বিক্ষোভে বন্ধ ১৬৭ কারখানা আজ খোলা রাখার ঘোষণা

দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে ‘শ্রমিকদের’ অসন্তোষ অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন দাবিতে আগের কয়েক দিনের ধারাবাহিকতায় গতকাল বুধবারও গাজীপুরের বেশ কয়েকটি জায়গায় পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এ সময় উত্তেজিত শ্রমিকরা কয়েকটি কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ভাঙচুরও করেন। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে গতকাল গাজীপুরের মোট ৬০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ারও কয়েকটি জায়গায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা আশপাশের কারখানাগুলোতে ভাঙচুরের চেষ্টা চালালে নিরাপত্তার স্বার্থে অন্তত ৬০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।

এমন পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাকশিল্প ঘিরে অসন্তোষ দমনে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার কথা জানিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে চলমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে আলোচনা শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর এমন বার্তা দেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা হাসান আরিফ এবং শ্রম উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। চলমান এই বিক্ষোভের সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকরা নয়, বহিরাগতরা জড়িত বলেও দাবি করেন তারা।

হাসান আরিফ বলেন, ‘চারদিকে যে শ্রমিক অসন্তোষ হচ্ছে, বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। এসব বিশৃঙ্খলা শ্রমিকরা করছেন না। যারা করছেন তাদের অধিকাংশই বহিরাগত। দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে আমাদের কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

আর শ্রম উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেন, গার্মেন্টস শিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী লোক জড়িত বলে তারা জানতে পেরেছেন। এ বিষয়ে বিএনপির উচ্চ মহলে কথা বলা হবে, যাতে তারা তাদের লোকজনকে নিবৃত্ত রাখেন।

আসিফ আরও বলেন, ‘আজ থেকেই সরকার কঠোর অবস্থানে যাবে। খুব দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’

গাজীপুরে বিক্ষোভ-ভাঙচুর, ৬০ কারখানা ছুটি ঘোষণা : চাকরি পুনর্বহালসহ বিভিন্ন দাবিতে গাজীপুরের বেশ কয়েকটি স্থানে গতকাল পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন। শ্রমিকদের অবরোধের কারণে সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। এ সময় উত্তেজিত শ্রমিকরা নগরীর চান্দনা চৌরাস্তা, চৌধুরী বাড়ি, ভোগড়া বাইপাস, ছয়দানা হারিকেন, কাশিমপুর ও টঙ্গীতে বেশ কয়েকটি কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ভাঙচুর করে। গতকাল সকালে টঙ্গী, চান্দনা চৌরাস্তা, সাইনবোর্ড, জিরানি বাজার, কোনাবাড়ী, বাসন, বাঘেরবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে গাজীপুরে মোট ৬০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয় বলে জানিয়েছেন গাজীপুর শিল্পপুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইমরান আহম্মেদ।

গাজীপুর মহানগরীর চান্দনা চৌরাস্তা ও আশপাশের কিছু এলাকায় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ‘বেকার সংগঠন’-এর ব্যানারে বিক্ষোভ শুরু হয়। এই বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন কারখানা লক্ষ্য করে  ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় হামলাকারীদের প্রতিহত করতে কারখানার শ্রমিকরা তাদের কারখানার সামনে অবস্থান নেন। এতে বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারী শ্রমিকরা পিছু হটেন। আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন শিল্পপুলিশের সদস্যরা। এরপর আন্দোলনকারীরা সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন।

এ ছাড়া সকাল সাড়ে ৮টা থেকে নগরীর সাইনবোর্ড, জিরানি বাজার, কোনাবাড়ী ও সদর উপজেলার বেশ কিছু স্থানে শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় তারা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন। পরে ১১টার দিকে তারা সড়ক থেকে সরে যান।

গাজীপুর শিল্পপুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইমরান আহম্মেদ জানান, বিক্ষোভ চলাকালে টঙ্গীতে ইস্টওয়েস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, কাশিমপুরে গ্রামীণ টেক্স, ডরিন গার্মেন্টস ও নরভান গার্মেন্টস কারখানায় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ভাঙচুর চালান।

সাভার-আশুলিয়ায় অবরোধ-বিক্ষোভ : আশুলিয়া সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। সকালে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের বাইপাইল এলাকায় মহাসড়কের দুই পাশ অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পাল গার্মেন্টসের শ্রমিকরা। তারা ১০ দফা দাবি আদায়ে প্রায় দুই ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখলে মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে শিল্পপুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা শ্রমিকদের বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিলে ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

শিল্পপুলিশ জানায়, সকালে শ্রমিকরা কারখানায় গেলেও কাজ না করে কিছু কিছু কারখানায় সমানুপাতিক হারে নারী ও পুরুষ শ্রমিক নিয়োগ, স্টাফ কর্র্তৃক শ্রমিক নির্যাতন বন্ধ, অন্যায়ভাবে শ্রমিকদের চাকরিচ্যুতি বন্ধ, টিফিন এবং নাইট বিল বাড়ানোসহ নানা দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে। এতে একের পর এক কারখানা ছুটি দিতে বাধ্য হয় কর্র্তৃপক্ষ। সে সব কারখানার কর্মীরা বের হয়ে অন্য কারখানার সামনে বিক্ষোভ ও ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করেন। এরপর অন্য কারখানাগুলোতেও ছুটি ঘোষণা করেন কর্র্তৃপক্ষ।

অন্যদিকে আশুলিয়ার বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কের বাইপাইল থেকে জিরাবো এলাকা পর্যন্ত বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা সকালে কারখানায় প্রবেশ করলেও কাজ না করে বিভিন্ন দাবি আদায়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে কর্র্তৃপক্ষ একে একে কারখানাগুলোতে ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হন। ছুটি ঘোষণার পর ওইসব কারখানার শ্রমিকরা বাইরে বেরিয়ে পাশের অন্যান্য কারখানার সামনে গিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনসহ ভাঙচুরের চেষ্টা করেন।

শিল্পপুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মো. সারোয়ার আলম বলেন, ‘শ্রমিকদের বিক্ষোভের মুখে হা-মীম, শারমীনসহ অন্তত ৬০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেন কর্র্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন শিল্পপুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যরা।’

কঠোর হচ্ছে যৌথবাহিনী, গ্রেপ্তার করবে সেনাবাহিনীও : সাভারের আশুলিয়া, জিরাবো ও গাজীপুরের কিছু এলাকায় বহিরাগতরা কারখানাগুলোতে হামলা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়ায় আজ বৃহস্পতিবার থেকে দেশের সব পোশাক কারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।

গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান বিজিএমইএ সভাপতি খন্দকার রফিকুল ইসলাম। কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তায় আজ থেকে যৌথবাহিনী কঠোর অবস্থানে যাবে। বিজিএমইএ, গার্মেন্টস মালিক, সেনাবাহিনী, পুলিশ, শিল্পপুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আজ আশুলিয়া, জিরাবো ও গাজীপুরের কিছু অঞ্চলে ১৬৭টি কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ গ্যারান্টি দিয়েছে। যদিও এ আন্দোলনে শ্রমিকদের সংশ্লিষ্টতা ছিল না। বহিরাগতদের হামলায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। তাই সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কারখানার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়ায় গার্মেন্টস চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মালিকরা।’

বিজিএমইএর সহসভাপতি আবদুল্লাহ হিল রাকিব বলেন, ‘বিক্ষোভ শুধু তৈরি পোশাক নয়, অন্যান্য শিল্পেও ছড়িয়ে পড়েছে। শিল্পকারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিতে শিল্পপুলিশ মূল ভূমিকা রেখে থাকে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনায় তারা বিপর্যস্ত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরোপুরি কার্যকর নয়। এ সুযোগে সবাই সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এতদিন সেনাবাহিনীর কাছে গ্রেপ্তারের আদেশ ছিল না। এখন থেকে তারাও গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা করবেন। যারা ব্যক্তি আক্রমণ করছে তাদের শ্রমিক বলা যাবে না বলে জানিয়েছে সেনাবাহিনী। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে আমরা যখন বৈঠক করলাম, তখন আরেকজন উপদেষ্টা বলেছেন আপনারা শ্রমিক ও নেতাদের গ্রেপ্তার করতে পারবেন না। এখন থেকে সেনবাহিনীও গ্রেপ্তার করতে পারবে।’

এর আগে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলা বৈঠকে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি একে আজাদ বলেন, ‘১০ তারিখের মধ্যেই বেতন দিতে হবে। এজন্য যারা ওই তারিখে বেতন দিতে পারছেন না তাদের জন্য বিজিএমইএতে একটি তহবিল গঠন করা যেতে পারে। আমি সেখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।’

সিএস নিট কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক বলেন, ‘গত তিন দিন আমার কারখানায় বহিরাগতরা আক্রমণ করেছে। এ আন্দোলনে বিভিন্ন কারখানা থেকে বহিষ্কৃত কিছু কর্মীকে নিয়ে ফেডারেশন নেতারা উসকানি দিচ্ছেন।’

শুরু হচ্ছে অ্যাকশন : পোশাক শিল্পে যে অসন্তোষ চলছে এর পেছনে গণঅভ্যুত্থানে বিতাড়িত আওয়ামী লীগ সরকারের লোকজনের ইন্ধন রয়েছে বলে মনে করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘তাদের (ইন্ধনদাতারা) বিরুদ্ধে আজই (গতকাল) অ্যাকশন শুরু হচ্ছে।’ গতকাল দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। আরও উপস্থিত ছিলেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমানসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা।

প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন গাজীপুর এবং সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধি।