হকি অঙ্গনকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন ফজলু ওস্তাদ

হকিই ছিল তার ধ্যান জ্ঞান। তৃণমূল থেকে হকি খেলোয়াড় তুলে আনা ছিল নেশা। নিঃস্বার্থভাবে হকির জন্য পুরো জীবনটাই বিলিয়ে দিয়েছিলেন। নিজের শরীরের যত্নের কথা ভাবেননি। চরম আর্থিক সঙ্কটের মধ্যেও হকি নিয়েই থাকতেন। পুরোনো ঢাকার আরমানিটোলায় খেলাটা শিখিয়ে যৎসামান্য উপার্জন করতেন, সেটাও ব্যয় করতেন হকির পেছনে। তাই তো সাবেক হকি খেলোয়াড় মো. ফজলুল হোসেন এক সময় পরিচিতি পেয়ে যান ফজলু ওস্তাদ নামে। যার হাত ধরে দেশ পেয়েছে অনেক বড় বড় হকি তারকা। সেই মানুষটাই বুধবার সকালে হকি অঙ্গনকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

বুধবার সকালে নিজ বাসার বারান্দায় মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারান ফজলু ওস্তাদ। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে ততক্ষণে সব শেষে। মৃত্যুর বিষয়টি ফোনের ওপাশে কান্না জড়িত কণ্ঠে ফজলুর শিষ্য এবং দেশের অন্যতম সফল হকি আম্পায়ার সেলিম লাকী নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ফজলু ওস্তাদ, আমাদের সবাইকে এতিম করে দিয়ে চলে গেলেন ভাই। এই মৃত্যু কিভাবে মেনে নেই বলেন? গতকাল বিকেল থেকে অনেক রাত পর্যন্ত এক সঙ্গে ছিলাম। ওস্তাদ খানিকটা অসুস্থ ছিলেন। আর রাজনৈতিক পালাবদলের ঘটনায় অনেকটাই ভেঙে পড়েছিলেন। আমি তার বাসায় গিয়ে কাল বিকেলে মাঠে নিয়ে আসি। ওস্তাদের অ্যাকাডেমি নিয়ে স্থানীয়রা মিলে অনেক আলোচনা করি। ছবিও তুলেছিলাম। সেই ওস্তাদই আজ সকালে পাকাপাকি ছবি হয়ে গেলেন।’

ফজলু ওস্তাদ ছিলেন ভীষণ সাদাসিদে মানুষ। সদাহাস্যজ্বল ফজলু ছিলেন হকি অঙ্গনে অজাতশত্রু। তার হাতে গড়া সাবেক হকি তারকা রফিকুল ইসলাম কামালের কাছ থেকেই শোনা গেলো দেশের হকিতে ফজলুর নিবেদনের কথা, ‘ফজলু ওস্তাদ নিঃস্বার্থভাবে হকি শেখাতেন। তার মতো আর কেউ নেই। আর হবেও না। পুরান ঢাকার অনেকেই তার কাছ থেকে শিখে বিকেএসপিতে ভর্তি হয়েছে। আবার কেউ লিগে খেলে জাতীয় দলে এসেছে।’

চোখে মারাত্মক চোট পায় অল্প বয়সেই খেলোয়াড়ী জীবনে ইতি টানতে হয়েছিল ফজলুকে। ফর্মের চূড়ায় ছিলেন তিনি। প্রথম বিভাগ হকিতে শিরোপা জয়ী সাধারণ বিমার খেলোয়াড় ছিলেন। সেটি ১৯৮৪ সালের কথা। মালয়েশিয়ায় জুনিয়র বিশ্বকাপগামী দলে সুযোগ পাওয়ার তার একপ্রকার চূড়ান্তই ছিল। কিন্তু কি থেকে কি হয়ে গেল নিমিষেই। চোখে মারাত্মক এক আঘাত পেলেন। জুনিয়র জাতীয় দলের প্রাথমিক ক্যাম্পের চৌকাঠেই অপমৃত্যু ঘটলো ফজলুর হকি ক্যারিয়ারে। তবে দমে থাকেননি তিনি। খেলোয়াড়ী জীবনের ইতি টেনে তিনি মনোনিবেশ করেন খেলোয়াড় গড়ায়। নিজের না পাড়ার দুঃখ ঘোচাতে পুরানার ঢাকার তরুণ নেমে পড়লেন খেলোয়াড় তৈরির সংগ্রামে। নিভৃতে হকি খেলোয়াড় গড়তে গড়তেই একদিন হয়ে উঠলেন ওস্তাদ ফজলু। রফিকুল ইসলাম কালাম, মাকসুদ আলম হাবুল, রাসেল মাহমুদ জিমি, হালের নাঈম-আরশাদদের মতো তারকাদের আবিস্কার করে দেখিয়েছেন শীর্ষ ছোঁয়ার স্বপ্ন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আরমানিটোলা হাইস্কুলের মাঠে শিশুদের হাতে ধরে শিখিয়ে গেছেন হকি। সাহেব বাজারের নাবালক মিয়া লেনের এই বাসিন্দা বাড়ি বাড়ি থেকে বাচ্চাদের ধরে এনে হকি স্ট্রিক হাতে তুলে দেন। এরপর তাদের হকির আসল বেসিক শেখানো তো বটেই, খেলাটার প্রতি বুনে দেন ভালোবাসর বীজ। তার হাতে হকি শিখে নিয়মিত বিকেএসপি, জাতীয় দলের দরজা তো খুলছে আবেদ, প্রিন্স লাল, মহসীনরা। কত জনের জীবন চাকাও ঘুরে যাচ্ছে তাতে।

এক সময় পথে পথে চা বিক্রি করে কাটানো বাচ্চু গাজী ও সোহাগ গাজীকে ধরে এনে হকি শিখিয়েছেন। সেই দুই ভাই এরপর খেলোয়াড় কোটায় চাকরি পেয়ে যান বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে।

শেখানোর কাজটা দ্বিতীয় শ্রেণির বাচ্চাদের থেকে শুরু করতেন ফজলু। বেশিরভাগই গরীব ঘরের ছেলেরাই আসতো তার কাছে হকির দীক্ষা নিতে। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। কিন্তু অধিকাংশেরই স্ট্রিক-বুটসহ অন্যান্য সরঞ্জাম কেনার সাধ্য থাকে না। সে দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নিতেন তিনি। সাহেব বাজারের পুরোনো জিনিস পত্রের দোকান থেকে সংগ্রহ করতেন বুট সহ অন্যান্য সরঞ্জাম।

বিনা পারিশ্রমিকেই নিরলশ কোচিং করিয়ে যাওয়া মানুষটি আর নেই। হকির জন্য এ এক বড় আঘাত। এমনিতেই নের্তৃত্বহীণতায় ধুকছে খেলাটি। এর মধ্যে খেলোয়াড় গড়ার অন্যতম কারিগরের বিদায়ে সঙ্কট চরমে পৌঁছুবে হকির। আর হাজারো মানুষের প্রিয় ফজলু ওস্তাদকে হারিয়ে দিশেহারা স্ত্রী সালমা ইসলাম ও একমাত্র মেয়ে নাদিয়া ইসলাম।