কাজ না করায় আশুলিয়ায় ৩০ কারখানায় ছুটি

রাজধানী ঢাকার অদূরে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় কয়েক দিন ধরে টানা শ্রমিক অসন্তোষে বন্ধ থাকার পর পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সিদ্ধান্তে গত বৃহস্পতিবার সব কারখানা খুলে দেওয়া হয়। তবে গতকাল রবিবার সকালে কাজে যোগ দেওয়ার পর শ্রমিকরা কর্মবিরতিতে যাওয়ায় ৩০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। অবশ্য অন্যদিনের মতো এদিন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ বা ভাঙচুরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। বিশৃঙ্খলা এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও শিল্পপুলিশ সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। এছাড়া বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গত শনিবার রাতে ও গতকাল আশুলিয়ার বিভিন্ন জায়গা থেকে ১০ জনকে আটক করেছে যৌথ বাহিনী।

এদিকে সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলের পোশাক কারখানাগুলোতে পরিবেশ এখনো স্বাভাবিক না হলেও গাজীপুরের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়া পুরোদমে চালু হয়েছে। শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দিয়েছেন। পাশাপাশি শনিবার রাতে যৌথ বাহিনী জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়েছে। তবে এ সময়ে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে জানা গেছে।

বিজিএমইএর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গতকাল আশুলিয়ার অধিকাংশ পোশাক কারখানা খোলার পর বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে বিক্ষোভ শুরু করলে অন্তত ৩০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্র্তৃপক্ষ। দাবির বিষয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করেও সমাধানে পৌঁছাতে না পারায় কারখানা কর্র্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। এর আগে, বেলা ১১টা পর্যন্ত বেশিরভাগ কারখানার পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক থাকলেও নিউএইজ, আল মুসলিমসহ কয়েকটি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণার পর ধীরে ধীরে অন্য কারখানাগুলোতেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

আন্দোলনকারী শ্রমিক ও শিল্পপুলিশের সদস্যরা জানান, সকাল থেকে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার ডিইপিজেডসহ অধিকাংশ তৈরি পোশাক কারখানায় দল বেঁধে কাজে যোগ দেন শ্রমিকরা। তবে বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কের নরসিংহপুর এলাকায় বেশ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা ভেতরে ঢুকে বিভিন্ন দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেন। একপর্যায়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে কারখানা কর্র্তৃপক্ষ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলে শ্রমিকরা বাড়ি ফিরে যান। বিষয়টি আশপাশের কারখানায় জানাজানি হওয়ায় নিরাপত্তার কারণে সেগুলোতেও ছুটি ঘোষণা করে কারখানা কর্র্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে দুপুর পর্যন্ত অন্তত ৩০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। তবে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে যেসব এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে, সেসব এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পলাশবাড়ি এলাকার পার্ল গার্মেন্টসের সামনে এবং বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের নরসিংহপুর এলাকায় বিভিন্ন কারখানার সামনে সেনাবাহিনী, শিল্পপুলিশ ও এপিবিএন সদস্যরা অবস্থান নেন। সড়কে টহল দেন সেনাবাহিনী, র‌্যাব, বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ইয়াগি বাংলাদেশ, নিউএইজ, আল মুসলিম, জেনারেশন নেক্সটসহ অন্তত ২০টি কারখানার শ্রমিকরা বিভিন্ন দাবি তুলে কাজ না করে কারখানা থেকে বেরিয়ে যান। কারখানার অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে লুসাকা, মাসকাট, বেক্সিমকো (২১ ইউনিট) নিট কম্পোজিটসহ ৭টি কারখানার শ্রমিকরা। এছাড়া বিক্ষোভের কারণে গতকালও বন্ধ ছিল ৫-৬টি কারখানা। এসব কারখানার অধিকাংশই বিক্ষোভ শুরুর সময় থেকেই বন্ধ আছে।

সকাল সাড়ে ১১টার দিকে পুকুরপাড় এলাকায় বেশ কয়েকটি কারখানার সামনে শ্রমিকরা জিরাবো-বিশমাইল শাখা সড়ক অবরোধ করলে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যরা সেখানে পৌঁছে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। এ সময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ৬ জনকে আটক করা হয়। তবে তারা কেউ শ্রমিক নয় বলে জানা গেছে।

শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনা করে ১০ দিন বন্ধ থাকার পর গতকাল নাসা গ্রুপের কারখানাগুলো খুলে দেওয়ায় শ্রমিকরা কাজে যোগ দেন। কারখানাটির শ্রমিকরা জানান, মালিকপক্ষ তাদের সব দাবি মেনে নেওয়ায় তারা কাজে যোগ দিয়েছেন।

নাসা গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক খন্দকার নাইম উল হক বলেন, ‘১০ দিন বন্ধ থাকার পর আমরা সমস্যার ইতিবাচক সমাধানের মধ্য দিয়ে কাজ শুরু করতে পেরেছি। শ্রমিকরাও শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করছেন। উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে আমরা মালিক-শ্রমিক সম্মিলিতভাবে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।’

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, ‘আশুলিয়ায় ২ শতাংশের কম কারখানায় সমস্যা হচ্ছে। গিল্ডান, নাসা গ্রুপসহ যেসব কারখানার মালিক আন্তরিক ছিলেন, সেগুলোর সমাধান হয়ে গেছে। মালিকপক্ষ একটু আন্তরিক হলেই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।’

শনিবার রাতে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে ৪ জনকে আটক করেছে। তারা হলেন পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জের মোতালেব হোসেন (২৫), জয়পুরহাটের পাঁচবিবির সেলিম রেজা (২১), ভোলার চরফ্যাশনের মো. রাসেল (২৩) এবং নওগাঁর আত্রাইয়ের লিটন কুমার দাস (২৩)। আটকরা আশুলিয়ার নরসিংহপুর, ঘোষবাগ ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।

আশুলিয়া শিল্পপুলিশ-১ এর সুপার সারোয়ার আলম বলেন, ‘শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া স্বাভাবিক রয়েছে। শিল্পাঞ্চল এলাকায় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব এবং শিল্পপুলিশের সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে আছেন।’

গাজীপুরে স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরেছে কারখানাগুলো : সপ্তাহ জুড়ে নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে গাজীপুরে পোশাক কারখানার শ্রমিক ও চাকরিপ্রার্থী বহিরাগতরা আন্দোলন করে আসছিলেন। এ সময় সড়ক অবরোধসহ বেশ কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তবে গাজীপুরের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়া পুরোদমে চালু হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। টহল জোরদার করেছেন সেনা সদস্যরা। চলছে গোয়েন্দা নজরদারিও। মালিক ও শ্রমিকদের অভিযোগ, আন্দোলন করছে বহিরাগতরা। শিল্পে অস্থিরতা দূর করতে শ্রমিকরা সতর্ক অবস্থানে থেকে নির্বিঘ্নে কাজ করতে চান।

গতকাল সকাল থেকে গাজীপুরের কয়েকটি শিল্পকারখানায় গিয়ে দেখা গেছে, কারখানার মূল ফটকে অবস্থান করছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। টঙ্গী, বোর্ড বাজার, গাজীপুর সদর, কোনাবাড়ী ও কাশিমপুর এলাকায় শিল্প-কলকারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম চলতে দেখা যায়।

কারখানার শ্রমিক ও শিল্প পুলিশ সদস্যরা জানান, সেনাবাহিনী, বিজিবি থানা পুলিশ ও শিল্পপুলিশের যৌথ অভিযান শুরু হলে গত শুক্রবার থেকে গাজীপুরে কোথাও শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেনি।

কোনাবাড়ী এলাকার একটি কারখানার শ্রমিক কফিল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা যারা শ্রমিক কাজ করে টাকা পাই তারা এসব আন্দোলনের মধ্যে যাই না। বহিরাগতরা নানাভাবে উসকে শ্রমিকদের দিয়ে আন্দোলন করায়।’

শিল্পপুলিশের পরিদর্শক নিতাই চন্দ্র বলেন, ‘কোনোভাবেই যাতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হতে না পারে সে জন্য সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন কারখানা কর্র্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।’

গাজীপুর শিল্পপুলিশের সুপার মো. সারোয়ার আলম বলেন, ‘গাজীপুর জেলায় কোনো কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের খবর পাওয়া যায়নি। শিল্পপুলিশের একাধিক টিম বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। যৌথ বাহিনীর অভিযানও অব্যাহত আছে।’