খুচরায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ভোক্তা পর্যায়ে ভ্যাট আদায়ে আশানুরূপ সাফল্য না পাওয়া ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) ব্যবস্থা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। খুচরা ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহ, এনবিআর কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা ছাড়াও নানা জটিলতায় দুই বছরেরও কম সময়ে প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। ফলে ইএফডির বিকল্প খুঁজে বের করতে নির্দেশনা দিয়েছেন এনবিআরের নতুন চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।
প্রায় ৫ বছর আলোচনা, পাইলট প্রকল্পের পর ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে খুচরা ব্যবসায় ইএফডি যন্ত্র বসাতে জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে এনবিআর। লক্ষ্য ছিল প্রায় ২৫ ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ ও সঠিকভাবে ভ্যাট আদায় করা। তবে এক বছরে ইএফডি যন্ত্র বসিয়ে আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। তবে ভ্যাট ফাঁকি রোধে নতুন এ প্রযুক্তি স্থাপনে এনবিআর ও জেনেক্স ইনফোসিস একে অন্যকে দোষছে।
ইএফডি পরিচালনা প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছাচারিতা, শর্ত লঙ্ঘন ও অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত জুনের মধ্যে ৩০ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ইএফডি ইনস্টল করার কথা থাকলেও দায়িত্বে থাকা জেনেক্স ইনফোসিস নির্ধারিত সময়ে মাত্র ১১ হাজার স্থাপন করতে পেরেছে।
অন্যদিকে গত ১৩ আগস্ট এনবিআর কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা, বিল বুঝে না পাওয়া, মার্কিন ডলারের দর বৃদ্ধি ও ব্যাংকের ঋণপত্র (এলসি) খোলায় জটিলতাসহ নানা অভিযোগ তুলে অর্থ উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়েছে জেনেক্স ইনফোসিস। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী শাহ জালাল উদ্দিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, এই উদ্ভাবনী ও প্রযুক্তিগত উদ্যোগের আশানুরূপ সুফল মিলছে না। কতিপয় খুচরা ব্যবসায়ী- এনবিআরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ও আন্তরিকতার অভাবে এই প্রকল্প কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রকল্প গ্রহণের সময় থেকে বর্তমানে মুদ্রার মানে যথেষ্ট পরিবর্তন হয়েছে। দরপত্র জমা দেওয়ার সময় ডলারের দর ছিল ৮৫ দশমিক ৮৬ টাকা। বর্তমানে এই দর গিয়ে ঠেকেছে ১২০ টাকায়। বর্তমান অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ব্যাংকগুলো থেকে এলসি খোলায় জটিলতা দেখা দিয়েছে। এতে ডিভাইস আমদানির লক্ষ্যমাত্রাকে জটিল করে তুলেছে।
চিঠিতে জেনেক্স জানায়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও এনবিআর কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে তারা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে ইএফডি ডিভাইস। এসব কাজে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯৪ কোটি টাকা। তবে এই বিলের টাকা এখনো বুঝে পায়নি তারা।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীর বায়তুল মোকাররম, বসুন্ধরা সিটি, মৌচাক, বেইলি রোডের কিছু দোকানে ইএফডি যন্ত্র থাকলেও, দোকানিরা তা ব্যবহার করেন না। জনপ্রিয় করতে ইএফডি কূপনের ওপর লটারির ব্যবস্থা করে এনবিআর, তবে সেই লটারিতেও আগ্রহ ছিল না ক্রেতাদের।
এ বিষয়ে ভ্যাট বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, লটারিতে তেমন কোনো সাড়া না পাওয়ায় চলতি মাস থেকে ইএফডি লটারি বন্ধ হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ১৩টি লটারি হয়েছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরস্কারের জন্য কোনো বিজয়ী পাওয়া যায়নি। কেউ চালান কপি সঙ্গে রাখেন না, দোকানিরাও এটা ব্যবহার করেন না। এই লটারির টাকাটা দোকানিকে দিলে বরং তারা উদ্বুদ্ধ হতো এবং ইএফডি ব্যবহার করত।
২০২১ সালে ৫ ফেব্রুয়ারি ইএফডি ব্যবহার করে খুচরা কেনাকাটায় ভ্যাট পরিশোধকারী ক্রেতাকে পুরস্কার দেওয়ার লটারির প্রথম ড্র হয়।
ভ্যাট খাতে আমূল পরিবর্তন নিশ্চিত করা এবং ফাঁকি রোধে ২০১৯ সালের আগস্টে পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পাঁচটি ভ্যাট কমিশনারেটে ইএফডি চালু করে এনবিআর। প্রথমে বিনামূল্যে দিলেও ব্যবসায়ীদের ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে যন্ত্রটি ২০ হাজার ৫৩৩ টাকায় কিনতে বলে এনবিআর। সে সময় কোনো ব্যবসায়ী যন্ত্রটি কিনতে আগ্রহ দেখাননি।
২০২২ সালের চুক্তির আওতায় কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট-এর পাঁচটি কমিশনারেট-এর আওতাধীন এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইএফডি ও এসডিসি সরবরাহ, সংস্থাপন ও মনিটরিংয়ের কাজ করার কথা জেনেক্স ইনফোসেসর।
জেনেক্স জানায়, প্রকল্পের সাথে চারটি টিম জড়িত (IVAS++ IBAS++ এনবিআর ও জেনেক্স)। যেহেতু এটি দেশে অপেক্ষাকৃত নতুন প্রযুক্তি, সেহেতু এর সিস্টেমে কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট সব টিমের মধ্যস্থতায় এর সমাধান করতে হয়। এতে অনেক সময় ও জটিলতা তৈরি হয়। সম্পূর্ণ সিস্টেমের দায়িত্ব এনবিআর-এর তত্ত্বাবধানে, জেনেক্সে ওপর অর্পিত হলে তা অনেক বাস্তবসম্মত ও সহজ হবে।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করে ইএফডি যন্ত্রের বিকল্প চিন্তা করার নির্দেশনা দিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান। এ ছাড়া ভ্যাট উইংয়ে কীভাবে আরও বেশি অটোমেশন করা যায় তার রূপরেখা বের করারও তাগিদ দিয়েছেন।