আইনের সুযোগ নিচ্ছেন ফজলুল্লাহ!

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) চাইলেই সরানো যাবে না। সরাতে চাইলে সরকারকে এক মাসের নোটিস দিয়ে সরাতে হবে। একই ভাবে পদত্যাগ করতে চাইলেও এক মাসের সময় দিয়ে সরে যেতে হবে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আর এই নির্দেশনা সরকার দেবে ওয়াসা বোর্ডকে। পানি সরবরাহ ও পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থাপনা আইনে এমনই বলা আছে। আর এই সুযোগটি নিচ্ছেন চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ।

এ কারণেই পদত্যাগের দাবিতে একটি পক্ষ গত কয়েকদিন ধরে আন্দোলন করলেও ফজলুল্লাহ পদত্যাগ করছেন না। সর্বশেষ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। সেই কমিটির প্রধান গত শনিবার ওয়াসা ভবনে এসে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথাও বলে গেছেন।

যেখানে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদত্যাগ করেছেন সেখানে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহকে নিয়ে এত আন্দোলন হওয়ার পরও তিনি পদত্যাগ করছেন না কেন? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৯৯৬ সালের আইন অনুযায়ী আমাকে সরাতে হলে সরকারের কাছ থেকে লিখিত নোটিস আসতে হবে। আর সেই নোটিসপ্রাপ্তির এক মাস পর আমি দায়িত্ব ছেড়ে দেব। একইভাবে আমি পদত্যাগ করতে হলেও সরকারকে এক মাস সময় দিতে হবে। আইন তাই বলে, আমি তো আইনের বাইরে যেতে পারব না।’

আইনটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দিয়েছে ওয়াসা বোর্ড। সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি, প্রকৌশলী সংস্থার প্রতিনিধি, গ্রাহক প্রতিনিধি, সরকারের প্রতিনিধিসহ ১৩ সদস্যের পরিচালনা বোর্ড রয়েছে ওয়াসার। এই ১৩ জন থেকে একজনকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করা হয়। সেই সুপারিশের আলোকে সরকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে অনুমোদন দিয়ে থাকেন। এ বিষয়ে কথা হয় ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণ করতে হলে ওয়াসা বোর্ডের মাধ্যমে যেতে হবে। সরকার ওয়াসা বোর্ডকে নির্দেশনা দেবে এবং ওয়াসা বোর্ড এক মাসের সময় দিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণ করবে। একইভাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিজ থেকে সরে যেতে চাইলেও ওয়াসাকে এক মাস সময় দিতে হবে।’

তাহলে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কীভাবে নিয়োগ হবে, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বোর্ডের মনোনয়ন ও সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ হবেন।

তাহলে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কীভাবে পদত্যাগ করলেন, এ প্রশ্নে ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদত্যাগ আইনসম্মতভাবে হয়নি।’

তাহলে সরকার যদি ওয়াসা বোর্ড ভেঙে দেয় তাহলে কি ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওয়াসা বোর্ড ভাঙলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবারও ওয়াসা বোর্ড গঠন করতে পারবেন সরকারের অনুমোদনক্রমে। কিন্তু ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে যাবেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ওয়াসা বোর্ডের মাধ্যমে অপসারণ করতে হবে।’

এদিকে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে আনীত বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত করতে শনিবার এসেছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের মহাপরিচালক (পরিকল্পনা, পরীবিক্ষণ, মূল্যায়ন ও পরিদর্শন) মো. মাহমুদুল হাসান। ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণ কিংবা পদত্যাগ বিষয়েও তিনি চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ড চেয়ারম্যানের বক্তব্যকে সমর্থন করেন। তাহলে কি সরকার চাইলে তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থাপনা পরিচালককে সরাতে পারবে না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকার অন্য কোনো বিধিতে করতে চাইলে ভিন্ন বিষয়। তবে স্বাভাবিক নিয়মে পারবে না।’

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদত্যাগের দাবিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)’র ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেহেতু প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ পূর্ববর্তী সরকারের আমলের নিয়োগপ্রাপ্ত। আর আগের সরকারের আমলের সব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অন্তর্বর্তী সরকার বাতিল করেছে। তাই প্রকৌশলী ফজলুল্লাহকেও পদত্যাগ করতে হবে।

কিন্তু চাইলেই তো পদত্যাগ হবে না এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘বিধি অনুযায়ী যেভাবে সরানো প্রয়োজন তাকে সেভাবে সরাতে হবে।’

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক বিবেচনায় একই বছরের জুলাই মাসে ওয়াসার চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান চট্টগ্রাম ওয়াসার সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ। পরবর্তী সময়ে ওয়াসা বোর্ড গঠন হওয়ার পর তাকে এমডি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর ৮ দফায় বিভিন্ন মেয়াদে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফজলুল্লাহর সর্বশেষ মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালে নভেম্বরে।

প্রকৌশলী ফজলুল্লাহর বিরুদ্ধে অনেক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আমি এক টাকার দুর্নীতিও করিনি। সব প্রকল্প সরকারি অনুমোদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়েছে।’

এদিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত করতে আসা স্থানীয় সরকার বিভাগের মহাপরিচালক (পরিকল্পনা, পরীবিক্ষণ, মূল্যায়ন ও পরিদর্শন) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘চট্টগ্রাম ওয়াসার বিভিন্ন প্রকল্প ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয়ের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছি। এগুলো পর্যালোচনা করে মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট দেওয়া হবে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয় নেবে।’

উল্লেখ্য, এর আগে গত সপ্তাহে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বোর্ড ভেঙে দিয়ে এবং সিডিএ চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিল করে নতুন একজনকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল সরকার।