লোকসানের ভারে ন্যুব্জ হওয়া ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) কর্তৃপক্ষ অর্গানোগ্রাম সংশোধনের মাধ্যমে নতুন পদ সৃষ্টি করে আরও প্রায় ২৩০ জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। যাদের মধ্যে অন্তত ১৫০ জন প্রধান প্রকৌশলী থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা।
আজ মঙ্গলবার সংস্থাটির বোর্ডসভায় প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রামটি উত্থাপন করা হবে। এটি অনুমোদন হলে ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি লোকসানও বাড়বে। কিন্তু একসময়ে মুনাফায় থাকা কোম্পানিটি ২০২২-২৩ হিসাববছরে ৫৪১ কোটি টাকা কর-পরবর্তী নিট লোকসান করেছে। এরপর থেকে গত মার্চ পর্যন্ত লোকসান হয়েছে ২৭০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ৮১১ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে, যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এমন এক পরিস্থিতিতে ডেসকো ব্যয় বৃদ্ধির এ অর্গানোগ্রাম পাস করার উদ্যোগ নিয়েছে, যখন সরকার দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে উত্তরণের জন্য ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানও গত রবিবার তার অধীনে থাকা তিনটি মন্ত্রণালয়ের অযাচিত ব্যয় কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে পরিবর্তিত এ সময়ে ডেসকোর অর্গানোগ্রাম পাস করার তোড়জোড় শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
তারা বলছেন, ওই অর্গানোগ্রাম সংশোধন হলে ডেসকোর লোকসান বৃদ্ধির পাশাপাশি পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে সুবিধাভোগীরা নতুন করে আবারও বাড়তি সুবিধা পাবেন। বঞ্চিতরা আগের মতোই বঞ্চিত হবেন।
ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটিতে এক যুগের বেশি সময় ধরে বঞ্চনার শিকার হওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ডেসকো কর্তৃপক্ষকে তাদের ন্যায্য সুবিধা নিশ্চিত করার পর অর্গানোগ্রাম সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু তাদের সেই দাবি আমলে না নিয়ে অর্গানোগ্রাম সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ডেসকোর কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ২ হাজার ২০০ জনেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এই কর্মী দিয়েও গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এখন নতুন করে আরও কর্মী নিয়োগ দেওয়া হলে তাদের বেতন-ভাতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি, যানবাহন, জ্বালানি, চালক ও অন্যান্য ব্যয় বাড়বে।
ডেসকোর একজন কর্মচারীর সর্বনিম্ন মাসিক বেতন প্রায় ৩৫ হাজার আর প্রধান প্রকৌশলীর বেতন প্রায় ২ লাখ টাকা।
প্রতিষ্ঠানটির একজন নির্বাহী পরিচালক দেশ রূপান্তরকে জানান, মঙ্গলবারের বোর্ড মিটিংয়ে উত্থাপনের জন্য আজ (গতকাল) অর্গানোগ্রামটি রিভিউ করা হয়েছে। তিনি স্বীকার করেছেন, এ অর্গানোগ্রাম পাস হলে ডেসকোর লোকসান আরও বাড়বে। তবে কী পরিমাণ লোকসান বাড়বে সেই তথ্য জানা সম্ভব হয়নি।
জানতে চাইলে ডেসকোর ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সরকারের যুগ্ম সচিব মীর নাহিদ আহসান গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, অর্গানোগ্রাম সংশোধনের প্রস্তাবটি বেশ আগের। এটা নিয়ে একটা কমিটি হয়েছিল। সেই কমিটি বছরখানেক আগে একটি সুপারিশ করেছিল। সেটিই মূলত আগামীকাল (আজ) বোর্ডসভায় উপস্থাপন করা হবে।
‘কিন্তু উপস্থাপনা করা মানেই তো পাস হওয়া নয়। এটার সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে আলোচনার পর তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে পরিচালনা পর্ষদ’ যোগ করেন তিনি।
অর্গানোগ্রাম সংশোধন হলে ডেসকোর লোকসান আরও বাড়বে, সেটি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে এমন প্রশ্নের জবাবে মীর নাহিদ জানান, অর্গানোগ্রাম সংশোধন হলে কী পরিমাণ ব্যয় বাড়বে, তা এখনো হিসাব করা হয়নি। এটারও ‘অ্যাসেসমেন্ট’ করা হবে। তবে এতদিন ‘আউটসোর্সিং’য়ের মাধ্যমে যেসব জনবল নিয়োগ করা হতো, সেগুলোর পরিবর্তে নিজস্ব জনবল নেওয়া হলে ডেসকোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই সুবিধা পাবেন। বঞ্চিতদের অনেকেই অর্গানোগ্রাম সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অর্গানোগ্রাম সংশোধনের আগে তাদের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন। তবে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, এরকম কোনো দাবি কেউ জানায়নি।
এদিকে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা বঞ্চিত ৭৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী বৈষ্যমের প্রতিকার চেয়ে গত ২১ আগস্ট ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে লিখিত আবেদন দিয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রাম যে বাড়তি জনবলের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে, তাতে অন্তত ছয়জন প্রধান প্রকৌশলী, ২৫ জন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, ১২ জন নির্বাহী প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় দেড়শজন কর্মকর্তা রয়েছেন। মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অন্যদের বঞ্চিত করে পদ-পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছিলেন যারা, তারাই এসব পদে আবার পদোন্নতি নেওয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছেন। সুবিধাভোগী আর দুর্নীতিবাজরা যদি ওপরের পদ দখল করেন, তাহলে ডেসকোর লোকসান আরও বাড়বে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, একজন সহকারী প্রকৌশলী চাকরি শুরুর পর সাত বছরে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং পরবর্তী চার বছরে নির্বাহী প্রকৌশলী হওয়ার কথা। কিন্তু ১২ বছরের বেশি সময় ধরে চাকরি করেও এখন পর্যন্ত অনেকেই উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে চাকরি পেয়েছেন। অন্যান্য পদেও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন অনেকেই। কিন্তু সুবিধাভোগীরা তরতর করে এগিয়ে গেছেন।
অভিযোগ উঠেছে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের একজন উপদেষ্টা এবং ডেসকোর নির্বাহী পরিচালক (প্রকৌশল) জগদীশ চন্দ্র ম-ল এবং তার সহযোগীদের যোগসাজশে বিভিন্ন সময়ে যোগ্যদের বঞ্চিত করার পাশাপাশি নতুন করে অর্গানোগ্রাম সংশোধন করে আবারও তাদের বঞ্চিত করার পাঁয়তারা করছেন।
এই জগদীশ চন্দ্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তিনি ডেসকোতে এখনো বেশ দাপটের সঙ্গেই আছেন।
এ বিষয়ে জানতে গতকাল জগদীশ চন্দ্রের মোবাইলে ফোন দেওয়া হলে তিনি ফোন ধরেননি। পরে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
এদিকে আওয়ামী সরকারের আমলে সুবিধাভোগীদের আরও সুবিধা দিতে একটি কমিটি গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে সংশোধিত ওই অর্গানোগ্রামটি তৈরি করে জমা দেয়। কিন্তু হঠাৎ করেই সেটি এখন কেন অনুমোদনের জন্য তোড়জোড় শুরু হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) ড. সৈয়দ মাসুম আহমেদ চৌধুরীকে গতকাল পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে বদলি করেছে সরকার। আগামীকাল (আজ) বোর্ডসভা ডাকা হয়েছে। অর্থাৎ এক দিন আগেই তাকে বদলি করা হয়েছে। তিনি বদলি হতে পারেন এমন আভাস পেয়েই তড়িঘড়ি করে অর্গানোগ্রাম সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন কি তা নিয়েও সন্দেহ পোষণ করেছেন ডেসকোর একাধিক কর্মকর্তা। এ বিষয়ে জানতে গতকাল মাসুম আহমেদের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার সাড়া মেলেনি।
ডেসকোর কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি আর অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের কারণেই মূলত লোকসান বেড়েছে। যদি কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে বিভিন্ন সময়ে দাবি করা হয়েছে, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলারের দামের সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়নের কারণেই প্রতিষ্ঠানটির বিপুল লোকসান হয়েছে।
তবে এমন বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, এ কারণে কিছু ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করা গেছে লোকসান থাকত না। হয়তো সে ক্ষেত্রে মুনাফা কম হতো।
অভিযোগ রয়েছে, ডেসকোতে নিয়োগ পদোন্নতিতে অনিয়ম-দুর্নীতির পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ সাবেক সরকারের আশীর্বাদপুষ্টদের দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে গত কয়েক বছরে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটটি। এ ছাড়া নিয়োগ-পদোন্নতিতেও বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ঘুষবাণিজ্য হিসেবে।
এদিকে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো ব্যবস্থাপনা পরিচালক নেই। ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিয়েই কার্যক্রম চালাতে গিয়ে নানা জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত তালিকা করার পরও ওই পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি এখন পর্যন্ত। পছন্দের প্রার্থী না পাওয়া এবং অবৈধ লেনদেনে বনিবনা না হওয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়াটি ঝুলে আছে বলে অভিযোগ রয়েছে।