সম্পর্ক জোরদারে অর্থনৈতিক সহায়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আসছে চলতি সপ্তাহে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই হবে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কোনো প্রতিনিধিদলের সফর। এই সফরে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক ও  অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

এরমধ্যে আগামী শনি ও রবিবার অন্তর্বর্তী সরকার ও এর প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংলাপ অনুষ্ঠানের বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে ওয়াশিংটন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক বাংলাদেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করার কাজে সহায়তার অংশ হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র এই সংলাপের পরিকল্পনা নিয়েছে বলে ব্রিটেনের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে মঙ্গলবার এই তথ্য জানানো হয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, শ্রম অধিকার, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক সংস্কারসহ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে আলোচনা করবে ঢাকা-ওয়াশিংটন। প্রতিনিধিদলটির সফরের সময় দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে উভয়ের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে। এ সময় ওয়াশিংটন ঢাকার প্রত্যাশা ও চাহিদার বিষয়টিও জানতে চাইবে। এরপর দেশে ফিরে গিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। অন্তর্বর্তী সরকার এরই মধ্যে দেশের সংস্কার প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের সহায়তা নিয়ে আলোচনা করছে। সংস্কার প্রক্রিয়ায় সরকারের অগ্রাধিকারের খাতগুলোতে কোথায় কোথায় যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার সুযোগ আছে, তাও আলোচনায় আসতে পারে।

জানা গেছে, প্রতিনিধিদলে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ, পররাষ্ট্র দপ্তর, বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার প্রতিনিধিরা থাকছেন। তাদের মধ্যে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের জ্যেষ্ঠ পরিচালক লিন্ডসে ফোর্ড, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। এ বছরের মে মাসের পর এটি চলতি বছরে ডোনাল্ড লুর দ্বিতীয় ঢাকা সফর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলটি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পাশাপাশি অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। এ নিয়ে ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের আলোচনা হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বৈঠকের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলটি ঢাকায় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের নেতা, রাজনৈতিক দলের নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময় করতে পারে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন ঘটেছে ৫ আগস্ট। ওইদিন প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। তার পদত্যাগের তিনদিন পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর আগামী ১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রথমবারের মতো উচ্চ পর্যায়ের অর্থনৈতিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই সংলাপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ৮৪ বছর বয়সী নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও বাংলাদেশের অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অংশ নেবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ, পররাষ্ট্র, বাণিজ্য দপ্তর ও ইউএসএইডের কর্মকর্তারা থাকবেন প্রতিনিধিদলে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব ও অর্থ দপ্তরের আন্তর্জাতিক অর্থায়নবিষয়ক সহকারী আন্ডার সেক্রেটারি ব্রেন্ট নেইম্যান ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক দুর্বলতা মোকাবিলা করতে পারবে এবং অব্যাহত প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করতে পারবে বলে আশাবাদী যুক্তরাষ্ট্র। নেইম্যান বলেন, ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের অব্যাহত সম্পৃক্ততার জন্য মার্কিন সমর্থনের ওপর জোর দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। কারণ, বাংলাদেশ আর্থিক স্থিতিশীলতা উন্নত করে এবং দুর্নীতি কমিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চায়।

প্রসঙ্গত, গত মাসে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের বিনিয়োগকারীদের বরাত দিয়ে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশ। তবে সম্প্রতি রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিগত সরকারের আমলে বিপুল অর্থ পাচারের কারণে দেশের অর্থনীতি বেশ খানিকটা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশের চলমান আন্তর্জাতিক ক্রেতারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশের কাছে ক্রয়াদেশ স্থানান্তর করেছে। আর সেই সময়েই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে গার্মেন্টস শিল্পে সংস্কার বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে, যার মধ্যে ট্রেড ইউনিয়নকে অপরাধী মুক্তকরণ উল্লেখযোগ্য। ড. ইউনূসও পোশাক উৎপাদনকারীদের আরও ক্রয়াদেশ পাওয়ার জন্য শ্রম নীতিমালা সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের শ্রম অধিকারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বিগত সরকারের সময় থেকেই বাংলাদেশের শ্রম আইন সংশোধনের বিষয়ে কথা বলে আসছিল ওয়াশিংটন। সরকারকে পরিস্থিতি উন্নয়নে ১১ দফা সুপারিশ করেছিল। মার্কিন প্রতিনিধিদলের আসন্ন সফরে শ্রম অধিকারের বিষয়টি আসবে। কারণ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে শ্রম পরিস্থিতি সব সময়ই যুক্তরাষ্ট্রে অগ্রাধিকার তালিকায় থাকে।  শ্রমিক অধিকারের বিষয়টি তাদের কাছে আর্থিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের অন্যতম পূর্বশর্ত।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন সংস্থার (ডিএফসি) কাছ থেকে বাংলাদেশের সহায়তার বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে কয়েক বছর ধরে। এবার মার্কিন প্রতিনিধিদলটি ডিএফসির মতো প্রতিষ্ঠান থেকে সহায়তার ক্ষেত্রে শ্রম অধিকারের বিষয়টি আলোচনায় আনতে পারে। এছাড়া গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকারের বিষয় মার্কিন প্রতিনিধিদলের আলোচনায় প্রাধান্য থাকবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন তথা ডেমোক্র্যাট পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম দিক হচ্ছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এ নিয়ে তারা অনেক আলোচনা করেছে।

এদিকে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পরিসরে তীব্র সমালোচনা ছিল। এর মধ্যে গত ৩০ আগস্ট নতুন সরকার গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করেছে। গুমের ঘটনাগুলোর বিচারে তদন্ত কমিশনও গঠন করা হয়েছে। ফলে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক সংস্কারে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পেতে পারে। প্রতিনিধিদলের সফরে বিষয়টি আলোচনা হবে।