পোশাক শিল্পে ‘অসন্তোষ’

গাজীপুরে ফের বিক্ষোভ-ভাঙচুর ২৫ কারখানায় ছুটি

কয়েক দিন শান্ত থাকার পর বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন দাবিতে গাজীপুরের কয়েকটি এলাকায় পোশাক কারখানার শ্রমিকরা গতকাল মঙ্গলবার ফের বিক্ষোভ করেছেন। বিক্ষোভকারীরা কয়েক দফায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ এবং কয়েকটি কারখানা ভাঙচুর করেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার ২৫টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কারখানা কর্র্তৃপক্ষ। কারখানা বন্ধ ঘোষণা করায় দুপুরের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

এদিকে ঢাকার উপকণ্ঠে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় গত কয়েক দিন ধরে নানা দাবিতে বিভিন্ন কারখানায় চলমান শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গতকাল সকালে নির্দিষ্ট সময়ে শ্রমিকরা কারখানায় প্রবেশ করলেও কাজ না করায় জামগড়া, নরসিংপুর ও ঘোষবাগ এলাকার ৪০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া আরও ১০টি কারখানায় শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করেন বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ।

গাজীপুরের বিভিন্ন জায়গায় গতকাল সকাল থেকে শ্রমিকদের বিক্ষোভ শুরু হয়। সকাল ৮টার দিকে সদর উপজেলার হোতাপাড়া এলাকার এলিগ্যান্টস গার্মেন্টসের শ্রমিকরা তাদের আগস্ট মাসের পুরো বেতন পরিশোধ এবং ওভারটাইমের টাকা প্রদানসহ বিভিন্ন দাবিতে কারখানার সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা মিছিল নিয়ে সকাল সোয়া ৯টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে জয়দেবপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের বুঝিয়ে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দিলে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে যান চলাচল শুরু হয়।

বাঘেরবাজারের নতুন বাজার এলাকার এসএম নিটওয়্যার লিমিটেডের শ্রমিকরা সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কারখানায় ঢুকে হাজিরা বোনাস বৃদ্ধিসহ ১০টি দাবিতে কর্মবিরতির ঘোষণা দেয়। এরপর দুপুর ১২টার দিকে অ্যাসরোটেক্স লিমিটেডের শ্রমিকরা কারখানার প্রধান ফটকে ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কারখানাটিতে ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরে এসএম নিটওয়্যার ও অ্যাসরোটেক্স লিমিটেডের শ্রমিকরা অ্যাপারেলস-২১ লি. ও গ্রীণ ফাইবার কম্পোজিট লিমিটেড কারখানার ফটকে গেলে ওই দুটি কারখানায়ও ছুটি ঘোষণা করে কারখানা কর্র্তৃপক্ষ। দুপুর ১টার দিকে শ্রমিকরা চলে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

এ ছাড়া পাঁচ মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে নগরীর হাতিয়াব এলাকায় ভার্গো এমএইচ লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা কারখানার সামনে বিক্ষোভ করে। হোসনে আরা বেগমসহ কারখানাটির একাধিক শ্রমিক বলেন, তারা সাতশর বেশি কর্মী কারখানাটিতে কাজ করেন। তাদের পাঁচ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। বেতন পরিশোধের জন্য বিভিন্ন সময়ে তারিখ ঘোষণা করা হলেও কথা রাখছে না মালিকপক্ষ। গতকাল কাজে যোগ দিতে গিয়ে কারখানার ফটকে বন্ধের নোটিস দেখতে পান। এমন পরিস্থিতিতে তারা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে দুপুর ২টার দিকে পোড়াবাড়ি এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন। খবর পেয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেখানে গিয়ে শ্রমিকদের বুঝিয়ে কারখানার দিকে নিয়ে যান। এ সময় এক ঘণ্টা ওই মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল।

এর আগে সকালে শ্রীপুরের গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী এলাকার মেঘনা গ্রুপের হাই ফ্যাশন কারখানার শ্রমিকরা ১৪ দফা দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করে। একপর্যায়ে তারা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন। এ সময় পাশের হাউ আর ইউ টেক্সটাইল লিমিটেডের শ্রমিকদের বের করে আনতে গেলে হামলার শিকার হন হাই ফ্যাশনের শ্রমিকরা। তখন উত্তেজিত শ্রমিকরা হাউ আর ইউ টেক্সটাইলে ঢুকে ভাঙচুর করে।

টঙ্গীতে আন্দোলনের মুখে এমট্রানেট গ্রুপ লিমিটেড শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি মেনে নিয়েছে। সকাল থেকে কারখানার সামনে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। পরে দুপুর আড়াইটার দিকে মালিকপক্ষ, পুলিশ, ছাত্র প্রতিনিধি ও আন্দোলনকারী শ্রমিকদের মধ্যে বৈঠকে শ্রমিকদের দাবি মেনে নেয় মালিকপক্ষ। তবে কারাখানাটির ‘অসাধু’ কর্মকর্তাদের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখেন শ্রমিকরা। তাদের সঙ্গে অংশ নেয় পিনাকি গ্রুপ, যমুনা, ড্রেসম্যান ও নোমান গ্রুপের দুই থেকে তিন হাজার শ্রমিক।

এ ছাড়া টঙ্গীর এক্সপোর্ট ভিলেজ এবং গ্লোবাল গার্মেন্টসের শ্রমিকরাও বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ করে। তারা জয়দেবপুর-টঙ্গী আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করে।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশ-২ এর সুপার সারোয়ার আলম বলেন, ‘আজ (গতকাল) বিভিন্ন দাবিতে আবারও শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। সকাল থেকে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা নানা দাবি নিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে ২৫টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কারখানা কর্র্তৃপক্ষ শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনায় দুপুরের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেনাবাহিনী ও বিজিবির সঙ্গে মিলে পুলিশ কাজ করছে।’

আশুলিয়ায় ৪০ কারখানায় ছুটি : শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় গত কয়েক দিনে যেসব এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটছে, সেসব এলাকায় মোতায়েন রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সকাল থেকে বেশ কয়েকটি কারখানায় কাজ বন্ধ রেখে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন কারখানার সামনে মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান, র‌্যাব সদস্য ও পুলিশের রায়ট কার। কারখানাগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থায় থাকতে দেখা গেছে। দুপুর পর্যন্ত কারখানাসংলগ্ন কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

শিল্প পুলিশ জানায়, সকালে শ্রমিকরা নির্ধারিত সময়ে কারখানায় উপস্থিত হয়। কিন্তু পরে কিছু কারখানায় কাজ বন্ধ করে বসে থাকায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। আশপাশের কারখানায় ছুটি দেওয়ার পর নিরাপত্তার স্বার্থে আরও কিছু কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।

জনরন সোয়েটার কারখানার এইচআর অ্যাডমিন অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স ম্যানেজার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘বিজিএমইএর নির্দেশনা মেনে আমরা কারখানা পরিচালনা করছি। এর মধ্যে হঠাৎ করে বহিরাগত কিছু লোকজন কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমাদের লিঙ্কিং এবং ট্রিমিং শাখা ছুটি ঘোষণা করা হলেও অন্যান্য শাখায় কাজ চলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে কারখানায় হামলা, ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেওয়া হলেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। শিল্প রক্ষায় শ্রমিকরা সচেতন হলেও কারখানা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা সম্ভব। অন্যথায় এই শিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে। সময়মতো পোশাক উৎপাদন এবং রপ্তানি করতে না পারলে বায়াররা আমাদের দেশ থেকে অন্যত্র চলে গেলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা কষ্টকর হয়ে যাবে।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাতের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সোমবার সন্ধ্যায় বিজিএমইএ কারখানা মালিক, শ্রমিকনেতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে কিছু দাবির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার পর আজ (গতকাল) অধিকাংশ কারখানা সচল রয়েছে। তবে কিছু কারখানা আগে থেকে বন্ধ এবং কিছু কারখানায় শ্রমিকরা অভ্যন্তরীণ কিছু দাবিতে কর্মবিরতি পালন করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিজিএমইএ থেকে হাজিরা বোনাস ও টিফিন বিল বৃদ্ধি, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত না করা, নারী-পুরুষের বৈষম্য করা হবে না এমন সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা খুবই ইতিবাচক। পাশাপাশি শ্রমিকদের অন্য যেসব দাবি রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কারখানার মালিকপক্ষ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। এখন এ বিষয়টির সমাধান হলে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’

শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলম বলেন, ‘বেশকিছু দিন ধরেই বিভিন্ন দাবি আদায়ে আন্দোলন করে আসছে শ্রমিকরা। আমরা তাদের সঙ্গে মালিকপক্ষকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করছি। কিছু কারখানায় আবার নতুন করে দাবি আদায়ে আন্দোলন শুরু করায় আজ (গতকাল) ৪০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে অন্যান্য কারখানায় স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে শিল্প পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব সদস্য ও পুলিশের রায়ট কার প্রস্তুত রয়েছে।’