তালিকায় রুই-কাতলা, দেওয়া হয় পাঙাশ

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের মধ্যে খাদ্য সরবরাহে নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম এবং নিম্নমানের খাবার পরিবেশনের অভিযোগ করেছেন রোগীরা। বরাদ্দে সপ্তাহে দুদিন খাসির মাংস থাকলেও দেওয়া হচ্ছে ব্রয়লার মুরগি। রুই-কাতল মাছের স্থলে রোগীরা পাচ্ছেন পাঙাশ মাছ। হাসপাতালটিতে ঠিকমতো খাদ্য তালিকা না থাকায় রোগী কিংবা স্বজনরা পরিমাণের বিষয়ে কোনো কথা বলতে পারছেন না।

সরেজমিনে রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সপ্তাহে সাত দিনের তালিকা মোতাবেক প্রতিদিন সকালে পাউরুটি, ডিম ও কলা দেওয়ার কথা। কিন্তু দেওয়া হচ্ছে নিম্নমানের খোলা রুটি ও ছোট কলা। খাদ্য তালিকা থেকে বাদ পড়ছে ডিম। দেওয়া হচ্ছে মোটা চালের দুর্গন্ধযুক্ত ভাত। রান্নার মানও ভালো নয়। ফলে বেশির ভাগ রোগীই পেট ভরে খেতে পারছেন না।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতি রোগীর খাবারের জন্য একদিনে বরাদ্দ মোট ১৭৫ টাকা। তবে বিশেষ দিনে একজন রোগীকে উন্নত খাবারের জন্য ২০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সপ্তাহের তিনদিন দেশি ও কক মুরগির মাংস এবং দুদিন খাসির মাংস দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।

পাকুড়িয়া দরবার শরিফ এলাকার মুক্তিযোদ্ধা বাচ্চু মিয়া ১১ আগস্ট সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে গংগাচড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি ভর্তি হওয়ার পর একদিনও খাসির মাংস পাইনি। মাংস বলতে শুধু পাচ্ছি ব্রয়লার মুরগি, যা দিয়ে ভাত খাওয়া সম্ভব নয়। আর পাচ্ছি পাঙাশ মাছের তরকারি। তাছাড়া মসুর ডালের বদলে দেওয়া হচ্ছে মটর ডাল।’

তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, ‘গন্ধযুক্ত কম দামের চাল দিয়ে ভাত রান্না করা হচ্ছে। এগুলো খেতে গেলে বমি আসে। তারপরেও বেঁচে থাকার জন্য খেতে হয়। রান্নার মানও খুব বাজে।’ 

গান্নারপাড় এলাকার ফাতেমা বেগম বলেন, ‘ভাত এমন গোন্দায় (গন্ধ) যে মুখোত তোলা যায় না। এগলা মানুষ খায় কেমন করি! মুই ফেলে দিসু, খাইনাই বাবা। পাওরুটিও বাহির থাকি আনি খানু।’

গজঘণ্টা এলাকার ওমরবালা গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘১০ দিন ধরি এটে ভর্তি আছু। একদিনও খাসির মাংস পাওনাই। আইজ দেইল যেটা মুখোত দেবার সাথে সাথে বমি আসা শুরু হইসে।’

সরেজমিনে রান্নাঘরে গিয়ে দেখা যায়, রাঁধুনি রফিকুল ইসলাম রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন রোগী হিসাব করে খাবার নিয়ে আসি। আরএমও স্যার মেপে খাবার দেন।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেখেন খাবারের মান বা পরিমাণ তো একটু খারাপ হবেই। কারণ দেশের সবকিছুর দাম বাড়তি। আসলে এই বাজেটে যে পরিমাণে খাবার দেওয়া হয়, সেটা মানুষের পেট ভরানোর জন্য যথেষ্ট নয়। আর চাল-ডাল, মাছ-মাংস, মসলাপাতি কম করে ঠিকাদার কিনে দিলে আমি কী করব?’

তবে হাসপাতালের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান বাজারে দৈনিক ১৭৫ টাকা বরাদ্দে ভালো খাবার দেওয়া কঠিন। তারপরেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চেষ্টার কমতি নেই। হাসপাতালের খাবার রোগীরা খাচ্ছেন না, এটা ঢালাওভাবে বলার সুযোগ নেই। যদি না-ই খেতেন, তাহলে তো রোগীর স্বজনেরা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে হাসপাতালের খাবার নিতেন না। 

নার্সিং সুপারভাইজার আরেফা খাতুন বলেন, ‘ঠিকাদার আগে খাবার পরিমাণে কম দিত। পরে কর্তৃপক্ষ চাপ দিলে কিছুটা ঠিকঠাক দিচ্ছে।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মা-মনি এন্টারপ্রাইজের দায়িত্বে থাকা লাইবুল ইসলাম লেবু বলেন, তিনি এসব ব্যাপারে কথা বলতে রাজি নন।

খাবারের মান এবং পরিমাণের বিষয়ে জানতে চাইলে গংগাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসিফ ফেরদৌস বলেন, ‘খাবারের মান ও পরিমাণের বিষয়ে আমার কাছে এখন পর্যন্ত কেউ অভিযোগ করেনি। তবে বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী খাবার সরবরাহ করতে গিয়ে ঠিকাদার বিপাকে পড়েছেন। কারণ সবকিছুর দামই এখন ঊর্ধ্বমুখী। তারপরেও আমরা খাবারের মান ধরে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’