টানা ভারী বর্ষণে ডুবেছে কক্সবাজার শহরের অধিকাংশ এলাকা। পানি ঢুকে নষ্ট হয়ে গেছে কয়েকশ দোকানপাটের মালামাল। হাজারো ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলায় এক দিনে ৫০১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টির রেকর্ড। টানা বৃষ্টির মধ্যে পাহাড় ধসে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজন শহরতলির ঝিলংজার দক্ষিণ ডিককুল এলাকার বাসিন্দা ও তিনজন উখিয়া রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে পাহাড় ধসের এসব ঘটনা ঘটে।
টানা বৃষ্টিতে সৈকতে হোটেল-মোটেল জোনের ১০টি সড়ক ডুবে যায়। এতে পাঁচশোর বেশি হোটেল-মোটেলে কয়েক হাজার পর্যটক আটকা পড়েন। টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ দেড় হাজারের বেশি ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়ে গেছে। এতে অন্তত ছয় হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি ও চিংড়িঘের।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানান, গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা থেকে গতকাল বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ৫০১ মিলিমিটার। এটি ২০১৫ সাল থেকে গতকাল পর্যন্ত এক দিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। বৃষ্টিপাত আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন এই আবহাওয়াবিদ।
পাহাড় ধসে সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের দক্ষিণ ডিককুল এলাকায় একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু হয়। বাকি তিনজন মারা গেছেন উখিয়ার ১৪ নম্বর হাকিমপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। দক্ষিণ ডিককুলে নিহতরা হলেন মিজানুর রহমানের স্ত্রী আঁখি মনি (২১) এবং তার দুই শিশুসন্তান মিহা জান্নাত নাঈমা (৫) ও লতিফা ইসলাম (১)।
ঝিলংজা ইউপির ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মিজানুর রহমান সিকদার বলেন, ‘ভারী বৃষ্টি হওয়ার সময় বৃহস্পতিবার রাত ২টার দিকে মিজানুর রহমানের বাড়ির ওপর বিকট শব্দে হঠাৎ পাহাড় ধসে পড়ে। এতে পরিবারের চারজন মাটিচাপা পড়ে। প্রতিবেশীরা মিজানুরকে জীবিত উদ্ধার করেন। এরপর মাটি সরিয়ে অন্য তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।’
এই ইউপি সদস্য জানান, মিজানুর রহমানের বাড়িটি ছিল খাড়া পাহাড়ের পাদদেশে। বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে যায়। পরে মধ্যরাতে ভারী বর্ষণের সময় পাহাড় ধসে বাড়ির ওপর পড়ে।
পাহাড় ধসের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কক্সবাজার সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিলুফা ইয়াসমিন চৌধুরী।
শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দৌজা নয়ন জানান, ভারী বর্ষণে উখিয়ার ১৪ নম্বর হাকিমপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসে পড়ে তিনটি ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে মাটিচাপায় একই পরিবারের তিন সহোদরের মৃত্যু হয়েছে। নিহত তিনজন হলো ওই রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ই-২ ব্লকের কবির আহমেদের ছেলে আবদুর রহিম, আবদুল হাফেজ ও আবদুল ওয়াহেদ। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে মাটি সরিয়ে তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার করে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বিভীষণ কান্তি দাশ জানিয়েছেন, ঝিলংজায় পাহাড় ধসে নিহত তিনজনের পরিবারকে ৭৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে কাজ চলছে। এ ছাড়া পানিবন্দি এলাকার তালিকা তৈরি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় কাজ করা হচ্ছে।
টানা বৃষ্টিতে পর্যটন জোন কলাতলীর হোটেল-মোটেল এলাকার সব সড়ক, সৈকতসংলগ্ন এলাকা ও মার্কেটগুলো ডুবে যায় পানিতে। কলাতলী সড়কের দুই পাশের পাঁচশোর বেশি হোটেল-মোটেলে যাতায়াতের ২০টি উপসড়কও ডুবে যায়। ফলে কয়েক হাজার পর্যটক হোটেলের কক্ষে আটকা পড়েন।
শহরের প্রধান সড়কের বাজারঘাটা, বড়বাজার, মাছবাজার, এন্ডারসন সড়ক, টেকপাড়া, পেশকারপাড়া, বার্মিজ মার্কেট এলাকা, বৌদ্ধমন্দির সড়ক, গোলদিঘিরপাড়, তারাবনিয়াছড়া, রুমালিয়ারছড়া, বাঁচা মিয়ার ঘোনা, পাহাড়তলী, সমিতিপাড়া, কুতুবদিয়াপাড়া, ফদনারডেইল, নুনিয়াছড়া, বৈদ্যঘোনা, ঘোনারপাড়া, বাদশাঘোনা, খাজা মঞ্জিল, লাইটহাউজ, কলাতলী, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ও লারপাড়া এলাকা বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা অন্তত ৫ লাখ।
কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আকতার কামাল বলেন, ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে এই ওয়ার্ডের ১০ হাজার ঘরবাড়ি ডুবে যাবে। এই ওয়ার্ডে ৮০ হাজার শ্রমজীবী মানুষের বসবাস।
৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ওসমা সরওয়ার টিপু বলেন, পাহাড়ি ঢলের পানিতে পাহাড়তলীর তিনটি সড়ক ডুবে কয়েকশ ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। ধসে পড়েছে তিনটি সেতু। ফলে যানচলাচলও বন্ধ হয়ে গেছে। দুর্ভোগ আছে বহু মানুষ।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল-গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ‘ভারী বর্ষণে হোটেল-মোটেল জোন এখন পানির নিচে। কলাতলী সড়ক, সব উপসড়ক, সৈকতসংলগ্ন ছাতা মার্কেট এবং হোটেল লাবণী থেকে সুগন্ধা এলাকায় পানি আর পানি।’
ভারী বৃষ্টিতে টেকনাফ ও উখিয়ার অন্তত ৮০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে টেকনাফের ৬০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। টেকনাফ সদর, হোয়াইক্যং, হ্নীলা, বাহারছাড়া ও সাবরাং ইউনিয়নের এসব গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। উখিয়ার রাজাপালং, জালিয়াপালং, হলদিয়াপালং ও পালংখালী ইউনিয়নের আরও ২০টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার তথ্য জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।