কে হচ্ছেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি

সাহাবুদ্দিনের বিদায় যেকোনো সময়

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৭ এএম

সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়ার পর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেলেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এখন কেবল আনুষ্ঠানিকতা বাকি। জাতীয় সংসদের স্পিকার থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফিরলেই তার কাছে পদত্যাগপত্র দিয়ে বঙ্গভবনে প্রায় ৩ বছর চার মাসের দায়িত্বের ইতি ঘটাবেন মো. সাহাবুদ্দিন। বিষয়টি ঘটতে পারে আজ-কালের মধ্যেই।

মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ সিদ্ধান্তের পাশাপাশি পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে কে আসছেন তা নিয়ে এখন রাজনীতির মাঠ সরগরম। এ ক্ষেত্রে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, দলের মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনির নাম জোরালভাবে শোনা যাচ্ছে। তবে সরকার বা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কেউ বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করছেন না। তারা বলছেন, পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনেকগুলো সমীকরণ মাথায় রেখেই তিনি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবেন।

রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, পদত্যাগসংক্রান্ত নথিপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে, তবে রাষ্ট্রপতি এখনো সই করেননি। একই তথ্য জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম। তিনি গতকাল গণমাধ্যমকে বলেন, রাষ্ট্রপতি এখনো পদত্যাগপত্রে সই করেননি। পদত্যাগ করলে জানানো হবে।

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে জাতীয় সংসদের স্পিকারের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় বিষয়টি অপেক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বর্তমানে চিকিৎসার জন্য

থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন। রবিবার তার দেশে ফেরার কথা থাকলেও আজ শুক্রবার দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে তিনি ঢাকায় ফিরবেন বলে সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে। স্পিকার দেশে ফেরার পরই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র দাখিলের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়তে হলে স্পিকারের হাতে সরাসরি পদত্যাগপত্র দিতে হবে এমন কোনো বিধান সংবিধানে নেই। সংবিধানের ৫০ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র পাঠিয়ে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন। আবার ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকারই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সূত্র জানায় মো. সাহাবুদ্দিন সরে যাওয়ার পরপরই স্পিকারকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে হয়। এ কারণেই তার দেশে ফেরার পর মো. সাহাবুদ্দিন আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গভবন ছাড়তে পারেন।

তবে বিষয়টি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে পরিষ্কার কোনো বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল জানান, তিনি নিজেও গুঞ্জনটি শুনেছেন। তিনি বলেলেন, ‘রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগ করতে চাইলে বা স্বাস্থ্যগত কারণে যেকোনো কারণে চাইলে তার সেই অপশন আছে। এক্ষেত্রে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই। পদত্যাগ করতে চাইলে সাংবিধানিকভাবে স্পিকার বরাবর পদত্যাগপত্র দিতে হয়। এইটুকু নিয়ম আছে বলে জানি।’

এদিকে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে। বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের কয়েকজন নেতা জানান, নতুন রাষ্ট্রপতি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। এ ছাড়া বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও আলোচনায় আছেন। বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনিকে নিয়েও আলোচনা হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে।

সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও বিএনপির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সামাজিক মাধ্যমে কী আলোচনা হচ্ছে তা নিয়ে তারা মন্তব্য করতে চান না। তবে সরকারি চাকরিজীবী কাউকে রাষ্ট্রপতি করার পক্ষে নন তারা। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্য থেকে কাউকে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি করার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কয়েকজন নেতা বলেন, নতুন রাষ্ট্রপতিকে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য রাজনৈতিক চাপ সামলাতে হবে। পাশাপাশি সরকার, বিরোধী দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতার বিষয় রয়েছে। আমলা থেকে রাষ্ট্রপতি হওয়া কারও পক্ষে এসব দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। নেতারা আরও বলেন, যত গুঞ্জনই থাকুক না কেন, শেষ পর্যন্ত কে রাষ্ট্রপতি হবেন সে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদ সচিবের রাষ্ট্রপতি হওয়ার গুঞ্জন শুনেছি। তবে বর্তমান রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন তা নির্ধারণ করবেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।’

অন্যদিকে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মো. সাহাবুদ্দিনের সরে যাওয়ার গুঞ্জনের বিষয়টি শুনেছি। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে স্পিকার দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।’

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি। এরপর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে দলটি। একই দিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। তবে সেখানে বাদ পড়েন খন্দকার মোশাররফ হোসেন। এরপর ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়। স্পিকার না থাকায় এদিন সংসদের জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে খন্দকার মোশাররফ সভাপতিত্ব করেন। তার সভাপতিত্বে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। এ থেকে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যসহ বিএনপির এমপি ও দলটির নেতারা ধারণা করছেন, খন্দকার মোশাররফই হয়ত পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন।

জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ধারণা করা হচ্ছে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে তিনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা নিয়েছেন।

সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে। ম্যাক্সিমাম তিন মাসের মধ্যে সংসদে এই নির্বাচন হতে হবে।’

সংবিধানের আলোকে বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন বলেন, ‘সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি চাকরিবিষয়ক যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার ক্ষেত্রে সেটি নেই।’

আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০২৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন ৭৫ বছর বয়সী মো. সাহাবুদ্দিন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। এরপর সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ রাজনৈতিক পালাবদলের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলোতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন। গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অপসারণ চেয়েছিলেন ছাত্রনেতারা। তার পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করা হয়। তবে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাকে সরানোর দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বিএনপি সরকার গঠন করার পরও তাকে সরানোর উদ্যোগ দেখা যায়নি। তবে সম্প্রতি হঠাৎ করেই জানা যায়, সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে তাকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আবু সাঈদ চৌধুরী, মোহাম্মদউল্লাহ (প্রথমে ভারপ্রাপ্ত), মোহাম্মদউল্লাহ, শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমাদ, আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, জিয়াউর রহমান, আবদুস সাত্তার (ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি), আবদুস সাত্তার, আ ফ ম আহসানউদ্দিন চৌধুরী, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, সাহাবুদ্দীন আহমদ, আবদুর রহমান বিশ্বাস, সাহাবুদ্দীন আহমদ, একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, অধ্যাপক ইয়াজউদ্দীন আহম্মেদ, মো. জিল্লুর রহমান, আবদুল হামিদ এবং সবশেষ বর্তমানে মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত