পিলখানা হত্যাকান্ডের তদন্তে সহায়তা করেনি সরকার

রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) বিদ্রোহের দিন কী কী ঘটেছিল সে বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তার হত্যাকা- নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিলেও সরকারের পক্ষ থেকে সাহায্য পাওয়া যায়নি।

বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে তার লেখা বই শিগগিরই প্রকাশ করা হবে বলেও জানিয়েছেন মইন ইউ আহমেদ। গত বৃহস্পতিবার তিনি তার নিজের ইউটিউব চ্যানেলে বিডিআর বিদ্রোহের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় বিডিআরের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। ওই ঘটনায় মোট নিহত হন ৭৪ জন। ঘটনার চার বছর পর ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর বিচারিক আদালতে হত্যা মামলাটির রায় হয়। এখনো পর্যন্ত এ মামলায় বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংখ্যক আসামি। ৮৫০ জন বিডিআর সদস্যের বিচার হয় এ মামলায়। মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয় ১৫২ জনকে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় ১৬০ জনকে। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয় ২৫৬ জনকে।

বিচারিক আদালতের এ রায়েই খালাস পেয়েছেন ২৭৮ জন। আর মামলার রায় হওয়ার আগেই মারা গেছেন চারজন। রায় ঘোষণার পর মারা যান আরও ১১ জন।

মৃত্যুদন্ড অনুমোদন ও আসামিদের আপিলের শুনানি শেষে ২০১৭ সালের নভেম্বরে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ে ১৫২ জনের মধ্যে ১৩৯ জনের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখা হয়। পাঁচজনকে খালাস দেওয়া হয়।  

আটজনকে মৃত্যুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

হাইকোর্টের রায়ে যারা খালাস পেয়েছেন এবং মৃত্যুদণ্ড থেকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে এমন ৮৩ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ২০টি আপিল করেছে। এ ছাড়া মৃত্যুদন্ড হয়েছে এমন ৬৩ আসামির পক্ষে খালাস চেয়ে ৩৫টি আপিল দায়ের করা হয়েছে। খালাস থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে এমন ৩০ জন আসামির পক্ষে চারটি আপিল করা হয়েছে। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত এমন ১৩২ জন ২৯টি লিভ টু আপিল করেছে। তবে গত চার বছরেও এসব আবেদনের শুনানি হয়নি।

বিডিআর বিদ্রোহের সময় সেনাপ্রধান ছিলেন মঈন ইউ আহমেদ। বিদ্রোহের ঘটনার পর জুন মাস পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন এক-এগারোর সরকার গঠনের নেপথ্যে থাকা এই সেনাপ্রধান।

পিলখানা হত্যাকান্ড নিয়ে তিনি তার ইউটিউব চ্যানেলে বলেন, ‘বিডিআর বিদ্রোহ ঘটনার আমি যখন তদন্তের আদেশ দিই, তখন আমাকে বলা হয় যখন সরকার এই বিষয়ে তদন্ত করছে, তখন আমাদের এর প্রয়োজনটা কী? এই তদন্ত করতে সরকারের কাছ থেকে যে সাহায্য প্রয়োজন, তা আমরা পাইনি।’

সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, ‘সেনাবাহিনীর তদন্ত কমিটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (বর্তমান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা)। তিনি তার কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারেননি, কারণ অনেকে জেলে ছিলেন, অনেককে প্রশ্ন করা সম্ভব হয়নি। আমার কাছে এসে বেশ কয়েকবার তার সমস্যার কথা তুলে ধরেন। আমি আশা করি, তিনি এখন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা হয়েছেন। তিনি এ তদন্ত কমিটি পুনর্গঠিত করে জড়িতদের বের করতে সক্ষম হবেন। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর আমি তাকে এ বিষয়ে অনুরোধ করেছি।’

বিদ্রোহের প্রথম দিনের ঘটনাবলি বর্ণনা, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ ও রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে তিন বাহিনীর প্রধানদের যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন মইন ইউ। এ ছাড়া বিডিআরের উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) তৌহিদের সঙ্গে কথোপকথনের প্রসঙ্গও এসেছে তার বক্তব্যে।

তিনি বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আমার প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি কর্নেল ফিরোজ মিটিং রুমে প্রবেশ করেন এবং আমাকে বলেন, পিলখানায় গন্ডগোল হচ্ছে। আপনার দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। কিছুক্ষণ পর আমি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্তু তার ফোন ব্যস্ত পাই।’

মইন ইউ আহমেদ বলেন, ‘সামরিক গোয়েন্দারা তখন আমাকে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানান। পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে আমি তখন সময় বাঁচাতে কারও নির্দেশ ছাড়া আরেকটি ব্রিগেডকে অপারেশনের জন্য প্রস্তুত হতে নির্দেশ দিই। তারা তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ নিতে শুরু করে, যার নামকরণ করা হয় অপারেশন রেস্টোর অর্ডার।’

সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, ‘৯টা ৪৭ মিনিটে বিডিআরের ডিজিকে (মহাপরিচালক) ফোনে পাওয়া যায়। তিনি আমাকে জানান, দরবার চলাকালে দুজন সশস্ত্র সৈনিক প্রবেশ করে একজন তার পেছনে দাঁড়ায়। এরপরই বাইরে থেকে গুলির শব্দ আসে। সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে থাকা সৈনিকরা দরবার হল থেকে বের হয়ে যায়। এগুলো সবই মনে হয় প্ল্যান করা এবং প্ল্যান অনুযায়ী সব চলছে। তিনি সেক্টর কমান্ডার এবং ব্যাটালিয়ন কমান্ডারদের পাঠিয়েছেন তাদের ফেরত আনার জন্য। তখন আমি তাকে (ডিজি) অপারেশনের কথা জানাই।’

মইন ইউ আহমেদ বলেন, ‘৯টা ৫৪ মিনিটে আমি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করতে সক্ষম হই। এর মধ্যেই তিনি বিডিআর বিদ্রোহ সম্পর্কে অনেক তথ্য পেয়ে গিয়েছিলেন। এ সময় আমি তাকে অপারেশনের কথা জানালে তিনি জানতে চান, কতক্ষণ সময় লাগবে এ ব্রিগেডকে তৈরি করতে? আমি সময় জানিয়ে ব্রিগেডকে পিলখানায় যাওয়ার জন্য তার অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দেন। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় লাগলেও ৪৬ ব্রিগেড এক ঘণ্টার মধ্যে যাত্রা শুরু করে।’

তিনি বলেন, ‘এদিকে বিদ্রোহীরা বিডিআর গেটগুলোর সামনে আক্রমণ প্রতিহত করতে রকেট লঞ্চার, মর্টারসহ অন্যান্য অস্ত্র মোতায়েন করে। বেলা ১১টায় ৪৬ ব্রিগেডের প্রথম গাড়িটি মেইন গেটের কাছাকাছি পৌঁছলে বিদ্রোহীরা একটি পিকআপ লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালায়। এতে চালক ঘটনাস্থলেই মারা যান। লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামসের ধারণা অনুযায়ী, সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যেই ডিজি, ডিডিজি (উপপরিচালক), কর্নেল আনিস, কর্নেল কায়সারসহ অনেক অফিসারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আমাদের টিম পৌঁছায় ১১টার পর।’

ঘটনার সময়ে গণমাধ্যমে চলা লাইভ কভারেজ বিডিআর বিদ্রোহ ছড়িয়ে দিতে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে বলে সমালোচনা করেন সাবেক এ সেনাপ্রধান।

তিনি বলেন, ক্যাপ্টেন শফিক তার নেতৃত্বে ৩৫৫ জন র‌্যাব সদস্য নিয়ে পিলখানায় পৌঁছান ১০টার আগেই। এ সময় তিনি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে পিলখানায় প্রবেশের অনুমতি চাইলেও তিনি তা পাননি। তিনি অনুমতি পেলে হয়তো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সুবিধা হতো এবং এত ক্ষয়ক্ষতি হতো না।’

মইন ইউ আহমেদ বলেন, ‘১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (এএফডি) প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) জানান, সরকার রাজনৈতিকভাবে এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। তাদের সঙ্গে সমঝোতা না হলে তখন সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘বেলা ১২টায় প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার আমাকে ফোন করে জরুরি ভিত্তিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যমুনায় দেখা করতে বলেন। আমি যমুনায় যাওয়ারও ঘণ্টাখানেক পর বিমান ও নৌবাহিনীর প্রধান সেখানে আসেন। অর্থাৎ তাদের আমার পরে ফোন করে আসতে বলা হয়েছে। অনেকক্ষণ পর তারা সেখানে এলে আমাদের জানানো হয়, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক (সর্বশেষ ছিলেন মন্ত্রী) ও সাবেক হুইপ মির্জা আজম বিদ্রোহীদের একটি দল নিয়ে যমুনায় আসছেন এবং তারা সাধারণ ক্ষমা চায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্রোহীদের কিছু বলার থাকলে আমরা যেন তাদের বলি। তখন আমি তাকে বলি, অনেকে নিহত হয়েছেন। তাদের কোনো দাবি মানা যাবে না। আপনি তাদের বলবেন প্রথমত, অফিসার হত্যা এই মুহূর্তে বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যাদের আটক করা হয়েছে তাদের সবাইকে এখনই মুক্তি দিতে হবে। তৃতীয়ত, অস্ত্রসহ বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণ করতে হবে এবং চতুর্থত, সাধারণ ক্ষমা দেওয়ার প্রশ্নই নেই।’

মইন ইউ আহমেদ বলেন, ‘১৪ জন বিদ্রোহী ৩টা ৪৮ মিনিটে ডিএডি (উপসহকারী পরিচালক) তৌহিদের নেতৃত্বে যমুনায় (রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন) আসেন। তাদের একটি বড় রুমে রাখা হয়। আমি পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রশ্ন করলে ডিএডি তৌহিদ বলেন, সকাল ৯টায় বিদ্রোহীরা আমাকে একটি রুমে তালা মেরে রাখে। মাত্রই তালা খুলে আমাকে নিয়ে আসা হয়। আমি কিছুই জানি না। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। তখন আমি তাকে বলি, আপনি জানেন না, এখানে বাকি যারা আছেন তারা তো জানেন। তাদের গিয়ে জিজ্ঞাসা করেন এবং আমাদের জানান।’