বাংলাদেশের ‘সমস্যা’র নাম টপ অর্ডার

হোটেল সোনারগাঁওয়ের পদ্মা হলে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার উপস্থিতিতে পাকিস্তানকে হারানোর অর্থ পুরস্কার হাতে পেয়েছেন ক্রিকেটাররা। সব মিলিয়ে অঙ্কটা ৩ কোটি ২০ লাখ। ১৬ ক্রিকেটারের মধ্যে ঐকিক নিয়মেও যদি টাকাটা ভাগ করা হয় তাহলে প্রত্যেকের ভাগে ২০ লাখ টাকা। অর্থাৎ জাকির হাসান প্রতিটি রান করার জন্য বোনাস হিসেবে পেয়েছেন প্রায় ৩০ হাজার টাকা! পাকিস্তান সফরে ২ টেস্টের ৪ ইনিংসে এই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানের মোট রান ৬৮!

পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের ঝলমলে আলোর উৎসবে অনেকটা আড়ালেই চলে গেছে ওপরের দিকের ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার অন্ধকার অধ্যায়। ২৬ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর সাত এবং আট নম্বর ব্যাটসম্যানদের বীরত্বগাথার চর্চায় ঢাকা পড়েছে ওপরের ব্যাটসম্যানদের রানখরা। অথচ টেস্ট ক্রিকেটে ওপরের ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকেই রান আসাটা প্রত্যাশিত, লোয়ার অর্ডারে যদি বাড়তি কিছুটা রান আসে সেটা উপরি পাওনা। বাংলাদেশের টপ অর্ডারটা তাসের ঘরের মতোই ভঙ্গুর আর ভারতের ঠিক উলটো, কুতুব মিনারের মতোই মজবুত।

বাংলাদেশ দলের শীর্ষ তিন ব্যাটসম্যানের ভেতর সবচেয়ে খারাপ অবস্থা অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর। চলতি বছরে ৪ টেস্টের ৭ ইনিংসে শান্তর মোট রান ৯০, সর্বোচ্চ ৩৮। তারপরও দলকে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা সাফল্যের পথে নেতৃত্ব দেওয়ার কৃতিত্ব বাঁচিয়ে দেবে শান্তকে, নেতৃত্ব নেবে বর্মের ভূমিকা। মাহমুদুল হাসান জয়ের চোটের কারণে প্রায় দুই বছর পর টেস্ট একাদশে ফিরে ধৈর্যশীল প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে করা ৯৩ রান সমালোচনার মুখে ফেলতে পারবে না সাদমান ইসলামকেও।

কিন্তু জাকিরের কোনো রক্ষাকবচই নেই। রাওয়ালপিন্ডিতে দ্বিতীয় টেস্টে অন্তত হাফসেঞ্চুরি করে ম্যাচ জিতিয়ে মাঠ ছাড়ার সুযোগ ছিল জাকিরের। কিন্তু মির হামজার ইনসুইঙ্গারে যেভাবে বোল্ড হলেন, তাতে বোঝা গেল উইকেটে বোলারদের জন্য একটু সহায়তা থাকলে সেখানে তার ব্যাট কথা বলতে চায় না। মাত্র ১২ ওভারের পুরাতন বলটা খেলতে একদমই স্বস্তি পাচ্ছিলেন না এই বামহাতি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। এই বছর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তার ২ টেস্টে ৪টি ইনিংস যথাক্রমে ৯, ১৯; ৫৪ ও ১৯ রানের।

এই বছর ৪ টেস্টে ৮ ইনিংস জাকিরের, ১ বার নট আউট। ৭ বার আউট হয়েছেন, ৩ বার ডানহাতি পেস বোলার এবং ৪ বার বামহাতি পেস বোলারের বলে। ক্যাচ আউট ৪ বার, ২ বার উইকেটের পেছনে আর ২ বার ফিল্ডারের হাতে। ২ বার বোল্ড, ১ বার লেগবিফোর উইকেট। ভারতের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকেই সেঞ্চুরি করেছিলেন জাকির, ৬৯টা প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলার পর সাদা পোশাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা পড়েছিল তার। কিন্তু শুরুর সেই প্রতিশ্রুতি ধরে রাখতে পারেননি জাকির।

হাইপারফরম্যান্স দলের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার ডারউইন সফরে গিয়ে পাকিস্তান শাহিনসের বিপক্ষে ৮৮ রানের ইনিংসের সঙ্গে মাহমুদুল হাসান জয়ের কুঁচকির চোট সাদমানকে বছর দুয়েক পর টেস্ট একাদশে ফিরিয়ে আনে। ৯৩ রানের ধৈর্যশীল  ইনিংসে প্রত্যাবর্তনের আনন্দের সঙ্গে দ্বিতীয় টেস্ট শতকের কাছে এসেও অধরা থেকে যাওয়া অতৃপ্তি মিশে আছে। তবে পরের ইনিংসগুলো আর নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া হয়নি সাদমানের, ১০ উইকেটের জয়ে অপরাজিত ৯ রানের বেশি না হয় করার ছিল না। কিন্তু পরের টেস্টে ১০ এবং ২৪ রানের দুটো ইনিংস বাড়িয়েছে হতাশা। সাদমানের ব্যাটিংয়ের ধাঁচটা পুরনো দিনের টেস্টের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানদের মতো, বল ব্যাটে লাগানোর চেয়ে ছাড়তেই বেশি মনোযোগী। এতে করে উইকেটে লম্বা সময় কাটানো গেলেও জুটি বড় হয় না আর ব্যাটসম্যানের আত্মবিশ্বাসও খুব একটা বাড়ে না।

রাওয়ালপিন্ডিতে প্রথম টেস্টে ৯৩ রানের ইনিংস খেলার পথে ৪টা জুটিতে অংশ ছিলেন সাদমান, এর ভেতর দুইবারই তার চেয়ে পরে নামা ব্যাটসম্যান নাজমুল হোসেন শান্ত এবং মুমিনুল হক জুটিতে বেশি রানের অবদান রেখেছেন। তৃতীয় উইকেট জুটিতে মুমিনুল ও সাদমান যোগ করেন ৯৪ রান, তাতে মুমিনুলের ৫০ রান আসে ৭৬ বল থেকে আর সাদমান ৩৮ রান যোগ করেন ৭০ বল খেলে।

চোখ ফেরানো যাক ভারতের দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানের দিকে। যশস্বী জয়সওয়াল আর রোহিত শর্মা, দুজনের কেউই অল্পতে তৃপ্ত নন! রোহিত এই বছর ৬টা টেস্ট খেলেছেন যার ভেতর ৫টা দেশে, আর একটি দক্ষিণ আফ্রিকায়। ১১ ইনিংসে রোহিতের ৪৫৫ রান, দুটো সেঞ্চুরি আর একখানা হাফসেঞ্চুরি। অর্থাৎ কোনো ইনিংসে রান পঞ্চাশ ছাড়ালে সেটাকে শতকে রূপান্তর করতে শতভাগ প্রচেষ্টা থাকে ভারতীয় অধিনায়কের, যে বৈশিষ্ট্য তার ওয়ানডে ইনিংসগুলোতেও স্পষ্ট। ওয়ানডেতে তিনটা ডাবল সেঞ্চুরি তো এমনি এমনি আসেনি!

৩৮ বছর বয়সী রোহিতের সঙ্গী ১৬ বছরের ছোট যশস্বী জয়সওয়াল। বয়সে ছোট হলেও কাজে বড়, এই বছর ৬ টেস্টে খেলা ১১ ইনিংসে তার রান রোহিতের চেয়েও বেশি! দুটো সেঞ্চুরি এই বছর, দুটোই ডাবল সেঞ্চুরি, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। অর্থাৎ ৫০ রান ছাড়ালে ২০০’র আগে থামানো যায় না যশস্বীকে! অথচ তার টেস্ট ক্যারিয়ারের বয়স মাত্র ৯ টেস্ট!

বাংলাদেশের দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান, জাকির এবং সাদমান মিলে এই বছর মোট রান করেছেন ৩০১। যশস্বীর সর্বোচ্চ ইনিংসটা অপরাজিত ২১৪ রানের, রোহিত  ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ইনিংস ডিক্লেয়ার না করলে যেটা আরও বড় হতেই পারত। সৈয়দ মুজতবা আলী তার রম্য গল্পে তীব্র শ্লেষে এঁকেছিলেন ঔপনিবেশিক সমাজের বৈষম্যের ছবি, লাট সাহেবের তিন ঠ্যাংয়ের কুকুরের একটা ঠ্যাংয়ের পেছনে যতখানি খরচ, তার সমান খরচে পন্ডিত মশাইকে ছেলে মেয়ে মা বোনকে নিয়ে গড়া সংসারের খরচ সামলাতে হয়। তাই জাকের আর সাদমান যদি রান প্রতি প্রায় হাজার ত্রিশেক করে টাকা পান, তাহলে এই বছর তাদের মোট রানের একটু বেশি একাই করা যশস্বীর জন্য দরটা কত হওয়া দরকার?