গত কয়েক দশক ধরে দ্বিদলীয় শাসনের বৃত্তে আটকা পড়েছে দেশ। ক্ষমতার পালাবদলে এককেন্দ্রীকরণ বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরতান্ত্রিক শাসনও দেখেছে দেশের মানুষ। এ সময় কম বিতর্কিত নির্বাচনে যে দল বা জোটই সরকার গঠন করেছে, তাদের কেউই ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশর বেশি ভোট পেয়ে সরকার গঠন করতে পারেনি। অন্যদিকে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ মানুষ যারা ভোট দিয়েছে সংসদে ও সরকারে তাদের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি।
এমন প্রেক্ষাপটে সংসদে সবার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা শ্রেয় মনে করছেন রাজনীতিক ও বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। তারা মনে করেন, সংসদে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি চালু করা গেলে দ্বিদলীয় পদ্ধতি থেকে বের হওয়া সম্ভব। কোনো দল জাতীয় নির্বাচনে যত শতাংশ ভোট পাবে, সংসদে তারা সেই অনুপাতে আসন পাবে। এ পদ্ধতিতে একদিকে যেমন সুশাসন নিশ্চিত হতে পারে, অন্যদিকে একক দলীয় আধিপত্য ক্রমে হ্রাস পাবে। সব দলই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারবে।
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর আলোচনায় আসতে শুরু করে সংখ্যানুুপাতিক পদ্ধতি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণমূলক করতে নির্বাচনে পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনার প্রস্তাব দেয় বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। সেখানেও সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির বিষয়টি উঠে আসে। একতরফা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের কিছু প্রস্তাব দিয়েছে, যার মধ্যে আছে সংসদে সংখ্যানুপাতিক ভোট পদ্ধতি চালু করা।
এ দাবির বিষয়ে ইতিবাচক মতামত দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। পরে অবশ্য তিনি বলেন, নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নির্বাচন পদ্ধতি সংস্কারের প্রস্তাব ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। সেখানেও গুরুত্ব পেয়েছে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো মতবিনিময়কালে বেশ কয়েকটি দল সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের বিষয়টি উপস্থাপন করে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে সংসদে ভারসাম্য তৈরি হবে। এ পদ্ধতিতে প্রত্যেকটি ভোটের মূল্যায়ন হয়। প্রতিটি ভোট সংসদে সমানভাবে প্রতিনিধিত্ব করে। পৃথিবীর অনেক দেশেই এটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। ছোট দল বড় দলের বিষয় থাকবে না। সংসদে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের আইনপ্রণেতারা এখন রাস্তাঘাট, কালভার্ট এসব করে বেড়ায়। অথচ তাদের কাজ হচ্ছে আইন প্রণয়ন করা। আমি মনে করি, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি চালু হলে সংসদ সদস্যরা তাদের যে কাজ সে বিষয়ে মনোনিবেশ করতে পারবেন। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিও গণতন্ত্রের আরেকটা রূপ। অনেক দেশেই এ পদ্ধতি অনুসরণ করে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কা ও নেপালে এ পদ্ধতিতে নির্বাচন হচ্ছে। বাংলাদেশেও চাইলে করতে পারে। এর মধ্য দিয়ে বয়কট, সহিংসতাসহ কিছু বিষয় হয়তো কমে আসবে।
তিনি মনে করেন, শুধু নির্বাচন পদ্ধতি পরিবর্তন করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা যাবে না। কারণ যেখানে সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র নেই, সেখানে যেই কাঠামোই তৈরি করা হোক না কেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হবে না। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আনতে হবে। যারা ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন আগে তাদের বোঝাতে হবে গণতন্ত্র কী? তারাই যেসব ক্ষমতার উৎস এটা তাদের উপলব্ধি করাতে হবে।
সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি কী?
বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি ব্যবস্থা বিদ্যমান। প্রথমত, একটি নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থীদের মধ্যে যিনি সর্বোচ্চ ভোট পাবেন তিনি নির্বাচিত হবেন। এ পদ্ধতিকে বলা হয় ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট। এ পদ্ধতি বাংলাদেশে চালু রয়েছে। অন্যটি সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা বা প্রফেশনাল রিপ্রেজেনটেশন সিস্টেম। এ পদ্ধতিতে একটি দল যে পরিমাণ ভোট পাবে, সেই অনুপাতে সংসদে দলটির প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ হবে। অনেক দেশে এ দুটি পদ্ধতির সমন্বিত ব্যবস্থাও চালু রয়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের আসন সংখ্যা ৩০০। এসব আসনে সরাসরি ভোট হয়। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে ভোট হলে প্রতি ১ শতাংশ ভোটের জন্য তিনটি আসন পাওয়া যাবে। যে দল ৫০ শতাংশ ভোট পাবে, তারা সংসদে আসন পাবে ১৫০টি।
আসন বণ্টন হবে যেভাবে
বর্তমান বিশ্বের ৮৭টি দেশে নানা পদ্ধতিতে সমানুপাতিক নীতি অনুসরণ করে নির্বাচন পরিচালিত হয়। তিনটি পদ্ধতিতে নির্বাচন সম্পন্ন হয়। তার মধ্যে রয়েছে মুক্ত তালিকা, বন্ধ তালিকা ও মিশ্র তালিকা।
মুক্ত তালিকা পদ্ধতিতে সাধারণত একটি জাতীয় সংসদ বা আইন সভায় যত আসন, নির্বাচনের আগে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর প্রাপ্ত ভোটের হার অনুযায়ী আনুপাতিক হারে ওই তালিকার প্রথম থেকে যত আসন যে দলের ভাগে পড়বে তারা সে আসনগুলোর প্রার্থিতা পূরণ করে নেবে।
বন্ধ তালিকা পদ্ধতিতে সারা দেশের জন্য একটি তালিকা করা হয় না। অঞ্চলবিশেষ, সংখ্যালঘু বা মাইনরিটি, নানা নৃ-গোষ্ঠীর জন্য পৃথক তালিকা এবং ভোট ও প্রার্থী তালিকা পৃথকভাবে করা হয়। অনেক সময় কেন্দ্র ও প্রদেশের পৃথক তালিকাও করা হয়। অন্যদিকে মিশ্র পদ্ধতি অনুযায়ী সমানুপাতিক ও সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই পদ্ধতির এক ধরনের মিশ্রণ করা হয়। কিছু আসন সমানুপাতিক এবং কিছু আসনে সরাসরি নির্বাচন হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, উন্নত দেশে আইনসভার সদস্যরা শুধু আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন। আর স্থানীয় উন্নয়নমূলক কাজ হয়ে থাকে স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে। অথচ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্যরা নির্বাচিত হয়ে আইন প্রণয়নকে গুরুত্ব না দিয়ে এলাকার উন্নয়নমূলক কাজকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে ভোট হলে সংসদ সদস্যরা যেমন আইনপ্রণেতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবেন, তেমনি অন্যদিকে স্থানীয় সরকার আরও শক্তিশালী হবে।
কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলো
বামপন্থি সাতটি দলের জোট বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক বজলুর রশীদ ফিরোজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা প্রচলিত নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার চেয়েছি। এখন যে পদ্ধতিতে নির্বাচন হয় তাতে দেখা যায়, সরকার গঠন করে তাদের প্রতি বেশিরভাগ মানুষের সমর্থন থাকে না। সেজন্য আমরা মনে করি, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে যদি নির্বাচন হয়, তাহলে সবার একটা অংশগ্রহণ থাকে। একক দলের আধিপত্য থাকলে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা তৈরি হয়। জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকে না।’ সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে ভোট হলে সংসদে সব মতের দলেরই অংশগ্রহণ থাকবে বলে মনে করেন তিনি।
বামজোটের সমন্বয়ক বলেন, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে ভোট হলে প্রতীকে নির্বাচন হবে। ৩০০ আসনেই প্রতীক থাকবে। সেই প্রতীকে কত শতাংশ মানুষের সমর্থন থাকে বা ওই দলের যে নির্বাচনী ইশতেহার তার প্রতি কত মানুষের সমর্থন থাকে সেটাও কিন্তু জানা যায়। আরেকটা হলো, যারা টাকার বস্তা নিয়ে বা হুন্ডা-গুন্ডার জোরে নির্বাচনে জেতে তাদের দৌরাত্ম্যও বন্ধ হবে। তাছাড়া এ নির্বাচনে আগেই তালিকা দেওয়া হবে। এ তালিকা থেকে কে সংসদ সদস্য হবেন, সেটাও অনিশ্চিত থাকবে না। এতে করে তারা ত্রাস সৃষ্টি করতে পারবেন না।
ছয়দলীয় আরেকটি রাজনৈতিক জোট গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের প্রত্যক্ষ নির্বাচনের পাশাপাশি সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতেও নির্দিষ্টসংখ্যক আসনে ভোট হওয়া দরকার। এ পদ্ধতি পৃথিবীর বহু দেশে, এমনকি পাশের দেশ নেপালেও রয়েছে। সেখানে সংসদের যে উচ্চ পরিষদ রয়েছে, সেটা সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয়। আমরা মনে করি, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি অনেক বেশি গণতান্ত্রিক ও প্রতিনিধিত্বমূলক। যখন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অন্তর্র্বর্তী সরকারের আলোচনা হবে, আমরা এ বিষয়ে আলোচনা তুলব।’
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মঞ্জু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আমাদের পক্ষ থেকে যেসব লিখিত ও মৌখিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেখানে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের বিষয়টি উল্লেখ করেছি। আমরা মনে করি, এ নির্বাচন ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য খুব দরকার। সরকারের নির্বাচন কমিশন ইস্যুতে এ সংস্কারটা করা দরকার।’
তিনি মনে করেন, এ বিষয়ে সংকট হওয়ার কথা নয়। স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হওয়াটাও দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কাজ। কারণ এতদিন ধরে যা হয়েছে সেটা অন্যায্য, সবাই সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য পাগল হয়ে যান। সংসদ সদস্যদের কাজ হচ্ছে আইন প্রণয়ন করা, তাদের কাজ রাস্তা, সেতু করা নয়। তাদের কারণেই এতদিন স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হয়নি।
অন্তর্র্বর্তী সরকারের কাছে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা পিআর (সংখ্যানুপাতিক) সিস্টেমে যে নির্বাচন... এতে সব শাখার, সব ধরনের মন-মানসিকতার লোক সম্পৃক্ত থাকবে। এখানে কোনো বৈষম্যমূলক অবস্থা তৈরি করার মতো কোনো বিষয় থাকবে না।’