দুই দিনে সিএমপির ৫৯ কনস্টেবল ডিএমপিতে বদলি

পুলিশ সদর দপ্তরের পৃথক প্রজ্ঞাপনে দুই দিনের ব্যবধানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ৫৯ জন কনস্টেবলকে বদলির ঘটনায় ‘চট্টগ্রামের বাসিন্দা’ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বদলি আতঙ্ক এবং অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ আইনে নিজ জেলায় চাকরির সুযোগ না থাকলেও মেট্রোপলিটন পুলিশ আইনে নিজ জেলায় চাকরি করতে না পারার মতো কোনো নিয়ম নেই। শুধুমাত্র চট্টগ্রাম ব্যতীত অন্য মেট্রোপলিটনগুলোতে নিজ জেলার পুলিশ সদস্যরা ঠিকই চাকরি করছেন, তাহলে সিএমপির ক্ষেত্রে ভিন্নতা বা বৈষম্য কেন— প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের।

জানা গেছে, গত ১০ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মাহবুবুল করিম স্বাক্ষরিত দুটি পৃথক আদেশে দেশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত ৮৭ জন কনস্টেবলকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে (ডিএমপি) বদলির আদেশ জারি করেন। এরমধ্যে সিএমপিতে কর্মরত চট্টগ্রামের বাসিন্দা ৩৬ জন। এই ৩৬ জন কনস্টেবলকে আগামী ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

এর আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর একই কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত পৃথক আদেশে দেশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত ৪৮ জন কনস্টেবলকে ডিএমপিতে বদলির আদেশ জারি করা হয়। এরমধ্যে সিএমপিতে কর্মরত চট্টগ্রামের বাসিন্দা আছেন ২৩ জন। তাদেরকে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে দুই দিনের ব্যবধানে ৫৯ জনকে ডিএমপিতে বদলির আদেশ জারি করল পুলিশ সদর দপ্তর। 

দুই দিনে বদলিকৃত ৫৯ জন কনস্টেবল চট্টগ্রামেরই বাসিন্দা বলে সিএমপির দায়িত্বশীল সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে। সিএমপির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সিএমপি থেকে চাঁটগাইয়্যা তাড়ানোর পেছনে সাবেক এক পুলিশ কমিশনার, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এবং কোতোয়ালী থানার সাবেক এক ওসি জড়িত। তারা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, নিজ  জেলায় চাকরি করলে পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। যদি এমনটি হয় তাহলে দেশের অন্য মেট্রো ইউনিটের পুলিশ সদস্যরা কি ফেরেশতা, তারা কিভাবে নিজ জেলায় চাকরি করছেন?’

জানা গেছে, ২০২৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর  ৫৫ জন,  ২০২১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ৩৬ জন, একই বছরের ২৭ মে ১১জন কনস্টেবলকে সিএমপি থেকে দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে বদলি করা হয়েছিল। যাদের সবাই ছিলেন চট্টগ্রামের বাসিন্দা।  সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, পুলিশের চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বদলির তালিকায় শুধু চট্টগ্রামের বাসিন্দা কেন?

এই প্রসঙ্গে সিএমপির উপ-কমিশনার (সদর) এস এম মোস্তাইন হোসেন বলেন, ‘পুলিশের বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। দেশে পুলিশের এক ইউনিট থেকে অন্য ইউনিটে বদলির এখতিয়ার সদর দপ্তরের। মূলত সিনিয়রটির ভিত্তিতে পুলিশ সদস্যের বদলি করা হয়। দুই দিনে সিএমপির ৫৯ জন কনস্টেবল বদলির বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে পারব না।’  

তবে সিএমপির অন্যতম শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘একটা নীতিমালা আছে, যেখানে মেট্রোপলিটন এলাকাও আছে। এ নীতিমালায় জেলার বাসিন্দারা নিজ জেলার মেট্রোপলিটন এলাকায় চাকরি করতে পারবে না। এ বিষয়ে একটা যুক্তি হচ্ছে, নিজ জেলার মেট্রো এলাকায় চাকরি করলে তারা নানাবিধ তদবিরে পড়ে যান। সেক্ষেত্রে তারা কাজ করতে পারেন না।’
তবে একই নিয়ম ঢাকাসহ দেশের অন্য মেট্রোপলিটন ইউনিটে মানা হচ্ছে না, শুধু সিএমপির ক্ষেত্রে কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে সিএমপির এক উপ-কমিশনার বলেন, ‘পুলিশের  মেট্রো ইউনিটগুলোতে নিজ নিজ জেলার অনেক বাসিন্দারা কর্মরত আছেন। তবে বদলি করার সময় কার বাড়ি কোথায়, সেটা বিবেচনায় আনা হয়না।’

ডিএমপিতে বদলির আদেশ পাওয়া একাধিক কনস্টেবল নাম প্রকাশ না করে জানান, ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো সিএমপির সাবেক কমিশনার মাহবুবর রহমান এবং নগরের কোতোয়ালী থানার সাবেক এক ওসি সিএমপিতে কর্মরত চাঁটগাইয়্যা পুলিশ কনস্টেবলদের একটি তালিকা সদর দপ্তরে পাঠান। সেই তালিকার সূত্র ধরেই সিএমপি থেকে চাঁটগাইয়্যা খেদাও মিশন চলছে। 

এর আগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে সিএমপিতে কর্মরত ৫৫ জন কনস্টেবলকে একযোগে বদলি করা হয়। সেসময় চট্টগ্রামের বাসিন্দা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী দুজন মন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে প্রতিবাদ করলে বদলি কার্যক্রম থমকে যায়। ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পুলিশ সদর দপ্তরে ব্যাপক রদবদল হলেও পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট শাখা-৩ এ কর্মরত পুলিশের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। তারাই সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ফের ‘চাঁটগাইয়্যা খেদাও’ মিশন শুরু করেছে’ যোগ করেন এক কনস্টেবল।

বদলির আদেশ পাওয়া আরেক পুলিশ সদস্য বলেন, ‘পুলিশে বদলি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বছরের প্রায় শেষ সময়ে এসে বদলি করায় বিপাকে পড়েছি। সিএমপিতে চাকরি করার সুবাদে পরিবার নিয়ে থাকছি শহরে। সন্তান পড়ালেখা করছে শহরে। কর্মস্থল কাছাকাছি হওয়ায় ছুটির দিনে গ্রামের বাড়িতে যেতে পারছি। শুধু বেছে বেছে চাটগাঁইয়াদের বদলি সত্যিই দুঃখজনক।