আল্লাহর সান্নিধ্যই শ্রেষ্ঠ সম্বল

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০১:১৩ এএম

আপনারা মহান আল্লাহকে ভয় করুন। অনুতপ্ত বান্দাদের পথ অনুসরণ করুন। যারা দুনিয়াকে আখেরাতের জন্য কাজে লাগায়, আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে এবং প্রবৃত্তির ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয়।

জীবনে চলার পথে নানা কোলাহল, খেলতামাশা, ব্যস্ততা, পরীক্ষা, বিপদ ও কঠিন সংকটের সম্মুখীন হয়ে মানুষ অনুভব করে, তার এমন একজনের প্রয়োজন, যিনি তাকে সহায়তা করবেন, তার শক্তিকে দৃঢ় করবেন, তার সংকল্পকে মজবুত করবেন, যার সাহায্যের ওপর সে নির্ভর করতে পারবে এবং যার তত্ত্বাবধানে সে নিরাপত্তা অনুভব করবে। আর সেই সাহায্যকারী ও রক্ষাকর্তার মর্যাদা যত উঁচু হয়, মানুষের অন্তরে ততই প্রশান্তি নেমে আসে এবং নিরাপত্তা অর্জিত হয়।

এ কারণেই মুমিনদের জন্য মহান আল্লাহর বিশেষ সান্নিধ্যই জীবনের সফরে সর্বোত্তম পাথেয় ও শ্রেষ্ঠ সম্বল। এ সান্নিধ্য তাদের জীবনযাত্রায় সঙ্গ দেয় এবং মহান আল্লাহ ও পরকালের পথে তাদের যাত্রাকে সান্ত্বনা ও প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে।

সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান আল্লাহর নির্দেশে হিজরত করেন। তার সঙ্গে ছিলেন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু। শত্রুরা তাদের পদচিহ্ন অনুসরণ করতে করতে গুহার কাছে পৌঁছে গেল। তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এই দ্বীনের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, এই দাওয়াত যেন ধ্বংস না হয়ে যায়, এই নুর যেন নিভে না যায়। তাদের কেউ যদি নিজের পায়ের নিচের দিকে তাকায়, তবে আমাদের সন্ধান পেয়ে যাবে।

তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই অমর বাণী উচ্চারণ করলেন, যা পৃথিবীকে আলোড়িত করেছিল এবং হৃদয়গুলোকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তিনি বললেন, ‘হে আবু বকর! এমন দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার ধারণা কী, যাদের তৃতীয়জন আল্লাহ?’ (সহিহ বুখারি ৩৬৫৩)

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীটি ছিল এই বিষয়ের উজ্জ্বল প্রমাণ যে, তিনি আল্লাহর সান্নিধ্যের কারণে সর্বোচ্চ প্রশান্তির স্তরে পৌঁছেছিলেন। তার তাওয়াক্কুল ছিল পূর্ণাঙ্গ, তার বিশ^াস ছিল পরিপূর্ণ। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ^াস করতেন, মহান আল্লাহর সাহায্য অব্যাহতভাবে তার সঙ্গে রয়েছে।

অতঃপর মহান আল্লাহ এ ঘটনাকে কোরআনের অংশ হিসেবে নাজিল করলেন, যাতে তা যুগে যুগে উপদেশ ও শিক্ষা হয়ে থাকে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি তোমরা তাকে সাহায্য না করো, তবে আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছেন, যখন কাফেররা তাকে বের করে দিয়েছিল। তিনি ছিলেন দুজনের একজন। যখন তারা উভয়ে গুহায় ছিলেন, তখন তিনি তার সঙ্গীকে বলছিলেন, ‘দুঃখ করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা তওবা ৪০) অতঃপর এই বিশেষ সান্নিধ্যের ফলও সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেল। মহান আল্লাহ তার ওপর প্রশান্তি নাজিল করলেন, এমন বাহিনী দিয়ে তাকে শক্তিশালী করলেন, যা কেউ দেখতে পারেনি।

হে আল্লাহর বান্দারা! এ ঘটনায় বুদ্ধিমান ও প্রজ্ঞাবানদের জন্য রয়েছে শিক্ষা ও উপদেশ। যাদের চিন্তাশক্তি ও উপলব্ধি গভীর, তারা এ ঘটনা থেকে পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ, সর্বোত্তম আদর্শ গ্রহণ এবং যথার্থ অনুকরণের প্রেরণা লাভ করে। তাদের অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, মহান আল্লাহ কখনোই ইমানদার, সত্যবাদী ও বিনয়ী মুমিনদের অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেন না। তিনি তাদের থেকে তার সাহায্য প্রত্যাহার করেন না এবং তাদের ওপর তার অনুগ্রহ বন্ধ করেন না, যদিও বিপদ আসে, দুঃখ-কষ্ট একের পর এক নেমে আসে এবং সংকট বেড়ে যায়। কারণ, ইমানদারদের জন্য মহান আল্লাহর সান্নিধ্য সর্বদা অব্যাহত থাকে। তা কোনো সময় বা স্থানে বিচ্ছিন্ন হয় না। আল্লাহর এই বিশেষ সান্নিধ্যে একজন বান্দার অংশ ততটুকুই, যতটুকু তার ইমানের অংশ রয়েছে। সুতরাং বান্দার ইমান যত বৃদ্ধি পায়, রবের বিশেষ সান্নিধ্যও তার জন্য তত বৃদ্ধি পায়।

কোরআনের বাণী, তিনি তার সঙ্গীকে বলছিলেন, ‘দুঃখ করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ এ সম্পর্কে ইবনুল কাইয়্যুম (রহ.) বলেন, এতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীর একটি ইঙ্গিত রয়েছে। তা হলো, যে ব্যক্তি অন্তর ও আমলের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার আনীত দ্বীনকে অনুসরণ করে, যদিও সে শারীরিকভাবে তার সাহচর্য লাভ করেনি, তবুও মহান আল্লাহ তার সঙ্গে থাকেন।

আর যখন আল্লাহ কোনো বান্দার সঙ্গে থাকেন, তখন সব কষ্ট তার কাছে সহজ হয়ে যায়, সব ভয় নিরাপত্তায় পরিণত হয়। আল্লাহর সাহায্যে প্রতিটি কঠিন বিষয় সহজ হয়ে যায়, প্রতিটি দুঃসাধ্য কাজ সহজসাধ্য হয়, প্রতিটি দূরের বিষয় নিকটবর্তী হয়ে যায়। আল্লাহর সাহায্যেই দুশ্চিন্তা, পেরেশানি ও শোক দূর হয়ে যায়। অতএব, আল্লাহর সঙ্গে থাকলে কোনো দুশ্চিন্তা থাকে না, কোনো পেরেশানি থাকে না এবং কোনো শোকও থাকে না।

হে আল্লাহর বান্দারা! আপনারা মহান আল্লাহর এ বিশেষ সান্নিধ্যের প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখুন, যা তিনি তাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন, যারা তাকে ভয় করে, তার পথ অনুসরণ করে এবং তার সন্তুষ্টিকেই অগ্রাধিকার দেয়। তাই আপনারা একনিষ্ঠভাবে তারই ইবাদত করুন, সৎকাজ করুন। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মপরায়ণ।’ (সুরা নাহল ১২৮)

যখন কোনো মুমিন অনুভব করে মহান আল্লাহ তার সঙ্গে আছেন, তখন সে বিশ্বাস করে, সে এমন এক শক্তির সঙ্গে যুক্ত, যা কখনো পরাজিত হয় না। সে এমন এক সাহায্যে আছে, যা কখনো শেষ হয় না। তখন সে নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে শক্তিশালী হয়, নিজের কষ্টের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হয়, নিজের কামনা বাসনার ওপর বিজয়ী হয় এবং নিজের শত্রুদের মোকাবিলায় দৃঢ় হয়ে ওঠে।

হে আল্লাহর বান্দারা! মহান আল্লাহকে ভয় করুন। তার সান্নিধ্যকে সর্বদা হৃদয়ে উপস্থিত রাখার চেষ্টা করুন। কারণ এ সান্নিধ্য ছাড়া আপনাদের কোনো উপায় নেই এবং তা ছাড়া আপনাদের জীবনও সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে না। এর দাবি অনুযায়ী আমল করুন, এর উপায়গুলো অবলম্বন করুন। তাহলে আপনাদের সব কাজ সঠিক হবে, জীবন হবে সুন্দর ও কল্যাণময় এবং আপনারা সফল ও সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

হে মুসলিমরা! মহান আল্লাহ আমাদের এমন একটি বিষয়ে আদেশ করেছেন, যার সূচনা তিনি নিজেই করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে ইমানদাররা, তোমরাও তার প্রতি দরুদ পাঠ করো এবং যথাযথভাবে সালাম পেশ করো।’ (সুরা আহজাব ৫৬) এখানে নবীজির প্রতি মহান আল্লাহর দরুদ পাঠ করার অর্থ হলো, আল্লাহ নবীজির প্রতি অনুগ্রহ করেন।

হে আল্লাহ! আপনার বান্দা ও রাসুল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন। তার চার খলিফা আবু বকর, ওমর, ওসমান ও আলী (রা.)-এর প্রতি সন্তুষ্ট হোন। আরও সন্তুষ্ট হোন তার পরিবারবর্গ, সব সাহাবি, তাবেয়ি এবং কেয়ামত পর্যন্ত ইহসানের সঙ্গে তাদের অনুসরণকারীদের প্রতি। আর আমাদেরও আপনার ক্ষমা, অনুগ্রহ ও দয়ার মাধ্যমে তাদের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করুন।

হে আল্লাহ! ইসলাম ও মুসলমানদের সম্মানিত করুন। দ্বীনের সীমানা ও মর্যাদা রক্ষা করুন। আপনার একত্ববাদী বান্দাদের সাহায্য করুন। মুসলমানদের অন্তরগুলো পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দিন। তাদের ঐক্যবদ্ধ করুন। তাদের নেতৃবৃন্দকে সংশোধন করুন। সত্যের ওপর তাদের ঐক্যবদ্ধ করুন।

হে আল্লাহ! মসজিদে আকসাকে মুক্ত করুন। ফিলিস্তিনের মুসলমানদের হেফাজত করুন। আপনি তাদের সাহায্যকারী, সমর্থনকারী, পৃষ্ঠপোষক ও বিজয়দাতা হয়ে থাকুন।

১০ জুলাই শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন

মুফতি আতিকুর রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত