।
বন্যাকবলিত এলাকায় রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন। নোয়াখালী জেলার ৫০ শতাংশেরও বেশি প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে পাওয়া যায়নি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বাজারগুলোও ডুবে যাওয়ায় প্রত্যেকটি সংস্থাকে মাঠে নামতে হয়েছে।
২১ থেকে ২৮ আগস্ট পর্যন্ত এসব ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে এ কয়দিনে ৪ হাজার ৭৮৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ছিল ডায়রিয়ার। পানিবাহিত ডায়রিয়ায় ১ হাজার ৩৯৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছে বলে হিসাব দিয়েছে সংস্থাটি। বন্যায় সব মিলিয়ে ৫২ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে উঠে এসেছে জাতিসংঘের এ হিসাবে।
এদিকে ইউনিসেফ বলছে, নজিরবিহীন প্রবল মৌসুমি বৃষ্টিতে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদীগুলো উপচে পড়ছে। যার ফলে এখন পর্যন্ত ৫২ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের প্রায় পাঁচ লাখের বেশি মানুষ মাথা গোঁজার একটু আশ্রয় খুঁজছেন; বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে বাড়িঘর, রাস্তা, মাঠ-ঘাট আর ক্ষেত। লাখ লাখ শিশু ও তাদের পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছেন, তাদের কাছে নেই কোনো খাবার কিংবা জরুরি ত্রাণসামগ্রী। সরকারি কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকরা উদ্ধার-অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু কিছু কিছু এলাকায় সাহায্য পৌঁছে দেওয়াটা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মৌসুমি বৃষ্টি অব্যাহত থাকার কারণে আগামী দিনে আরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।