আকাশপথে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারির জাল

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৭ এএম

দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একের পর এক ধরা পড়ছে সোনার চালান। পাশাপাশি পিছিয়ে নেই মানব পাচারও। নানা কৌশলেও এসব প্রতিরোধ করতে পারছে না নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিদের অবাধ বিচরণ রয়েছে বাংলাদেশে। আর এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন দেশের ১২৩ চোরাকারবারি। তাদের নাম-পরিচয়সহ একটি তালিকা করে গত মাসের শেষ সপ্তাহে পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে ইন্টারপোলে নোটিস পাঠানো হয়েছে। কারবারিদের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, আফ্রিকা ও পাকিস্তানের নাগরিক বেশি বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

পুলিশ সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, গত সাড়ে তিন মাসে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১০০ কোটি টাকার সোনার বার উদ্ধার করা হয়। এগুলো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুটি ফ্লাইটে দুবাই থেকে আনা হয়। এই ঘটনায় শুরু হয়েছে তোলপাড়। পুলিশ এই চক্রের পেছনে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিদের সম্পৃক্ততা থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে। তারা বাংলাদেশি এজেন্টদের ব্যবহার করে ফায়দা নিচ্ছে। তাছাড়া বিমানবন্দর ও বিমানের কতিপয় কর্মকর্তাদের অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করছে। এরই মধ্যে সোনা উদ্ধারের ঘটনায় বিমানের সাত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ফ্লাইট দুটিতে দায়িত্ব পালনকারী ৩০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ডিউটি রোস্টার, দায়িত্ব বণ্টনের নথি ও অন্যান্য তথ্য তলব করেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেন, সোনা উদ্ধারের পর এজাহারে ঢিলেঢালা তথ্য থাকার কারণে পাচারকারীদের ধরা বা চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার মাঝেমধ্যে সোনা চোরাচালানে জড়িত ‘ক্যারিয়ার’ বা বাহককে গ্রেপ্তার করা হলেও মূল হোতারা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে’ মামলা হওয়ার কথা, সেখানে মামলা হচ্ছে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে। এসব মামলায় চোরাচালানের সোনার উৎস খুঁজে বের করা তথা দেশ-বিদেশে থাকা সম্পৃক্ত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সোনা ও মানব পাচারকারীদের তালিকা করা হয়েছে। দেশের পাশাপাশি বিদেশি কারবারিদের ধরতে পুলিশ আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তাছাড়া বেশ কয়েকজন কারবারিকে ধরা হয়েছে। বিমানবন্দরে আলাদাভাবে নজরদারি করা হচ্ছে।

কাস্টমসের অতিরিক্ত কমিশনার কামরুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোনা পাচারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক কারবারিরা সম্পৃক্ত। এরই মধ্যে একাধিক কারবারিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় এজেন্টদেরও আমরা খুঁজছি। সবকটি বিমানবন্দরের গোয়েন্দা নজরদারি কয়েক ধাপ বাড়ানো হয়েছে।’

বিমান কর্তার মোবাইলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য : তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৮ মার্চ গভীর রাতে দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের (বিজি-৩৪৮) ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্ট সংলগ্ন টয়লেটের প্যানেলের ভেতর থেকে ১৭ কেজি ওজনের ১৫৩টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়। এগুলোর বাজারমূল্য ৪৬ কোটি টাকা। ওই ঘটনায় বিমানের এক কর্মকর্তার মোবাইল ফোনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে পুলিশ। সন্দেহভাজন হিসেবে তাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। গত ২ জুলাই বিমানের আরেকটি ফ্লাইট থেকে ৪৫ কোটি টাকা দামের সোনার বার উদ্ধার করা হয়। দুটি ঘটনার মধ্যে বেশকিছু মিল পেয়েছে গোয়েন্দারা। সোনা আনার কৌশল, ব্যবহৃত রুট এবং এয়ারলাইনসের মিল তদন্তকে একই চক্রের দিকে ইঙ্গিত করছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে আরও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করছে।

ভয়ংকর নেটওয়ার্কের মধ্যে বাংলাদেশ : সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, আন্তর্জাতিক সোনা চোরাচালান এবং মানব পাচারের ভয়ঙ্কর নেটওয়ার্কের মধ্যে বাংলাদেশ। বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত একটি মেগা সিন্ডিকেট বাংলাদেশের সীমান্ত, আকাশপথ এবং অর্থনীতি ব্যবহার করে তাদের অপরাধের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত দীর্ঘ অনুসন্ধানে চক্রের মূল হোতা বা গডফাদার হিসেবে এমন ১২৩ জন আন্তর্জাতিক অপরাধীকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা দূর দেশে বসে রিমোট কন্ট্রোলের মতো নিয়ন্ত্রণ করছে আকাশের অপরাধ। চক্রটি মূলত ‘সোনা-মানব সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একই রুট, একই হুন্ডি চ্যানেল এবং একই গডফাদারদের সমন্বয়ে একদিকে কয়েকশ কোটি টাকার সোনা দেশে এনে ফের ভারতসহ অন্য দেশে পাচার হচ্ছে। আবার সহজ-সরল মানুষকে ইউরোপ, আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যে লোভনীয় চাকরির অফার দিয়ে পাচার ও জিম্মিও করা হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা শীর্ষ কারবারি ও বাংলাদেশি এজেন্টের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করেছে পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট। তালিকাটি ইন্টারপোলের কাছে পাঠানো হয়েছে। সংস্থাটি তালিকাটি যাচাই-বাছাই করছে। 

তালিকায় বিদেশি কারবারিদের নাম : পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্তরা প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশে সোনা ও মানব পাচার করছে। তাদের বেশিরভাগই দুবাই, নাইজেরিয়া, ঘানা, লিবিয়া, ভারত এবং পাকিস্তানের নাগরিক। দুবাই শহরকে বলা হচ্ছে এই সিন্ডিকেটের ‘কন্ট্রোল রুম’। সেখানে অবস্থান করা পাকিস্তানি, ভারতীয় এবং কয়েকজন পলাতক বাংলাদেশি নাগরিক চক্রের মূল অর্থায়ন নির্ধারণ করছে। সোনা পাচারের চূড়ান্ত গন্তব্য ভারত। পাকিস্তান ও ভারতের বড় বড় সোনা কারবারি ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের অপরাধীরা এই নেটওয়ার্কের অন্যতম পার্টনার। তালিকাভুক্তদের মধ্যে রয়েছে ভারতের মোহাম্মদ আলী, পাকিস্তানের আলী ধার, আব্দুল আউয়াল, রাজিব শুভ্র, পাপ্পু সাজ্জেল, বিপু, আলী আসকর লাবু, জামিল আহমেদ, হংকংয়ের সলি, দুবাইয়ের আসফাক, রশিদ, সেলিম জারদার, লিটন আরহাম, মজিদ. আবু জাফর, ভারতের রূপসাহা, গোপাল বিজন, বিজন হালদার, লক্ষন সেন, গোবিন্দ বাবু, লালু জয়দেব, গওহর প্রসাদ, সঞ্জিব, রামপ্রসাদ, মিন্টু, সুমন চ্যাটার্জী, রিয়াজ, তপন সাহা, ডালিম, মোনায়েম, ফারুক, বসাক চ্যাটার্জী, স্বপন সাহা, আরিফুল ইসলাম প্রমুখ।

দেশি এজেন্টদের তালিকা : আন্তর্জাতিক কারবারিদের সহায়তা করছে বাংলাদেশের এজেন্টরা। তাদের মধ্যে ঢাকার সায়েদাবাদের মোহাম্মদ ওয়ায়েদুজ্জামান দুবাই ও সিঙ্গাপুর গেছেন। তিনি প্রায় সময়ই থাকেন দুবাই। আবদুল আউয়াল নামে এক চোরাকারবারির সঙ্গে শাসক দলের একাধিক নেতার যোগাযোগ। মুন্সীগঞ্জের ফারুক আহম্মেদও থাকেন দুবাই। দীর্ঘদিন ধরে সোনা পাচারে জড়িত দিনাজুপুরের সোহেল রানা। তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে নরসিংদীর মনির আহম্মেদ, নারায়ণগঞ্জের ওয়ায়েদউল্ল­াহ, মিরপুরের সাইফুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জের মঞ্জুর হোসেন, পল্লবীর সামসুল হুদা, মুন্সীগঞ্জের ইসলাম শেখ, রাজবাড়ীর মোহাম্মদ হানিফ, মুন্সীগঞ্জের মোহাম্মদ রুবেল। 

টার্গেট তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর : পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই শাহজালাল, শাহ আমানত ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নানা রকমের অপরাধ কর্মকা- চলে আসছে। কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ধরনের কৌশল নিয়েও কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না। ওই সব বিমানবন্দরে অপরাধ কর্মকা-ের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সোনা পাচার। সম্প্রতি শাহজালালে সোনা পাচার বেড়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই ধরা পড়ছে সোনার চালান। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও এই নিয়ে বিশেষভাবে তদন্ত করেছে। তারা নিশ্চিত হয়েছে বিদেশি এজেন্টদের পাশাপাশি দেশি এজেন্টরা বেশি লাভের আশায় বেপরোয়াভাবে সোনা ও মানব পাচারে জড়িয়ে পড়ছে।

শাহজালালে প্রতিদিন মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়া থেকে আসা বিপুলসংখ্যক ফ্লাইটের যাত্রীদের ভিড়ের সুযোগ নিয়ে ‘খেপ খাটানো’ বাহকদের মাধ্যমে সোনা ও মানব পাচার করা হয়। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করা হয় মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরাসরি আসা সোনা খালাসের জন্য। সমুদ্র উপকূলবর্তী হওয়ায় এই রুট দিয়ে খালাস হওয়া সোনা সহজেই গন্তব্য পাঠানো হচ্ছে। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর মানব পাচারের প্রধান ট্রানজিট হিসেবে বেছে নিয়েছে। বিশেষ করে ভুয়া ভিসায় ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে লোক পাঠানোর নামে মধ্যপ্রাচ্যের কানেক্টিং ফ্লাইটগুলোতে যাত্রী তোলার ক্ষেত্রে এই বিমানবন্দরকে টার্গেট করা হচ্ছে।

বিমান ও বেবিচকের কতিপয় সদস্যদের ইন্ধন : এ প্রসঙ্গে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদেশি চোরাকারবারিরা বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের একাধিক কর্মকর্তা ও সদস্যের সঙ্গে আঁতাত করে এসব অপকর্ম করছে। তারা ঢাকাকেই ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। বিমানবন্দরে তাদের আছে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। আবার তাদের সঙ্গে দহরম-মহরম আছে জুয়েলারি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্তদের। চোরাকারবারিদের রয়েছে প্রভাবশালী রাজনীতিকদের সঙ্গে সখ্যতাও। বিমানের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অভ্যন্তরীণ তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সীমিত প্রবেশাধিকারযুক্ত এলাকায় কীভাবে সোনা পৌঁছাল, কারা সুযোগ করে দিল এবং পেছনে কোন আন্তর্জাতিক চোরাচালান নেটওয়ার্ক, সে বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে।

বিমানবন্দরে সোনা উদ্ধার এবং মামলা : ২০২১-২২ অর্থবছরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ৬৯৮ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৫৫ কেজি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪১৭ কেজি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৯ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। আর চলতি বছরের এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬৩ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের এ পর্যন্ত ৫৪০টি মামলা করা হয়েছে। অন্য একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময়ে ঢাকা কাস্টম হাউজ থেকে ৮০৫টি ফৌজদারি মামলা করা হয়। এর মধ্যে ২০১৩ সালে ২৭টি, ২০১৪ সালে ১২০টি, ২০১৫ সালে ৯৩টি, ২০১৬ সালে ৫০টি, ২০১৭ সালে ৬২টি, ২০১৮ সালে ১১০টি, ২০১৯ সালে ৭৭টি, ২০২০ সালে ৩২টি, ২০২১ সালে ১০৫টি ও ২০২২ সালে ১২৯টি মামলা রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত