দেশ রূপান্তর : গণঅভ্যুত্থানের আগের ও পরের চিত্র কেমন দেখছেন?
হাসনাত আবদুল্লাহ : ৫ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৩০০টা আন্দোলন হয়েছে বিভিন্ন দাবি নিয়ে। গত ৩০ দিনের প্রত্যেক দিনই মানুষ দাবি-দাওয়া নিয়ে কথা বলছে। রাষ্ট্র যে সংকটের মধ্য দিয়ে গিয়েছে, রাষ্ট্র আমরা যেমন দেখতাম আসলে তেমন না। গত এক মাসে সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। এই যে মানুষ রাস্তায় নেমে আসছে, সমস্যা নিয়ে কথা বলছে, যেটা গত ১৬ বছর পারত না। শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ প্রত্যেকটা খাতে এ সরকার বৈষম্য তৈরি করে রেখেছিল। অথচ দেখানো হতো এ রাষ্ট্রে কোনো সমস্যাই নেই, সবকিছু উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যায়। আমাদের যেমন দেখানো হয়েছে আর বর্তমানে আমরা যেমন দেখছি এ দুটোর মধ্যে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে, যা এ ৩০ দিনে আমরা দেখলাম। রাষ্ট্রের সমস্যাগুলো আমাদের সামনে খোলাসা হয়েছে।
দেশ রূপান্তর : ছাত্র-জনতার বিজয়ের পর বেশ কিছু সংকট পরিলক্ষিত হয়েছে, সামনেও হতে পারে সে ক্ষেত্রে আপনাদের করণীয় কী?
হাসনাত আবদুল্লাহ : সংকট আমাদের জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। দেখুন, এ সরকারকে, আন্দোলনকে বিতর্কিত করতে সাম্প্রদায়িক হামলাগুলো যখন হয়, তখন মন্দিরের বাইরে আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরাসহ সবাই পাহারা দিয়েছে। যখনই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয়েছে, তখনই আমরা আবার একসঙ্গে দাঁড়িয়েছি, আমাদের মন্দির পাহারা দিয়েছি, মসজিদ পাহারা দিয়েছি, যারা সংখ্যালঘু রয়েছে তাদের বাড়ি পাহারা দিয়েছি। দলমত ঊর্ধ্বে উঠে আমরা সবাই একসঙ্গে হয়েছি।
পরবর্তীকালে দেখলাম যে, আমাদের একটি দুর্যোগ হয়েছে, বন্যা হয়েছে। এই বন্যাটি আমাদের সম্পৃক্তির, জাতীয় ঐক্যের আরও একটি অনন্য উদাহরণ। যখন বন্যাটি হয়েছে, আগে হলে কী হতো, মানুষ সরকারের প্রতি আস্থা রাখত না, কিন্তু আমরা এবার দেখেছি এই অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর আস্থা রেখে এবং ছাত্র-নাগরিক নিজ উদ্যোগে কীভাবে বিভিন্ন জায়গায় একসঙ্গে রাস্তায় নেমেছে। বিশেষ করে, টিএসসিতে আমরা দেখেছি, সবাই এগিয়ে এসেছে, যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করেছে। ত্রাণ সংগ্রহের যে একটি দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটি হচ্ছে আমাদের জাতীয় ঐক্যের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। সেখানে ধর্মীয় মতভেদ প্রাধান্য পায়নি, কালচারাল মতভেদ প্রাধান্য পায়নি, সেখানে সামাজিক মর্যাদা প্রাধান্য পায়নি, সেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রাধান্য পায়নি। বরং সবাই একটা পরিচয়ে এই জাতীয় সংকটটাকে মেনে নিয়ে সেটাকে প্রতিরোধ করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। এই ফ্যাসিস্ট সরকার ‘আফসোস লীগ’ হয়ে আবার ফিরে আসতে চাচ্ছে। যতভাবেই ফ্যাসিস্ট সরকার ফিরে আসতে চেয়েছে, ততভাবেই ছাত্র নাগরিক ঐক্যের মধ্য দিয়ে ওই ফ্যাসিস্ট সরকারের যত ধরনের লিগ্যাসি রয়েছে, সেটিকে আমরা প্রতিরোধ করতে পেরেছি। অর্থাৎ সর্বক্ষেত্রে ছাত্র নাগরিকের ঐক্যটি আমরা স্পষ্ট করতে পেরেছি, এটি হচ্ছে আমাদের জাতীয় অর্জন।
দেশ রূপান্তর : আমরা দেখেছি মানুষ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কাছে না গিয়ে আপনাদের পেছনে দৌড়াচ্ছে এতে সরকারের প্রতি আস্থাহীনতা প্রকাশ পাচ্ছে কি না?
হাসনাত আবদুল্লাহ : গত এক মাসে মানুষের একটা ধারণা হয়েছে যে, ছাত্র সমন্বয়করা চাকরি দিতে পারে, চাকরি থেকে বাদ দিতে পারে, চাকরিতে পদোন্নতি দিতে পারে। কারণ অতীতের সরকারের যারা ছিল, তাদের যে ছাত্র সংগঠনগুলো ছিল তারাই তদবির, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, সিট দখল এগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাই মনস্তাত্ত্বিকভাবে তারা মনে করছে, আমরা যারা ছাত্র সমন্বয়করা আছি, আমরাও সে ধরনের কাজগুলো করছি। আপনাদের কাছে স্পষ্ট করে বলতে চাই, কোনো ধরনের তদবিরের এখতিয়ার ছাত্র নাগরিকের নেই। সুতরাং যারা বিভিন্ন তদবির নিয়ে আসেন, বিভিন্ন দাবি নিয়ে আসেন, এগুলো ছাত্র নাগরিকের কাজ নয়। ছাত্রদের এভাবে বিতর্কিত করার কোনো প্রয়োজন নেই, ব্যবস্থার উন্নতি হলে আপনারা সেখানেই আবেদন করবেন, ব্যবস্থার ভেতর দিয়েই সব হবে। ইনসাফ অর্থাৎ ন্যায্যতার ভিত্তিতে আমাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে।
দেশ রূপান্তর : বর্তমানে রাষ্ট্রের প্রধান চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করছেন?
হাসনাত আবদুল্লাহ : আমাদের রাষ্ট্রের প্রধান এবং প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রত্যেকটা জায়গায় সমস্যাগুলোকে স্তরবিন্যাস করে এবং মানুষের সামনে যে প্রকাশিত হয়েছে এবং মানুষ যে অবিলম্বে সমাধান চাচ্ছে, তা না করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্থায়ী সমাধান করা হচ্ছে আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
দেশ রূপান্তর : রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া ‘যৌক্তিক’ সময়কে কীভাবে ব্যাখ্যা করেন?
হাসনাত আবদুল্লাহ : ‘যৌক্তিক’ সময় বলতে আমরা বোঝাচ্ছি যতদিন পর্যন্ত রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ, শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাসহ, নির্বাচন কমিশনসহ প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে কার্যকর না হয় এবং এগুলোর প্রতি জনগণের যতদিন পর্যন্ত না আস্থা ফিরে, ততদিন পর্যন্ত আমি মনে করি সময় দেওয়া উচিত। সেটা আলোচনার ভিত্তিতে হতে পারে, সেটা দৃশ্যমানতা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে হতে পারে। আমরা যখনই দেখব বিষয়গুলোর ওপর মানুষের আস্থা ফিরেছে, তখনই আমরা মনে করব ‘যৌক্তিক’ সময়টি শেষ হয়েছে। সে পর্যন্ত সময় দেওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি।
দেশ রূপান্তর : পুলিশিং ব্যবস্থা পুরোপুরি কাজ করছে না, সেটি কীভাবে দেখছেন এবং রাষ্ট্রকে জনকল্যাণমুখী রাখতে ছাত্রদের ভূমিকা কী থাকবে?
হাসনাত আবদুল্লাহ : ক্ষমতার সঙ্গে ছাত্রদের সম্পর্ক কখনো সমান হয় না। ছাত্রদের সম্পর্ক হচ্ছে চ্যালেঞ্জিং, প্রশ্নবোধক সম্পর্ক। অর্থাৎ ছাত্ররা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করবে এবং প্রশ্নের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে জনকল্যাণমুখী রাখার জন্য ছাত্ররা ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে কাজ করবে। পুলিশ যেন যথাযথভাবে ফিরে আসে সে চেষ্টা করছি আমরা। ছাত্র এবং পুলিশের মধ্যে যে ব্যবধানটি সৃষ্টি হয়েছিল, তার কারণ কিছু পুলিশ নিজেদের স্বার্থে বিগত সরকারের স্বার্থরক্ষায় অনৈতিক কাজ করেছিল। আমরা মানুষের কাছে এ বার্তাটি পৌঁছাতে চাই, ছাত্র এবং পুলিশের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। ছাত্র এবং পুলিশ নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র বিনির্মাণের কাজে অংশগ্রহণ করবে। আমরা নিশ্চিত করতে চাই পুলিশ পুরোপুরি কাজে ফিরলে ছাত্রদের পক্ষ থেকে কোনো বাধা থাকবে না। ছাত্র এবং পুলিশের মধ্যে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক হবে। তবে আমরা যখনই দেখব, রাষ্ট্র ফ্যাসিজমকে পুনর্বাসন করার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে, ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসন করার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই ছাত্ররা রাস্তায় নেমে আসবে, প্রতিরোধ করবে।
দেশ রূপান্তর : বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোকে কীভাবে দেখতে চান?
হাসনাত আবদুল্লাহ : ক্যাম্পাস হবে গবেষণার উর্বর ভূমি। ছাত্র এবং শিক্ষকদের সম্পর্ক হবে জুনিয়র ও সিনিয়র স্কলারের। আমরা সেখানে দেখতে চাই, ভয়ের কোনো পরিবেশ থাকবে না। হল দখল, সিট দখল, ক্যান্টিনে ফাও খাওয়ার মতো কোনো সংস্কৃতি থাকবে না। স্বাধীনভাবে যে যার মতপ্রকাশ করতে পারবে এবং বিশ্বমানের যে শিক্ষাব্যবস্থা, সেটা নিশ্চিত হবে।