হতাশা থেকে বাঁচার ৬ উপায়

জীবন সবসময় নিস্তরঙ্গভাবে বয়ে চলে না। জীবনে কখনো সুখ আসে। কখনো আসে দুঃখ। স্রোতস্বিনী নদীর মতো জোয়ার-ভাটা চলতেই থাকে। এটি মানবজীবনের অমোঘ বিধান। তাই জীবনে কখনো হতাশা ঘিরে ধরলে হাল ছেড়ে দিতে নেই। বিক্ষুব্ধ তরঙ্গের মাঝে মাঝি যেমন জীবনের শেষটুকু পর্যন্ত বৈঠা নাড়তে থাকে, হাল ছাড়ে না। আমাদেরও তেমন শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। তবে যে কেউ হতাশা থেকে সহজেই মুক্ত হতে পারে না। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য নানান উপায় অবলম্বন করলেও কর্মপদ্ধতির অসারতার কারণে অনেক সময় ব্যর্থ হতে হয়। তাই ইসলাম আমাদের এ ক্ষেত্রে কিছু অতীব গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে। যেগুলো হতাশা থেকে মুক্তির ক্ষেত্রে শতভাগ কার্যকরী। কোরআন ও হাদিসের আলোকে তার কিয়দংশ আলোকপাত করা হলো।

আল্লাহর ওপর ভরসা করা : ভরসাহীনতা আমাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে। ফলে আমরা হয়ে যাই দিগ্ভ্রান্ত, ছন্নছাড়া। উত্তাল সমুদ্রে মাঝিবিহীন তরীর মতো। তাই কখনো হতাশাগ্রস্ত হলে সর্বপ্রথম আল্লাহর দিকে ফিরতে হবে। একমাত্র তার ওপরই ভরসা রাখতে হবে। মনেপ্রাণে এই বিশ্বাস দৃঢ় করতে হবে, আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক ৩)

রহমতের আশায় থাকা : সবসময় আমাদের আল্লাহর রহমতের আশায় থাকতে হবে। আশাহত হওয়া যাবে না। আশাহীনতা কাজের গতিকে নিষ্প্রভ করে দেয়। এনে দেয় হতাশা। এ জন্য নিরাশাকে মনের মধ্যে ঠাঁই দেওয়া যাবে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা জুমার ৫৩)

রবের তরে নিজেকে সঁপে দেওয়া : হতাশার অন্যতম কারণ বিপদাপদ। কিন্তু মুমিনের গুণ হলো তারা এতে ভেঙে পড়বে না। বরং আল্লাহর কথা স্মরণ করবে নিজেকে সঁপে  দেবে তার তরে। বিশ্বাস করবে এটি রবের পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষামাত্র। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত মুমিন তারাই যারা কোনো বিপদে পড়লে বলে, আমরা আল্লাহর জন্য। তার দিকেই আমাদের প্রত্যাবর্তন স্থল।’ (সুরা বাকারা ১৫৬)

অল্পে তুষ্ট হওয়া : অল্পে তুষ্ট হওয়ার গুণ জীবনকে সুখে রাখার বড় চাবিকাঠি। দুনিয়ার নানা অর্জন ও অর্থলিপ্সা জীবনের শান্তি কেড়ে নেয়। জীবনকে করে তোলে মূল্যহীন। ফলে আমরা আটকা পড়ি হতাশার বেড়াজালে। তাই আমাদের শান্তির জীবন কাটাতে হলে অল্পে তুষ্ট থেকে রবের শুকরিয়া আদায় করতে হবে। তাহলে না পাওয়ার বেদনা আমাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করতে পারবে না। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কসম! পরকালের তুলনায় দুনিয়ার উদাহরণ হলো, তোমাদের কেউ সাগরের মধ্যে নিজের একটি আঙুল চুবানোর পর লক্ষ করে দেখুক আঙুল কী পরিমাণ পানি নিয়ে এলো? (সহিহ মুসলিম ৫১৫৬)

সালাতুল হাজাত পড়া : হতাশা থেকে মুক্তির অন্যতম উপায় হলো নামাজ আদায় করা। সালাতুল হাজাত তথা জরুরি প্রয়োজনের কারণে যে নামাজ আদায় করা হয় তা মুমিনের হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দেয়। হতাশামুক্ত করে তাকে। রবের পক্ষ থেকে পূরণ করা হয় তার যাবতীয় প্রয়োজন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা ৪৫) হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসুল (সা.) যখন কোনো সমস্যায় পড়তেন বা চিন্তাগ্রস্ত হতেন তখন তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। (মুসনাদে আহমাদ)

রিজিকের চিন্তা না করা : আমরা জীবিকার চিন্তায় অধিকাংশ সময় হতাশায় পড়ে যাই। বলা যায়, জগতের প্রায় মানুষই জীবিকার চিন্তায় হতাশায় ভুগে। অথচ রিজিক আমাদের জন্য নির্ধারিত। মহান আল্লাহ নিজেই সৃষ্টিকুলের রিজিকের দায়িত্ব নিয়েছেন। তাই রিজিকের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করা কাম্য। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘জগতের সব প্রাণীর জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর ওপর। (সুরা হুদ ৬)

জীবনে সুখ যেমন স্থায়ী নয় তেমনি দুঃখও চিরকাল থাকে না। দিন বদলে নতুন দিন আসে। তাই আমাদের সামান্য বিপদে হতাশাগ্রস্ত হওয়া কখনোই উচিত নয়। বিপদাপদে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নিজের কাজে মন দেওয়া এবং সুদিনের অপেক্ষায় থাকা বুদ্ধিমানের কাজ।