ছিনতাইকালে বাড়ছে খুন

নৈশকোচে নওগাঁ থেকে রওনা হয়ে ভোরে ঢাকায় এসে নামেন সফটওয়্যার প্রকৌশলী জাররাফ আহমেদ প্রীতম। টেকনিক্যাল মোড় থেকে রিকশা নিয়ে বাসার পথ ধরেন। কিন্তু তার আর বাসায় ফেরা হয়নি। দারুস সালাম রোডের মিরপুর টাওয়ারের দক্ষিণ পাশে টয় পার্কের সামনে রিকশাটি থামিয়ে প্রীতমকে কুপিয়ে তার কাছে থাকা সবকিছু ছিনিয়ে নিয়ে পালায় দুর্বৃত্তরা। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন ছিনতাইকারীদের কবলে পড়া প্রীতমকে। ঘটনাটি গত ২৭ আগস্টের। কদিন পরই উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার কথা ছিল নিহত এই সফটওয়্যার প্রকৌশলীর। তাকে এভাবে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ দুটি পরিবার ও তাদের স্বজনরা।

ছিনতাইকারীদের হাতে প্রীতমের এমন অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না সদ্যবিবাহিত এই যুবকের পরিবার ও তার শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা। বুকে শোকের পাথর চেপে দিন পার করছেন তারা। নিহত প্রীতমের শাশুড়ি শাহনাজ পারভীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আর দুই মাস পরেই আমার জামাতা অস্ট্রেলিয়ায় চলে যেত আমার মেয়ের (প্রীতমের স্ত্রী) কাছে। সেভাবেই সব প্রস্তুতি চলছিল। মাঝে কী থেকে কী হয়ে গেল! খবর পেয়ে ঘটনার পরদিনই অস্ট্রেলিয়া থেকে আমার মেয়েটা চলে আসে। তার মুখের দিকে তাকাতে পারি না। শহরটা এত অনিরাপদ! আমরা কেউই আসলে কোথাও নিরাপদ নই।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাত হলেই কিছু এলাকায় চলাচলের সময় জীবনের ঝুঁকি থাকে। আমরা চাই আর কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয় অকালে। অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া হোক। সবার জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।’

প্রীতমের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হয় দারুস সালাম থানায়। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত মিরপুরের ছিনতাইকারী গ্রুপ ‘ডেঞ্জার দারুস’-এর প্রধানকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ওই ঘটনায় জড়িত পলাতক আরও কয়েকজন চিহ্নিত হয়েছে, তাদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

শুধু প্রীতম নন, ছিনতাইয়ের সময় ছিনতাইকারীদের হাতে এমন প্রাণহানির ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর রাত ৩টার দিকে কদমতলী মেরাজনগর কাঁচারাস্তার ওপর ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে মো. হাশেম (৪৮) নামে এক কাঁচামাল ব্যবসায়ী খুন হন। ৩০ আগস্ট হাজারীবাগে ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হন ইফতেখার হোসাইন ইমন (২৪) নামে এক তরুণ। ৩১ আগস্ট ভোরে বাসাবো ফ্লাইওভারের ঢালে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে খুন হন অটোরিকশাচালক মো. ইউসুফ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী শুধু গত ২৭ আগস্ট থেকে তিন সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট দিনেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইকারীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন। এছাড়া অন্তত ১৩ জন গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসা নিয়েছেন ও নিচ্ছেন ঢামেক হাসপাতালে।

ছিনতাইয়ের সময় খুনের ঘটনার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই ঢাকা মহানগরের বাসিন্দাদের নিরাপত্তায় কাজ করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তরের অপরাধ বিভাগের গত জুন ও জুলাই মাসের ছিনতাই ও খুনের মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জুলাই মাসে দস্যুতা অর্থাৎ ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ১৬টি, খুনের মামলা হয়েছে ১৩টি। পরের মাস জুলাইতে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকালে দস্যুতা অর্থাৎ ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে মাত্র ১৫টি, খুনের মামলা হয়েছে ৬৯টি এবং ডাকাতির মামলা হয়েছে তিনটি। আগস্ট মাসে ১১১টি হত্যা মামলার তথ্য পাওয়া গেলেও ছিনতাই বা ডাকাতির মামলার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বাস্তবে ছিনতাই ও ছিনতাইয়ের সময় খুনের ঘটনা এর চেয়ে অনেক বেশি বলেই ধারণা নাগরিকদের।

অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এবং নগরে পুলিশি টহল জোরদার না করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে গুছিয়ে উঠতে হচ্ছে। অনেক জায়গায়ই এখন অনিরাপদ। এই সুযোগটাই নিচ্ছে অপরাধীরা। এছাড়া সড়কে টহল পুলিশের সংখ্যা অনেক কম নানা বাস্তবতায়। এটা বাড়াতে হবে। যদি দ্রুতই এসব ঘাটতি পূরণ করা না যায় তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।’

তবে ছিনতাইয়ের সময় হত্যার ঘটনা বেড়েছে এমন তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মো. ইসরাইল হাওলাদার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুয়েকটা এ রকম ঘটনা (ছিনতাইয়ের সময় হত্যা) ঘটেছে। এগুলো স্বাভাবিক সময়েও হয়। প্রথম দিকে (সরকার পতনের পরে) কয়েকটা ঘটনা ঘটেছে। এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। আমাদের জানা মতে সপ্তাহখানেক ধরে কোনো ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেনি, মামলাও হচ্ছে না।’

পুলিশি টহল জোরদারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আগে প্রত্যেকটি মহানগর থানায় ৮টি টহল দল কাজ করত। গত ৫ আগস্ট থানায় হামলা ও আগুনের ঘটনায় এখন কোনো থানায় দুটি টহল গাড়ি আছে, কোনো থানায় তিনটি বা সর্বোচ্চ চারটি আছে। রাতারাতি তো আমরা গাড়ি বানাতে পারছি না। স্থানীয়ভাবে গাড়ি জোগাড় করার চেষ্টা করছি। যে গাড়িগুলো মেরামতযোগ্য সেগুলো মেরামতের কাজ চলছে। থানার দুই-তিনটি গাড়ি দিয়ে পুরো এলাকা টহলের চেষ্টা চলছে।’

রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ১৮ হটস্পট : ছিনতাইকারীদের স্বর্গরাজ্য বা হটস্পট হিসেবে রাজধানীর ১৮টি স্থানকে চিহ্নিত করা যায় ডিএমপির থানাগুলোতে হওয়া মামলা, জিডি ও ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়াদের আক্রান্ত হওয়ার স্থান বিশ্লেষণ করে। এসব জায়গার মধ্যে ছিনতাইয়ের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শাহবাগ, মতিঝিল, খিলগাঁও, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, হাজারীবাগ ও মোহাম্মদপুর এলাকা। এছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ অন্য স্থানগুলো হলো ভাটারা, শের-ই বাংলা নগর, রামপুরা, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, উত্তরা পশ্চিম, পল্লবী, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল ও তেজগাঁও রেলস্টেশন এলাকা।