তারেক রহমানের নামে কটূক্তির অভিযোগ তুলে বগুড়ায় আদালত চত্বরে একদল যুবক আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর আশরাফুল আলম ওরফে হিরো আলমের ওপর হামলা করেছে। গতকাল রবিবার দুপুর ১২টার দিকে জেলার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্বর থেকে চ্যাংদোলা করে রাস্তায় বের করে তাকে মারধর করা হয়। পরে কান ধরে উঠবস করানো হয়।
হিরো আলম গতকাল বগুড়ার ওই আদালতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সদ্য সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালের বিরুদ্ধে মামলা করতে গিয়েছিলেন। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (নন্দীগ্রাম আমলি আদালত) আদালতে মামলা করে বের হওয়ার সময় এজলাস কক্ষের ফটকে হামলার শিকার হন তিনি। আদালত প্রাঙ্গণে থাকা বহু মানুষের সামনে এ ঘটনা ঘটে। পাশেই থাকা পুলিশ সদস্যরাও তাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেননি। পরে স্থানীয় লোকজন আহত অবস্থায় উদ্ধার করে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
এ হামলার জন্য বিএনপি নেতাকর্মীদের দায়ী করেছেন হিরো আলম। তার অভিযোগ, হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বগুড়া আদালতের আইনজীবী সহকারী সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য রনি সরকার। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ভিউ বাড়াতে হিরো আলম নিজেই নিজের ওপর হামলার নাটক সাজিয়েছেন এবং বিএনপির কেউ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয় বলে দাবি করেছে বগুড়া জেলা বিএনপি।
হিরো আলমের ওপর হামলার কথা স্বীকারও করেছেন রনি সরকার। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘হিরো আলমের ওপর হামলায় আমি, বগুড়া বারের আইনজীবী ও বগুড়া জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হুদা নেতৃত্ব দিয়েছি।’
হামলার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘হিরো আলম বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে কটূক্তি করেছেন। দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এ কারণে তাকে আদালত প্রাঙ্গণে গণধোলাই দেওয়া হয়েছে।’
তবে তারেক রহমান সম্পর্কে কটূক্তির অভিযোগ অস্বীকার করে হিরো আলম বলেন, ‘আমি কখনো তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তি করিনি। ডিবির সাবেক প্রধান হারুন অর রশীদ আমার পরিবারকে জিম্মি করে রুহুল কবির রিজভীর বিরুদ্ধে মামলা করতে বাধ্য করেছিলেন। এ কথা আগেও বলেছি।’
হিরো আলমের ওপর হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বগুড়া জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হুদা। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘হিরো আলমের ওপর হামলার ঘটনার সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। হামলাকারীদের চিনি না। এ ঘটনায় আমার নাম কেন জড়ানো হচ্ছে, সেটা আমারও প্রশ্ন।’
জানা গেছে, গতকাল দুপুরে বগুড়ার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হিরো আলম ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসনে প্রচারণার সময় মারধরের শিকার হওয়া এবং ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি একই আসনে উপনির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে মামলা করেন। এতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, বগুড়া-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রেজাউল করিম তানসেন ও সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়ালকে আসামি করা হয়। দুপুর ১২টার দিকে আদালত চত্বরে হিরো আলম সাংবাদিকদের সঙ্গে মামলার বিষয়ে কথা বলার সময় পাঁচ-সাতজন যুবক তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগ এনে অতর্কিত হামলা চালায়। ওই যুবকরা হিরো আলমকে বেধড়ক মারধর করে আদালত চত্বরের বাইরের সড়কে নিয়ে গিয়ে কান ধরে ওঠবস করায়।
মারধরের শিকার হওয়ার পর সাংবাদিকদের হিরো আলম বলেন, ‘এক স্বৈরাচারের পতনের পর আরেক দল নিজেদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ শুরু করেছে। এইটা কি স্বাধীনতা? প্রকাশ্যে আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হলো। আমি কখনো তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তি করিনি। যদি কেউ তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তির ফুটেজ দেখাতে পারে তবে আমি জুতোর মালা গলায় দিয়ে ঘুরব।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন আমার পরিবারকে জিম্মি করে রিজভী সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা করিয়েছিল। এই কথা আগেও বলেছি। এরপরও আমাকে আদালতের মতো জায়গায় আপনাদের সামনে পেটানো হলো। যারা এ হামলা করেছে তাদের সবার ফুটেজ আছে। শনাক্ত করে এদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সবার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।’
ভিউ বাড়াতে বিএনপির নাম ব্যবহার করা হয়েছে দাবি বগুড়া বিএনপির : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ভিউ বাড়াতে হিরো আলম নিজেই নিজের ওপর হামলার নাটক সাজিয়েছেন এবং বিএনপির কেউ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয় বলে দাবি করেছে বগুড়া জেলা বিএনপি। গতকাল বিকেল ৫টায় দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি করেন জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাদশা বলেন, ‘বিএনপির নাম জড়িয়ে হিরো আলম হামলার নাটক সাজিয়েছেন। কোর্ট চত্বরে তার ওপর হামলার ঘটনায় বিএনপি তীব্র নিন্দা জানায়। একই সঙ্গে তিনি এ ঘটনায় বিএনপিকে দোষারোপ করেছেন, সেটির আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। বিএনপির কোনো নেতাকর্মী এর সঙ্গে জড়িত নয়। ষড়যন্ত্রকারীরা বিএনপির সুনাম নষ্ট করার চেষ্টা করছে। সব জায়গায় বিএনপিকে দোষারোপ করা হচ্ছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বারবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, দখলবাজি, চাঁদাবাজি কোনোভাবেই দল মেনে নেবে না।’
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর তালুকদার হেনা বলেন, ‘যারা হামলা করেছে তারা আমাদের দলের কেউ নয়। কারা হামলা করেছে, তা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে।’