‘চাঁদা দিতে চাইলেও নেওয়ার লোক নাই’

রাজধানীর হাতিরঝিলে ভ্যানে করে ঝালমুড়ি বিক্রি করেন আবদুল কাদের (৩৫)। প্রতিদিন বিকেলে হাতিরঝিলের পুলিশ প্লাজা এলাকায় ভ্যান নিয়ে বসেন তিনি। গত এক মাস কোনো ঝামেলা ছাড়াই ব্যবসা করছেন কাদের। কোনো চাঁদা দিতে হয় না। আগের মতো কোনো হয়রানি নেই। কিন্তু আতঙ্ক আছে তারÑ কখন না জানি আবার আগের মতো চাঁদা দিতে হয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে হাতিরিঝিলে ব্যবসা করতে প্রতিদিন কাদেরকে ২০০ টাকা চাঁদা দিতে হতো। এর মধ্যে পুলিশকে ১০০ ও ছাত্রলীগকে ১০০ টাকা দেওয়া লাগতো। প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার মুড়ি ও ছোলা বিক্রি করেন কাদের। এর মধ্যে খরচ বাদ দিয়ে ৮০০ টাকা লাভ থাকে। ২০০ টাকা চাঁদা দিলে থাকে ৬০০ টাকা, যা দিয়ে তার সংসার ও ব্যবসা চালানো মুশকিল হয়ে যেত।

কাদের দেশ রূপান্তরকে বলছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরে কিছু লোক চাঁদার জন্য এসেছিল। এখানকার দোকানিরা সবাই মিলে ধাওয়া দিলে তারা চলে যায়।

তিনি বলেন, ‘অন্যরা চাঁদা দিতে না চাইলেও আমি চাচ্ছি চাঁদা দিতে। কারণ চাঁদা দিলে নিরাপদে ব্যবসা করা যায়। কেউ এসে এখান থেকে আমাকে তুলে দিতে পারবে না। নেতাদের চাঁদা দিলে তারা পুলিশ বা অন্যদের সঙ্গে সমন্বয় করবে। তাহলে আর ব্যবসা করতে কোনো ঝামেলা হবে না।’

ক্ষুদ্র এ ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমি চাঁদা দিতে চাই, কিন্তু চাঁদা নেওয়ার লোক নাই।’

যদি চাঁদা নাই দেওয়া লাগে, তাহলে সবকিছুর দাম কমার কথা। এ বিষয়ে কাদের বলেন, ‘মালামাল কিনতে হয় বেশি দামে, তাই আমাদের বিক্রিও করতে হচ্ছে বেশি দামে। আর ২০০ টাকা যে চাঁদা দিতে হতো, তা নিজের ব্যবসার টাকা থেকেই দেওয়া লাগত। তাই দামের বিষয়ে কোনো কম নেই। তবে আগের চেয়ে ব্যবসা ভালো চলছে।’

তিনি বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা চাচ্ছেন এখানে তাদের লোকজন ব্যবসা করবে, আর তারা আগের আওয়ামী লীগের মতো চাঁদাবাজি করবেন।

আগের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে এই ঝালমুড়ি বিক্রেতা বলেন, ‘একবার চাঁদা দিতে দেরি হওয়ায়, আমাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। অনেক টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনতে হয়েছে। সেই থেকে ঝামেলামুক্ত থাকতে চাঁদা দিতে চাই।’

রাজধানী ঢাকায় ব্যবসা করবেন আর চাঁদা দেবেন না, এটা তো হতে পারে না। ফুটপাত কিংবা ভাড়া দোকান, যেখানেই আপনি ব্যবসা করবেন, দিন শেষে আপনাকে চাঁদা দিতে হবেÑ এমনটাই গত মাস পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়মে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরে রাজধানীর অনেক জায়গায় চাঁদাবাজি বন্ধ হয়ে গেছে। তবে কিছু কিছু স্থানে বিভিন্ন দল বা সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি চলছে। নতুন চাঁদাবাজরা মাথাচাড়া দেওয়া চেষ্টা করছে।

এ বিষয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা দেখছি বিভিন্ন জায়গায় সমন্বয়ক, সহসমন্বয়ক এই নামগুলো ভাঙিয়ে অনেকেই চাঁদা আদায়ের অপচেষ্টা করছে, কিংবা এমন অনেক কাজ করছে, যেগুলো প্রশ্নবিদ্ধ কিংবা আমাদের চেতনার সঙ্গে যায় না, স্পিরিটের সঙ্গে যায় না। যারা এসব করবে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি আমরা। যারা ২৪-এর অভ্যুত্থানকে লালন করে, তারা এসবের সঙ্গে জড়িত নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা একটি স্ট্রাকচার গঠনের চেষ্টা করছি। এটা যদি করতে পারি তাহলে অন্তত যারা এই ভুয়া সম্বয়ক রয়েছে তাদের আমরা খুব সুনির্দিষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসতে পারব এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে বিচারের আওতায় আনতে পারব।’

গত রবিবার দুপুরে ঢাকার নিউ চন্দ্রিমা মার্কেটের পাশের গলিতে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে জাম্বুরা বিক্রি করছিলেন জাফর মিয়া। জাম্বুরা মাখা খেতে খেতে কথা হয় তার সঙ্গে। ব্যবসার হালচাল জানার পাশাপাশি চাঁদা দেওয়া লাগছে কি না, সে বিষয়েও জানতে চাওয়া হয় তার কাছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভাই এখন ব্যবসা ভালোই চলছে। চাঁদা দেওয়া লাগছে না। আগে দিনে দুই দফায় ১৫০ টাকা চাঁদা দিতে হতো। এর মধ্যে সকালে ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগদের দেওয়া লাগত ১০০ টাকা। আর সন্ধ্যার পরে পুলিশদের দিতে হতো ৫০ টাকা। তবে আবার কারা আসবে, কাদের চাঁদা দিতে হবে, আগের চেয়ে বেশি দিতে হবে, নাকি আগের চেয়ে কম দিতে হবে, এমন নানা চিন্তা নিয়ে ব্যবসা করতে হচ্ছে।’ এর আগে একবার চাঁদা দিতে না পারায় তাকে পুলিশ দিয়ে আটক করিয়ে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ২০ হাজার টাকা দিয়ে ছাড়া পান। এরপর থেকে আর চাঁদা দেওয়া বন্ধ করেননি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চাঁদা দেওয়া ভালো, তাহলে আর সমস্যা হয় না। দিনভর ফুটপাত এলাকায় হেঁটে ব্যবসা করতে কোনো ঝামেলা হয় না!’

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগরী এলাকায় প্রতি বছর অর্ধশতাধিক চাঁদাবাজির মামলা হয়। তবে ঢাকায় চাঁদাবাজির মামলা তত বেশি হয় না। কেউ ঝামেলায় জড়াতে চায় না। বাধা দিলে এক দিন সমাধান হবে। কিন্তু পরে ফের ঝামেলা করবে চাঁদাবাজরা। এমন চিন্তা-ভাবনা থেকে সবাই চাঁদা দিয়ে নিরাপদে ব্যবসা করতে চান।

তবে আগের মতো কাউকে চাঁদাবাজি করতে দেওয়া হবে না উল্লেখ করে ডিএমপির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে ছোট-বড় যেকোনো প্রতিষ্ঠান বা দোকানে প্রতিদিন রাতে চাঁদা দেওয়া লাগত বলে শুনেছি। এ বিষয়টি এখন থেকে আর থাকবে না। কেউ যদি চাঁদা দাবি করে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের কাছে সহযোগিতা চাওয়ার অনুরোধ রইল। এ ছাড়া কেউ যদি আগের মতো চাঁদা দাবির জন্য মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করে তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বিএনপির নাম ভাঙিয়ে যদি কেউ চাঁদাবাজি করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে চাঁদাবাজদের কোনো সম্পর্ক নেই। কেউ বিএনপির নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি করলে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার অনুরোধ রইল।’