পাকিস্তানে বাংলায় লেখা রূপকথা

জয়ের স্মারক সামনে রেখে দলের সবাই মিলে ছবি তোলার সময় নাজমুল হোসেন শান্ত এমন জোরে বিজয়োল্লাস করলেন যে তার ঠিক সামনেই হাঁটু গেড়ে বসা শরিফুল ইসলামের কানে তালা লেগে গেল! আনন্দে জোর গলায় উল্লাস করতেই পারেন বাংলাদেশের অধিনায়ক। পাকিস্তানের বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে সংবাদ সম্মেলনে তাকে দুই দলের অতীত ইতিহাস মনে করিয়ে দিয়েছিলেন একজন সাংবাদিক। এক ডজন হারের বিপরীতে ০ জয়। জবাবে শান্ত বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি, এটা শুধুই রেকর্ড। রেকর্ড বদলাতেই পারে।’

সেই রেকর্ডটা বদলে দিয়েছে শান্তর বাংলাদেশ, পাকিস্তানকে তাদেরই মাটিতে দুই টেস্টের সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করে। রাওয়ালপিন্ডিতে পঞ্চম দিনের খেলায় বৃষ্টির শঙ্কা থাকলেও সকাল থেকে আবহাওয়া খানিকটা মেঘলা ছিল, তবে বৃষ্টি নামেনি। ৪ উইকেট হারিয়ে মধ্যাহ্ন বিরতির খানিকটা পরেই বাংলাদেশ পৌঁছে গেছে ১৮৫ রানে, আবরার আহমেদের বলে সাকিব আল হাসানের কভার দিয়ে মারা বাউন্ডারিতেই নিশ্চিত হয়েছে সিরিজ জয়।

শান্তর হাসিমুখ দেখতে দেখতে মনে ভেসে উঠল মাস দুয়েক আগের একটা ছবি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার এইটে আফগানিস্তানের কাছে হারের পর সংবাদ সম্মেলনে এসে জাতির কাছে ক্ষমা চাইলেন শান্ত। সেন্ট ভিনসেন্ট থেকে ইসলামাবাদ, এর ভেতর পার্থক্যটা কোথায়? খুব সম্ভবত রাষ্ট্রব্যবস্থায়। যদিও নৈর্ব্যক্তিক চোখে দেশের প্রধানমন্ত্রী আর ক্রিকেট বোর্ডের প্রধানের পরিবর্তনের সঙ্গে মাঠের খেলায় কোনো প্রভাব পড়ার কথা নয়। কিন্তু বাংলাদেশে ক্রিকেট শুধুই একটা খেলা নয়, রাজনৈতিক অস্ত্রও বটে। এদেশে ক্রিকেট খেলে রাজনীতি না করেই সাংসদ হওয়া যায়, ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান থেকে ক্রীড়ামন্ত্রী হওয়া যায়। অধিনায়ক হিসেবে অদৃশ্য অনেক চাপই হয়তো শৃঙ্খলিত করে রাখত শান্তকে, মেনে নিতে হতো অনেক অন্যায় অনুরোধ। সেই অদৃশ্য চাপগুলো সরে যাওয়াতেই কি এই জয়ের হাসি? উত্তরটা কখনো জ্যামিতির উপপাদ্যের মতো প্রমাণ করা হয়তো যাবে না, তবে উত্তাল জুলাই জুড়ে চলা স্বৈরাচার হটানোর আন্দোলনে ক্রিকেটারদের বড় একটা অংশের সমর্থনই প্রমাণ করে, অদৃশ্য শেকল ছিল তাদের পায়ে। পাকিস্তানের বিপক্ষে দুটো ম্যাচেই তারা খেলেছেন শেকলমুক্তির আনন্দ নিয়ে, নিজেদের সামর্থ্যরে ওপর অগাধ বিশ্বাস রেখে। যার সম্মিলিত ফসল এই ঐতিহাসিক জয়।

১৮৫ রানের লক্ষ্যে পৌঁছাতে নেই কারও হাফসেঞ্চুরি। কেউ অল্প রানেই আউট হয়েছেন সেটাও বলার উপায় নেই। ছোট ছোট সব আক্ষেপ হারিয়ে গেছে বড় প্রাপ্তির ঢেউয়ে। যেমন জাকির হাসান ৪০ রান করে বোল্ড হয়ে গেলেন মির হামজার বলে, রীতিমতো পরিকল্পনা করে তার উইকেটটা নিতে হয়েছে এই বামহাতি পেসারকে। সাদমান ইসলাম ভালোই খেলছিলেন, ২৪ রানে ড্রাইভ করতে গিয়ে মিডঅফে ক্যাচ তুলে দিয়েছেন। ৭১ বলে ৩৪ রান করে মুমিনুল হকের আউটটা তো আরও আত্মঘাতী। ততক্ষণে পাকিস্তানের পেসারদের দম ফুরিয়েছে, লেগস্পিনার আবরার আহমেদের বলে আচমকাই উড়িয়ে মারতে গিয়ে ক্যাচ দিয়েছেন। শান্তকেই বরং খানিকটা দুর্ভাগা বলা যায়, ফরোয়ার্ড ডিফেন্সিভ শট খেলতে গিয়ে ব্যাটের ভেতরের কানায় লাগা বলটা একটু উঠে যায়, ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে ভালো ক্যাচ নিয়েছেন আব্দুল্লাহ শফিক। যদিও ৩৮ রানের ইনিংসটাই পাকিস্তান সফরে শান্তর সেরা, বাকি দুটো ইনিংসে করেছিলেন ১৬ এবং ৪ রান। ব্যাটিংয়ের ঘাটতিটা শান্ত পুষিয়ে দিয়েছেন অধিনায়কত্ব দিয়ে। ফিল্ড প্লেসমেন্ট, বোলিং চেঞ্জ এবং ম্যান ম্যানেজমেন্ট, সব জায়গাতেই শান্ত দারুণ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়ে গেছেন, যে জায়গাটায় তার প্রতিপক্ষ শান মাসুদ ব্যর্থ হয়েছেন নিদারুণ ভাবে।

শেষ দিনে বৃষ্টির আশঙ্কা ভুলিয়ে যখন সময়মতোই খেলা শুরু হলো, তখন পাকিস্তানের ধারাভাষ্যকারদের অনেকেই মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন ১৯৯৩ সালের হ্যামিলটন টেস্টের কথা। যে ম্যাচে চতুর্থ ইনিংসে নিউজিল্যান্ডকে জয়ের জন্য মাত্র ১২৭ রান করতে হতো, অথচ কিউইরা ম্যাচটা হেরে যায় ৩৩ রানে। ওয়াসিম আকরাম-ওয়াকার ইউনুস ৫টা করে উইকেট নিয়ে নিউজিল্যান্ডকে অলআউট করে দেন ৯৩ রানে। তবে আমির সোহেল-বাজিদ খানরা বোধহয় ভুলে গিয়েছিলেন, সেই পাকিস্তান আর এখনকার পাকিস্তান এক নয়। মোহাম্মদ আলি শুধু বোলিংয়ের সময় বিরক্তিকর শব্দই উৎপাদন করতে পারেন, এই পেসে এমন উইকেটে মাথা কুটে মরলেও কেবলমাত্র ব্যাটসম্যানের ভুলেই সাফল্য পাওয়া সম্ভব। মির হামজা ততক্ষণই ভালো, যতক্ষণ বলটা চকচকে। বলের চমক ফুরালে তারও চমক ফুরায়।

জয়ের ক্যানভাসে তুলির শেষ টানটা দিয়েছেন সাকিব। সাংসদ পদ গেছে, খুনের মামলাও হয়েছে, দেশে ফিরলে আইনি সমস্যার মুখেও পড়তে পারেন। কিন্তু ক্রিকেট মাঠে এ সবই সাকিবের কাছে তুচ্ছ। উত্তাল আন্দোলনের দিনগুলোতে ফেসবুকে কোনো স্ট্যাটাস কেন দেননি সাকিব, কেন তারুণ্যের আইকন হয়েও তাদের পাশে দাঁড়াননি; এসব নিয়ে ব্যক্তি সাকিব কিংবা রাজনীতিবিদ সাকিবের সমালোচনা হতেই পারে। তবে ক্রিকেটার হিসেবে সাকিব যে অন্য পর্যায়ের, সেটা প্রমাণ করলেন আরও একবার। ৪১ বলে ২১ রানের ছোট কিন্তু কার্যকর একটা ইনিংস খেলেছেন, মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে ৩২* রানের ছোট্ট একটা জুটি গড়েছেন। মমিনুল আউট হয়ে যাওয়ার পর ক্রিজে এসে অহেতুক শট খেলে নিজের সামর্থ্য জানান দেওয়ার প্রচেষ্টায় যাননি, সাবধানী ব্যাটিংয়ে আরেকটা উইকেট পতনের আনন্দে পাকিস্তানের মনোবলটা বাড়িয়ে দেননি। আবরারকে একটা ছক্কা মেরে সোজা সাইটস্ক্রিনে আছড়ে ফেলে চড়ে বসতে দেননি, শেষ চারটাও মেরেছেন আবরারের বলেই। অফস্টাম্পের বেশ বাইরে করা আলগা বলে সপাটে ব্যাট চালিয়ে জয় নিশ্চিত করেছেন, সেই সঙ্গে যেন বুঝিয়েও দিয়েছেন স্রেফ নামকাওয়াস্তে কোনো লেগস্পিনার খেলানো সিদ্ধান্তটাও সঠিক হয়নি পাকিস্তানের।

পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করার পর বাংলাদেশের পরবর্তী গন্তব্য ভারত। শান্ত পাকিস্তানের মাটিতেই বলেছেন, ‘পরের সিরিজটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ আর এই জয় আমাদের অনেক আত্মবিশ্বাস দেবে।’ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের বেহাল দশা দেখে নিশ্চয়ই ছক কষতে শুরু করেছেন গৌতম গম্ভীর।

ভিনদেশি শক্তি, ছদ্মবেশী রাজনৈতিক শক্তি-ছাত্র-জনতার বিপ্লবের আড়ালের কুশীলব হিসেবে অনেকেই অনেক অস্তিত্ব খুঁজে পেলেও স্বৈরাচার বিতাড়নের মূল কৃতিত্ব রাজপথে নেমে আসা অকুতোভয় তারুণ্যের। তেমনি বাংলাদেশেরও পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জয়ের মূল শক্তি তরুণ পেসাররা। শরিফুল ইসলাম, নাহিদ রানা, হাসান মাহমুদরা। এই তরুণরাই সাহস জোগায়, স্বপ্ন দেখায় আগামীর। তাই অসম্ভবও হয়ে ওঠে ঘোর বাস্তব।