ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় তৈরি পোশাক কারখানায় বেতন, হাজিরা বোনাস ও টিফিন বিল বৃদ্ধি এবং শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধসহ নানা দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত আছে। এর জেরে গতকাল সোমবার জামগড়া ও নরসিংহপুরসহ আশপাশের এলাকার অধিকাংশ কারখানা ছুটি ও বন্ধ ঘোষণা করে কারখানা কর্র্তৃপক্ষ। এদিন দুপুর ২টা পর্যন্ত অন্তত ৮০টি কারখানা বন্ধ ও ছুটি ঘোষণা করা হয় বলে জানিয়েছে শিল্পাঞ্চল পুলিশ। এ ছাড়া শ্রমিকদের দাবি পূরণ করতে না পারায় আগে থেকেই বেশ কয়েকটি কারখানার ফটকে কারখানা বন্ধ ও ছুটির নোটিস টানিয়ে দেওয়া হয়। তবে সাভারের অন্য এলাকার কারখানাগুলোয় গতকাল শ্রমিকরা কাজ করেছে বলে জানিয়েছে শিল্পাঞ্চল পুলিশ।
এদিকে গতকাল আশুলিয়ার টেক্সটাউন গ্রুপের সামনে শ্রমিক বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহের সময় হামলার শিকার হয়েছেন তিন গণমাধ্যমকর্মী। এর আগে রবিবার সন্ধ্যায় জামগড়া শিমুলতলা এলাকায় ইউফোরিয়া অ্যাপারেলস লিমিটেডের বিক্ষোভরত শ্রমিকরা কারখানায় ভাঙচুরসহ র্যাবের একটি গাড়িতে আগুন ও সেনাসদস্যদের একটি গাড়ি ভাঙচুর করে।
আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের কোথাও গতকাল সড়ক অবরোধ কিংবা কারখানায় হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। শিল্পাঞ্চলের বেশিরভাগ কারখানায়ই উৎপাদন স্বাভাবিক ছিল। তবে আগে থেকেই দাবি-দাওয়া নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ চলছিল এমন কারখানার শ্রমিকরা কাজে না ফেরায় কর্র্তৃপক্ষ কারখানাগুলো ছুটি ঘোষণা করে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে বিভিন্ন কারখানার সামনে অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি সড়কে টহল দেন সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও এপিবিএন সদস্যরা।
শিল্পমালিকরা বলছেন, দেশের তৈরি পোশাক শিল্প অস্থিতিশীল করে তুলতে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত চলছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিভিন্ন জায়গায় নানা অজুহাতে আন্দোলন ও কারখানা ভাঙচুর শুরু করে দুর্বৃত্তরা। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে, ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখে পড়বে পোশাক খাত। যার ফায়দা নিতে প্রস্তুত আছে বেশ কিছু দেশ। আশুলিয়ার এস সুহি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক লিমিটেড কারখানার মানবসম্পদ এবং কমপ্লায়েন্স বিভাগীয় প্রধান সাইফুদ্দিন মিয়া বলেন, ‘তৈরি পোশাক শিল্পে সরাসরি প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক নিয়োজিত থাকলেও পরোক্ষভাবে উপকারভোগী কমপক্ষে দুই কোটি মানুষ। যারা বিভিন্ন কায়দায় অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে, আমার মনে হয় তারা শ্রমিক না। একটি গোষ্ঠীর হয়ে পরিকল্পিতভাবে দেশের পোশাক খাত ধ্বংস করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে। ৪০-৫০ জন লোক রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বিভিন্ন কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করলে বাধ্য হয়ে শ্রমিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়। তবে আমরা শ্রমিকদের বিভিন্নভাবে কাউন্সেলিং করে কাজে রাখার চেষ্টা করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার এবং প্রশাসনেরও উচিত শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা। প্রতিদিন আমাদের কমপক্ষে ৫০ হাজার পিস পোশাক উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। সময়মতো ক্রেতাদের অর্ডার করা মালামাল বুঝিয়ে দিতে না পারলে তারা আমাদের দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। তাতে করে বিশাল জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি।’
বকেয়া পরিশোধের দাবিতে গতকাল সকালে ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের মূল ফটকের ভেতরে মানববন্ধন করে চার বছর আগে বন্ধ হওয়া লেনী ফ্যাশন ও লেনী অ্যাপারেলসের শ্রমিকরা। ভুক্তভোগী শ্রমিকরা জানায়, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লেনী ফ্যাশন ও লেনী অ্যাপারেলস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ওই সময় কারখানা দুটির শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেপজার পক্ষ থেকে যেকোনো একটি কারখানা বিক্রি করতে পারলে সেই টাকা দিয়ে সবার বকেয়া পরিশোধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। ছয় মাস আগে একটি কারখানা ৮৩ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছে। শ্রমিকদের পাওনা ৬৬ কোটি টাকা। বিক্রির টাকা ব্যাংকে জমা থাকলেও শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করা হচ্ছে না। বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান চান তারা।
আশুলিয়ায় শ্রমিক বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহের সময় টেক্সটাইল ও পোশাকবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেক্সটাইল টুডের এক প্রতিবেদক ও দুই ফটোসাংবাদিকের ওপর হামলা হয়েছে। গতকাল সকাল ১০টার দিকে টেক্সটাউন গ্রুপের সামনে এ ঘটনা ঘটে। হামলায় আহতরা হলেন প্রতিবেদক এমএ মোহাইমিন তানিম এবং ফটোসাংবাদিক ইমন পাটোয়ারী ও আশরাফুল আলম। তাদের মধ্যে ইমন পাটোয়ারী গুরুতর আহত হয়েছেন।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর সুপার সারোয়ার আলম বলেন, ‘অব্যাহত শ্রমিক অসন্তোষের কারণে আজ (গতকাল) বন্ধ রয়েছে ৮০-৯০টি কারখানা। মূলত শ্রমিকদের দাবিগুলোর বিষয়ে কারখানা কর্র্তৃপক্ষ কোনো সিদ্ধান্তে আসতে না পারায় আগে থেকেই কয়েকটি কারখানা বন্ধ ও ছুটির নোটিস টানিয়ে দেয়। এ ছাড়া কিছু কারখানায় শ্রমিকরা কাজ না করায় সেগুলো ছুটি দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য কারখানায় উৎপাদন চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিল্প পুলিশের পাশাপাশি মাঠে কাজ করছেন বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা।’
এর আগে রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে জামগড়া শিমুলতলা এলাকায় ইউফোরিয়া অ্যাপারেলস লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা হাজিরা বোনাস, টিফিন বিল বৃদ্ধি, গত মাসের বেতন পরিশোধসহ নানা দাবিতে বিক্ষোভ করেন। উত্তেজিত শ্রমিকরা কারখানায় ভাঙচুরসহ র্যাবের একটি গাড়িতে আগুন ও সেনাসদস্যদের একটি গাড়ি ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
ইউফোরিয়া গার্মেন্টসের শ্রমিকরা অভিযোগ করে বলেন, কয়েক দিন ধরে টিফিন বিল ও রাত্রিকালীন অতিরিক্ত ডিউটির টাকা বৃদ্ধি, ছুটি বাড়ানোসহ নানা দাবি নিয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। দুদিন আগে বৈঠকের সময় তাদের এক সহকর্মীকে মারধর করে আহত করে কারখানার কর্মীরা। এ ছাড়া প্রতি মাসের ৭ তারিখ বেতন পরিশোধের কথা থাকলেও তা করছে না মালিকপক্ষ। উল্টো সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা কারখানার ভেতরে প্রবেশ করে শ্রমিকদের এলোপাতাড়ি পিটিয়ে আহত করেন। এতে অন্তত ২০ শ্রমিক আহত হয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে র্যাব-৪, সিপিসি-২-এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর জালিস মাহমুদ খান বলেন, ‘আন্দোলনকারী শ্রমিকদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হলেও একপর্যায়ে শ্রমিকরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তারা র্যাবের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের চেষ্টাসহ ভাঙচুর করে। সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে। আমাদের টিম ছায়াতদন্ত করছে। শিল্পাঞ্চলে যারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতি তৈরির চেষ্টা করছে, যেসব দুষ্কৃতকারীকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’
টঙ্গীতে শ্রমিক বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ : গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীতে ১৩ দফা দাবিতে কর্মবিরতি ও সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে গার্মেন্টস এক্সপোর্ট ভিলেইজ এবং ব্রাভো অ্যাপারেলস লিমিটেড নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা। গতকাল সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত জয়দেবপুর-টঙ্গী সড়ক অবরোধ করে রাখে তারা। আন্দোলনরত শ্রমিকরা জানায়, গত রবিবার তারা কারখানার সামনে অবস্থান নেওয়ার পর মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হলেও দাবিগুলো মানা হয়নি। দাবি মানা না হলে কোনো শ্রমিক-কর্মচারী কাজে যোগ দেবে না।
অন্যদিকে গতকাল সকাল ৯টা থেকে টঙ্গী বাজারের উল্টো পাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সংলগ্ন বাটা সু কোম্পানির শ্রমিকরা কারখানার সামনে বিক্ষোভ করে। চাকরি স্থায়ীকরণ, বেতন বৃদ্ধি, পারিবারিক চিকিৎসা সুবিধাসহ আট দফা দাবিতে তারা বেশ কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে।
পোশাক শিল্পে অস্থিরতার বিষয়ে বিজিএমইএর পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজকেও (সোমবার) আমাদের অনেক কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়। বিজিএমইএতে শ্রমিক প্রতিনিধির সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মালিকপক্ষও ছিল। একটা সমাধানে আসা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাড়তি কোনো কিছু যাতে না হয় সেজন্য মালিকরা নিজেরাই বেশ কিছু কারখানা বন্ধ রেখেছেন। এ ছাড়া শ্রমিকরা নিজ কারখানা থেকে বেরিয়ে সচল কারখানাগুলোতেও হামলা করার ভয়ে কিছু কারখানা বন্ধ করে দেয় মালিকপক্ষ। পোশাক শিল্প ছাড়াও এগুলোর মধ্যে আছে জুতা ও ওষুধ কারখানাও।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকা প্রসঙ্গে মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘শ্রমিকরা যদি কাজ বন্ধ করে বসে থাকে তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু করার নেই। কারখানার বাইরে কেউ কোনো ঘটনা ঘটালে সেখানে গিয়ে তারা প্রতিরোধ করতে পারেন।’
শ্রমিকদের বিক্ষোভের পেছনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। এ বিক্ষোভে তৃতীয়পক্ষের হাত আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘এখন যে আন্দোলন হচ্ছে, তা নিয়মিত কোনো ঘটনার মতো নয়। এখানে রাজনৈতিক ইন্ধনও থাকতে পারে। এ ধরনের ঘটনা আগে খুব একটা চোখে পড়েনি।’