বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তখন উত্তাল সারা দেশ। এর মধ্যেই অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রোকেয়া বেগমকে নিয়ে ৪ আগস্ট দিনাজপুর সদর হাসপাতাল গিয়েছিলেন দিনমজুর আবদুর রশিদ। কিন্তু হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে টিকিট নেওয়ার আগেই আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে ছোড়া শটগানের গুলি এসে লাগে তার গায়ে। হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর স্ত্রীকে নিয়ে ফিরে আসেন শহরের রাজবাড়ী এলাকায়। যে বাড়িটিতে তারা আশ্রিত হিসেবে থাকেন সেখানে। কিন্তু ৮ আগস্ট আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন তলপেটে গুলিবিদ্ধ রশিদ।
এদিকে রোকেয়ার অবস্থাও খুব একটা ভালো না, প্রসবের সময় ঘনিয়ে এসেছে। সেদিন প্রতিবেশীরা তাৎক্ষণিক চাঁদা তুলে রশিদকে দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। পরদিন ৯ আগস্ট অস্ত্রোপচার হয় তার। এদিকে সেদিনই বাসায় ফুটফুটে এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন রোকেয়া। কিন্তু সেই ফুটফুটে সন্তানের মুখ আর দেখা হয়নি রশিদের। তারই চিকিৎসার খরচ জোগাতে মাত্র তিন দিনের সন্তানকে বিক্রি করে দিয়েছেন রোকেয়া। নির্মম সেই বাস্তবতা মেনেও নিয়েছেন তারা। তবে সরকারের তরফ থেকে গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে আহতদের সব ধরনের চিকিৎসাব্যয় বহন করার কথা বলা হলেও রশিদের ক্ষেত্রে সেটি হয়নি কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি হাসপাতালের অস্বাভাবিক চিকিৎসাব্যয় নিয়ে।
অবশ্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দিনাজপুরের নেতারা বলেছেন, রশিদসহ অন্য আহতদের তালিকা তাদের কাছে আছে। তালিকা ধরে তাদের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। সাধ্যমতো সহায়তাও করা হচ্ছে। এ কথা বলেছে জেলার সদর উপজেলা প্রশাসনও। তবে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের ভাষ্য, ওই সময় একই ধরনের অনেক রোগীর চিকিৎসাসেবা দেওয়ায় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জামের সরবরাহ কম ছিল। ফলে কিছু ওষুধ প্রায় সব রোগীকেই বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে।
এদিকে গত শুক্রবার যখন রশিদ-রোকেয়ার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ হয়, তখন সন্তানকে ফিরে পাওয়ার তেমন আকুতিও প্রকাশ পায়নি তাদের কথায়। তবে রোকেয়া লুকিয়ে রাখতে পারেননি দীর্ঘশ্বাস, সন্তানকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চাপা কষ্ট।
রোকেয়া বেগম বলেন, ‘৪ আগস্ট আন্দোলনে আমার স্বামীকে গুলি লাগে। পরে হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে আমার স্বামীর অপারেশন হয়। অপারেশনের পর আমার স্বামীর অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। এর মধ্যে আমার বাচ্চা হয়। সেই সময় হাতে টাকা ছিল না। স্বামীর চিকিৎসা করাতে হবে, তাই তিন দিনের বাচ্চাকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিছি। সেই টাকা দিয়ে স্বামীর চিকিৎসা করছি। খারাপ তো লাগবে। কিন্তু সেই সময় কোনো উপায় ছিল না। স্বামীকে তো বাঁচাতে হবে।’
রোকেয়া বলছিলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্যনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তার স্বামী। তার একটা অপারেশন হয়েছে। আরও অপারেশন লাগবে। সুস্থ হতে তার আরও এক-দুই বছর সময় লাগতে পারে। আর পুরো সুস্থ না হওয়ারও ঝুঁকি আছে। তিনি সুস্থ না হয়ে উঠলে আরেক সন্তান নিয়েই তাকে পথে বসতে হবে। সে কারণেই ছোট্ট সন্তানের ভবিষ্যৎকেও জেনে-বুঝে অন্ধকারে ঠেলে দিতে চাননি। বরং সে এখন যাদের পরিবারে গেছে, সেখানেই ভালো থাকবে।
গুলিবিদ্ধ আহত আবদুর রশিদ বলেন, ‘আমি দিন আনি দিন খাই। অপারেশনে অনেক টাকার প্রয়োজন হওয়ায় স্ত্রী একজনের কাছে বাচ্চাকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে। এক সন্তানের জন্য কষ্ট হলেও আরেক সন্তান ও স্ত্রীর ভবিষ্যৎ চিন্তা করে তা মেনে নিয়েছি।’
এদিকে সন্তানকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের বিষয়েও ইতিবাচক সাড়া দেননি রশিদ-রোকেয়া। অবশ্য কেউ যদি মা-বাবার কাছে রেখেই শিশুটির দায়িত্ব নেন, সে ক্ষেত্রে ‘বুকের মানিককে বুকে’ টেনে নিতে চাইবেন হতভাগ্য মা-বাবা।
রশিদের প্রতিবেশীরা জানান, রশিদ-রোকেয়া দম্পতির নিজের কোনো জায়গা-জমি নেই। অন্যের বাড়িতে আশ্রিত হিসেবে থাকে তারা। রশিদের চিকিৎসার ও পরিবারটির ভরণ-পোষণের জন্য যেমন সহায়তা দরকার, তেমনি তাদের মাথা গোঁজার একটু ঠাঁইও দরকার। আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটা ঘর তাদের দেওয়া উচিত।
জানা গেছে, ইতিমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে রশিদকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়েছে। ওয়ার্ড জামায়াতের আমির আবদুর রহিম জানান, ভবিষ্যতেও তারা রশিদের পাশে থাকবেন।
রশিদের সন্তান বিক্রি ও চিকিৎসা নিয়ে কথা হয় দিনাজপুরের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আবির হোসেনের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তারা রশিদের বাড়িতে গিয়েছেন। বিক্রি করা শিশুটিকে তারা ফিরিয়ে এনে দিতে চেয়েছেন। কিন্তু রশিদ-রোকেয়ার আর্থিক অবস্থা এখন এতটাই করুণ যে, একটা বাড়তি মুখে ঠিকঠাক খাবার তুলে দেওয়া বা যত্ন নেওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই। তবু আমরা যেকোনোভাবে পরিবারটির পাশে থাকার চেষ্টা করব।’
দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. এটিএম নুরুজ্জামান জানান, এখন পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহত ১৮২ জনের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকজনের অপারেশন করা হয়েছে এবং কয়েকজন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। একসঙ্গে একই ধরনের অনেক রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়েছে। অনেক ধরনের ওষুধ ও সরঞ্জাম হাসপাতালে সরবরাহ ছিল না। সেগুলো অনেক রোগীকেই বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। তিনি বলেন, চিকিৎসা নিয়ে যাওয়াদের মধ্যে এখনো যাদের শারীরিক সমস্যা হচ্ছে, তাদেরও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
দিনাজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল রায়হান বলেন, ‘আন্দোলনে আহতদের মধ্যে যাদের তথ্য আমাদের কাছে কাছে, আমরা তাদের নানাভাবে সহায়তার চেষ্টা করছি। আমরা রশিদ ও তার পরিবারের পাশে থাকব। যত দ্রুত সম্ভব তাদের আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘর দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বলব।’