ছাত্ররাজনীতির নতুন ধারা ঢাবিতে

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির ছাত্র আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান কিংবা নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সোনালি ইতিহাসকে ছাপিয়ে ছাত্ররাজনীতি এখন কলুষিত এক অধ্যায়। দুই দশকের বেশি সময় ধরে ছাত্ররাজনীতি মানে নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং-লবিং, অন্তর্দ্বন্দ্ব, প্রতিপক্ষের সঙ্গে, সিটবাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্যাতন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়গুলো দিনে দিনে শিক্ষার্থীদের রাজনীতিবিমুখ করতে ভূমিকা রেখে এসেছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতি বন্ধের দাবি উঠেছে। ইতিমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পক্ষে-বিপক্ষে মত রয়েছে। কেউ কেউ নিষিদ্ধের পক্ষে থাকলেও কেউ কেউ লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি বাদ দিয়ে নতুন ধারায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। তারা বলছেন, ছাত্ররাজনীতি ছাড়া ছাত্ররা তাদের অধিকার আদায় করতে পারবেন না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস অনেক পুরনো হলেও এরশাদের পতনের পর সেখানে রাজনীতির ধরন পাল্টাতে থাকে। দলীয় রাজনীতির প্রভাবে বিঘ্ন ঘটে ক্যাম্পাসের ছাত্র সংগঠনগুলোর সহাবস্থান। এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার। সে সময় শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতিতে বিএনপি সমর্থক সংগঠনের একচ্ছত্র আধিপত্য বা দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রদলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হতে হয় ২০০৯ সালে। ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে একক রাজত্ব করে ছাত্রলীগ। অর্থাৎ যখন যে দল ক্ষমতায় ছিল সে দলের ছাত্র সংগঠনই একক আধিপত্য বিস্তার করেছে। বিশেষ করে হলগুলো দখল করেই চলেছে তাদের সব নেতিবাচক কর্মকাণ্ড।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ যে পরিমাণ নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছে, তাতে শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোয় গণরুম, গেস্টরুম সৃষ্টি করে কম হলেও হাজারখানেক শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করেছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ক্যানটিনে ‘ফাও’ খাওয়া, শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করা তাদের রুটিনওয়ার্কে পরিণত হয়েছিল। এমন প্রেক্ষাপটে গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি ওঠে। তবে ঢাবিতে ছাত্ররাজনীতি একেবারে বন্ধ না করার পক্ষেই মত বেশি। তাই সেখানে রাজনীতি থাকলেও প্রচলিত ধারার বাইরে নতুন কোনো ধরনেই থাকতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

ঢাবির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্যাম্পাসে পুরোপুরি রাজনীতি নিষিদ্ধ না হলেও তা সীমিত হয়ে আসবে। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল এবং অ্যাকাডেমিক স্থানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যাবে না এমন সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের বৃহৎ একটি অংশ নতুন ধারায় রাজনীতি চালু রাখার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে।

তারা বলছেন, নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে ৯০ শতাংশই হয় হলকেন্দ্রিক রাজনীতিতে। হলে রাজনীতি বন্ধ করা গেলে গণরুম, গেস্টরুম, শিক্ষার্থী নির্যাতন বন্ধ হবে। তাতে ফিরবে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ।

ছাত্র সংগঠনগুলোকেও এতে দ্বিমত পোষণ করতে দেখা যায়নি বরং তারাও চান রাজনীতি থাকুক, তবে আগের রূপে নয়। তার জন্য কিছুটা সীমিত করার প্রয়োজন হলেও তাতে অসম্মতি নেই বলে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন একাধিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আবাসিক ও অ্যাকাডেমিক স্থানে সব ধরনের দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধসহ ছাত্ররাজনীতি নিয়ে ৮ দফা প্রস্তাবনা দিয়েছে ইউনিভার্সিটি রিফর্ম ইনিশিয়েটিভ (ইউআরআই)। তাদের প্রস্তাবে রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক স্থান (হল, হোস্টেল প্রভৃতি) এবং অ্যাকাডেমিক স্থানে (অনুষদ, বিভাগ, ইনস্টিটিউট প্রভৃতি) সব ধরনের দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি (সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং, সম্মেলন, র‌্যালি, শোডাউন প্রভৃতি) নিষিদ্ধ করা হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক পরিচয় বা সংশ্লিষ্টতা ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী উল্লিখিত স্থানগুলোয় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাতে পারবে না। কোনো শিক্ষার্থী যদি উল্লিখিত কর্মকা-গুলোয় জড়ান, তবে তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং এই মর্মে সিন্ডিকেটে আইন পাস করতে হবে।

এ বিষয়ে প্ল্যাটফর্মটির মুখপাত্র আদনান মুস্তারি বলেন, ‘দেশের সুস্থ বিকাশের জন্য ছাত্ররাজনীতির সব পঙ্কিলতা দূর করে শিক্ষাঙ্গন ও রাজনীতির সঙ্গে একটা পরিষ্কার বোঝাপড়া থাকা জরুরি। মতপ্রকাশ করার স্বাধীনতা সবার আছে। আমরা কারও সাংবিধানিক অধিকার বঞ্চিত করার পক্ষে না। রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে শিক্ষার্থীরা হলে থাকতে পারবেন, তবে সেখানে তারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবেন না।’

আবাসিক হল এবং অ্যাকাডেমিক স্থানে রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী আশিক বলেন, ‘ক্যাম্পাসের সামগ্রিক পরিবেশ পরিস্থিতির আলোকে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে এটি সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও সমৃদ্ধ প্রস্তাবনা বলে আমি মনে করি।’

আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী ইমরান উদ্দিন বলেন, হল এবং অ্যাকাডেমিক এরিয়াগুলো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে, বাকি জায়গা রাজনীতি উন্মুক্ত করা যায়। এটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারলে সামনে দলীয় সরকার এলেও একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ কম থাকবে বলে মনে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে হলের সিট প্রশাসন নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে মোটামুটি সুস্থধারা রাজনীতি তৈরি হবে।

এদিকে শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলে ইতিমধ্যে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে হল প্রশাসন। আরও বেশ কয়েকটি হলে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে। এসএম হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, ‘আমরা হলে শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এটির বাস্তবায়ন করা হবে।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘ক্যাম্পাসে এত দিন যে রাজনীতি ছিল তা লেজুড়বৃত্তিক। আমরা লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি চাই না। আমরা এমন রাজনীতি চাই, যার দ্বারা ছাত্র, সমাজ এবং দেশের মানুষের উপকার হবে। ছাত্ররাজনীতি ছাড়া আমরা আমাদের অধিকার আদায় করতে পারব না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজীমউদ্দিন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যে প্রক্রিয়ায় আগে রাজনীতি করেছি, সেটি হলো দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি। শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই রাজনীতি করাটা খুব জরুরি। এখানে সংস্কার দরকার।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন মত আসছে। বিষয়টি আমরা সব মহলের সঙ্গে আলাপ করতে চাই। অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরে বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলতে চাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সর্বজনীন প্রতিষ্ঠান, সবার মতামত গুরুত্বপূর্ণ। সব পক্ষের বক্তব্য শুনে একটা মোটামুটি ঐকমত্যের ভিত্তিতেই আমরা একটা সিদ্ধান্তে যেতে চাই। হঠাৎ করে কাঁচা সিদ্ধান্ত নিতে চাই না।’