স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলের প্রশ্রয়ে বেপরোয়া

পুলিশ কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল কাফীর প্রথম পোস্টিং ছিল রাজধানীর ধানমন্ডিতে। এই অভিজাত এলাকায়ই ছিল সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের বাসা। কর্মসূত্রে ঘনিষ্ঠতা হয় মন্ত্রীপুত্র শাফি মোদাচ্ছের খান জ্যোতির সঙ্গে। আগে থেকেই ছাত্রলীগের ছাপ্পর থাকায় আর পিছু ফিরতে হয়নি কাফীকে। তরতর করে পদোন্নতি পান। সিঁড়ি বেয়ে উঠে যান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে। সব শেষ পোস্টিং ছিল ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস)।

বিরুদ্ধমত তো বটেই, মন্ত্রীপুত্রের ছোঁয়া থাকায় গ্রাহ্য করতেন না সিনিয়র কর্মকর্তাদেরও। এ বেপরোয়াপনাই কাল হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন গত ৫ আগস্ট ঢাকার আশুলিয়ায় ছাত্র-জনতাকে হত্যার পর আগুনে পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় কাফীর সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ উঠেছে বেশ জোরেশোরে। পুলিশের দাপুটে এ কর্মকর্তাকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। দেশ ছাড়ার জন্য হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে গেলে গত সোমবার রাতে তাকে আটক করা হয়। কাফীকে কেন প্যাডেলচালিত ভ্যানে লাশের স্তূপ এবং তা পুড়িয়ে ফেলায় অভিযুক্ত করা হচ্ছে জানতে চাইলে পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, কারণ কাফী ছিলেন ঢাকার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি)। আর লাশের স্তূপের ঘটনাটি আশুলিয়ায়, যা ঢাকা জেলা পুলিশের আওতাধীন। ওই এলাকার দায়িত্ব ছিল কাফীর ওপর। তার নির্দেশ ছাড়া পুলিশ লাশের স্তূপ করতে পারে না। গত ৫ আগস্ট সকালেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপরই বেলা ৩টার দিকে আশুলিয়ায় ঘটে এ ঘটনা। সেদিন আশুলিয়া থানা পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দলও  ছিল সেখানে। দায়িত্বরত কর্মকর্তা হিসেবে আবদুল্লাহিল কাফীকেই নির্দেশ দিতে হবে। তার নির্দেশেই গুলি চালানো এবং মৃতদেহগুলো পোড়ানো হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের পোশাকধারী দুই সদস্যকে একটি ভ্যানে লাশের স্তূপের ওপর আরও লাশ রাখতে দেখা যায়। শুরুতে ওই ভিডিওর দৃশ্যের স্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও পরে নিশ্চিত হওয়া যায় এটি আশুলিয়া থানার সামনের ঘটনা।

গতকাল মঙ্গলবার এ রিপোর্ট লেখার সময় পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে রাখা হয়েছে কাফীকে। ডিবি হেফাজতে তার কাছে জানতে চাওয়া হয় আওয়ামী লীগ সরকার পদত্যাগ করার পরও কার প্ররোচনায় তিনি গুলি করার জন্য অন্য পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছেন? এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এ কর্মকর্তা। প্রশ্নের জবাবে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তখন তাকে পাল্টা প্রশ্ন করা হয়, তিনি যদি অপরাধ না-ই করতেন, তাহলে কেন দেশত্যাগ করার জন্য বিমানবন্দরে গেলেন?

ডিবির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (উত্তর) মো. রবিউল হোসেন ভূঁইয়া জানান, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৯ ব্যাচের কর্মকর্তা কাফীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে। আশুলিয়ায় পুলিশের গাড়িতে নিহতদের মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলেই গ্রেপ্তার দেখানো হবে।

আশুলিয়ার ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করার কথা জানান ঢাকা জেলার এসপি আহম্মদ মুঈদ। তিনি বলেন, ‘ছাত্র-জনতাকে হত্যার পর আগুনে পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগে আবদুল্লাহিল কাফী সাসপেক্ট।’

জানা গেছে, ১৯৮৫ সালে আবদুল্লাহিল কাফী সিরাজগঞ্জ সদর থানায় জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবন শেষে ২০১১ সালের আগস্ট মাসে ২৯তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে যোগদান করেন। ১৪ বছরের চাকরির জীবনে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), ঢাকা জেলা পুলিশে কর্মরত ছিলেন। চাকরিজীবনে তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন বলেও জানা যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা জেলার সাভার সার্কেলের পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকা জেলার সাভার সার্কেলে দীর্ঘদিন কাজ করার সুবাদে কাফী বেশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। তার পেছনে রাগববোয়ালরা রয়েছেন। তিনি একসময়ে ছাত্রলীগ করতেন, এর দোহাই দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। পুলিশের বিভিন্ন প্রোগ্রামে তিনি ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে বক্তব্য দিয়েছেন। তবে সহকর্মীদের প্রতি তিনি নমনীয় ছিলেন।

ডিএমপির রমনা বিভাগের ধানমন্ডি শাখার সহকারী পুলিশ সুপার (এসি) থাকাকালেই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন কাফী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ধানমন্ডি শাখার পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের ছেলের বন্ধু হওয়ার সুযোগে তিনি ওই সময়ে নানা অন্যায় কাজে জড়িয়ে পড়েন। এ কারণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তাকে কিছু বলতেন না। এ ছাড়া রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের প্রশ্রয় পেতেন।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার রেজাউল করিম মল্লিক জানান, আবদুল্লাহিল কাফীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে লাশ পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগে আশুলিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা এবং হাজারীবাগ থানায় একটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডের আবেদন করবে পুলিশ।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওইদিন আশুলিয়া থানায় অবস্থানরত ঢাকা উত্তর ডিবির পরিদর্শক (তদন্ত) আরাফাত হোসেন ও এসআই মো. রকিবুল, মালেক, আবুল হাসান, হামিদুর রহমান, নাসির উদ্দিন, আবদুল মালেক, জলিল এবং এএসআই সুমন চন্দ্র গাইন বিক্ষোভকারী ছাত্র-জনতার উদ্দেশে গুলি ছোড়েন। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ইতিমধ্যে আটক করা হয়েছে। তারা এ সম্পর্কে নানা তথ্য দিচ্ছেন।

পুলিশের এমন অপরাধের বিষয়ে জানতে চাইলে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ তাদের চেইন অব কমান্ডে চলে। সিনিয়র কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় পরিদর্শক, এসআই, এএসআই ও কনস্টেবলরা গুলি করেছেন এবং নিহতদের লাশগুলো সরিয়ে ফেলার জন্য ভ্যানে ওঠানো হয়েছে। এখানে যিনি এ নির্দেশনা দিয়েছেন, তিনি অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া অতীব জরুরি।’